মানুষের জীবন এক অনন্ত সফরের নাম যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের মহান রবের নিকটবর্তী করে তোলে। এই পথচলায় আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কেবল জৈবিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য নয় বরং এগুলো রবের নিদর্শন অনুধাবন করার একেকটি শক্তিশালী মাধ্যম। বিশেষ করে আমাদের শ্রবণশক্তি বা কান হিদায়েতের পথে এক অপরিহার্য দ্বার হিসেবে কাজ করে। আমরা যখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তখন আমাদের মনে এই গভীর বিশ্বাস জাগ্রত হওয়া প্রয়োজন যে তিনি আমাদের অতি নিকটে আছেন। আল্লাহর গুণবাচক নাম ‘আল-ক্বা-রী-ব’ আমাদের শেখায় যে তিনি বান্দার ডাক শোনেন এবং তার অত্যন্ত কাছে অবস্থান করেন। এই নৈকট্যের বোধই একজন মুমিনকে শেখায় যে রবের ডাক শোনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো আমল হতে পারে না। তবে এই ঐশী ডাক শোনার জন্য প্রয়োজন হৃদয়ের কানকে দুনিয়ার কোলাহল ও পাপাচার থেকে মুক্ত রাখা। আমাদের প্রতিটি রাত যেন তওবার রাতে পরিণত হয় কারণ পাপের শব্দ আমাদের শ্রবণশক্তিকে আধ্যাত্মিকভাবে ভোঁতা করে দেয়।
দুনিয়ার শত কোলাহল আমাদের কানকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আমরা অনেক সময় নিরর্থক কথা, পরনিন্দা বা গীবত এবং নিজের প্রশংসা শোনার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হই। এই অবাঞ্ছিত শব্দগুলোই আমাদের হৃদয়ে আলস্য বা গাফলত সৃষ্টি করে যা আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তার নিদর্শনের সুর শুনতে বাধা দেয়। অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা হলেন ‘আল-সামি’ বা সর্বশ্রোতা এবং ‘আল-বাসীর’ বা সর্বদ্রষ্টা। তাঁর এই ‘আল-সামি’ নামটি মুমিনকে এই শিক্ষাই দেয় যে তিনি আমাদের প্রতিটি ক্ষুদ্রতম দোয়া এবং হৃদয়ের স্পন্দনও শুনতে পান। তিনি বান্দার ডাক শুনে উত্তর দেন এবং যখন আমাদের শ্রবণশক্তি আল্লাহর ডাককে অগ্রাধিকার দেয় তখন হৃদয়ে এক স্থায়ী সাকীনাহ বা ঐশী প্রশান্তি নেমে আসে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর এই গুণের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
﴿وَاللَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: ওয়াল্লাহু হুয়াস সামী‘উল ‘আলীম। অর্থ: আর আল্লাহ হলেন সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা আল-মায়েদা, ৫:৭৬)
এই জ্ঞান মুমিনকে পার্থিব প্রশংসা বা মানুষের সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে কেবল আল্লাহর হুকুম ও নির্দেশনার প্রতি মনোযোগী হতে উদ্বুদ্ধ করে। যে কান ঐশী ডাকে মনোযোগী নয় সেটি ধীরে ধীরে আলস্য ও গুনাহের শব্দে পূর্ণ হয়ে যায়। এই আলস্যই মুমিনকে প্রকৃত তওবা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। নবী করিম ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন যে আল্লাহর অপছন্দনীয় কথা শোনা থেকে নিজেকে বিরত রাখা একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আমাদের ক্বালবুন সালীম বা পবিত্র হৃদয়কে রক্ষা করতে হলে কানকে অনর্থক ও ক্ষতিকর শব্দ থেকে হেফাজত করা জরুরি। আল্লাহর নৈকট্য তখনই স্পষ্টভাবে অনুভূত হয় যখন আমরা দুনিয়ার গীবত ও পরনিন্দা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে রবের বাণীর প্রতি নিবিষ্ট হই।
পবিত্র শ্রবণশক্তি অর্জনের জন্য মুমিনের দৈনন্দিন জীবনে কিছু বিশেষ আমল থাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রধান হলো অত্যন্ত মনোযোগ বা খুশু সহকারে কুরআন তেলাওয়াত শোনা। কুরআন হলো আল্লাহর সরাসরি সম্বোধন যা মানুষের অন্তরে হিদায়েতের আলো জ্বালিয়ে দেয়। নিয়মিত কুরআন শ্রবণ আমাদের হাত ও পা-কে নেক কাজের দিকে ধাবিত করার শক্তি যোগায়। এর পাশাপাশি নিরন্তর জিকিরের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ শ্রবণশক্তিকে সচল রাখা উচিত। জিকির আমাদের বাহ্যিক কানকে ফালতু কথা শোনা থেকে এক প্রকার সুরক্ষা দেয়। মুমাবাহ বা সচেতনতা রাখা প্রয়োজন যে আমাদের আল-সামি রব আমাদের সব কথাই শুনছেন। যদি আমরা কোনো পাপের কথা শুনি বা বলি তবে তা রবের অসন্তুষ্টির কারণ হবে। এই সচেতনতাই আমাদের আখেরাতের পাথেয়কে নিরাপদ রাখে।
পবিত্র শ্রবণের এই অভ্যাস মুমিনের জীবনে ইতিবাচক ফল নিয়ে আসে। যে কান আল্লাহর ডাক শুনতে অভ্যস্ত হয় সেই কান হিদায়েতের সরল পথ বা সিরাতে মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হয় না। এই নূর বা আলোই মুমিনকে দুনিয়ার ভয়ভীতি ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত করে স্থায়ী প্রশান্তি দান করে। জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় অবিচল থাকার বা ইস্তিকামাতের জন্য এটি একটি মজবুত স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যেন এই পবিত্র শ্রবণশক্তি অটুট থাকে। জীবনের শেষ আমলটি যেন হয় এমন যে আমাদের কান কেবল শাহাদাহ্র বাণী অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শুনতে পাচ্ছে। এই উত্তম সমাপ্তি বা হুসনুল খাতিমাহ হলো সেই মুমিনের জন্য শ্রেষ্ঠ পুরস্কার যে দুনিয়াতে কেবল রবের ডাক শোনার জন্য নিজের কানকে নিবেদিত করেছিল।
আমাদের উচিত প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা যাতে তিনি আমাদের শ্রবণশক্তিকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করেন। আধ্যাত্মিক এই সফরের প্রতিটি বাঁকে রবের নির্দেশনাই আমাদের একমাত্র ভরসা। আমরা যদি আমাদের কানকে রবের জন্য উন্মুক্ত করি তবে আমাদের হৃদয়ও তাঁর হিদায়েতের জন্য উন্মুক্ত হবে। এই ঐশী সম্পর্কই আমাদের জীবনকে সার্থক করে তুলবে এবং আখেরাতের কঠিন ময়দানে আমাদের মুক্তির অসিলা হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে ‘আল-সামি’ নামের হাকিকত বোঝার এবং তাঁর পথে শ্রবণশক্তিকে নিয়োজিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপনার মতামত লিখুন :