মানুষের এই নশ্বর চোখ দুটো প্রতিদিন কত কিছুই না দেখে। আসমানের দিগন্ত বিস্তৃত নীল রং, বাগানের সতেজ সবুজ পাতা কিংবা অতি আপন মানুষের হাসিমাখা মুখ—সবই এই চোখের ক্যানভাসে ধরা পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই দেখা কি কেবলই বাহ্যিক অবয়ব দেখা, নাকি এর গভীরের সত্য উপলব্ধি করা? আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই, তখন কি কেবল নীল রঙের বিশালত্ব দেখি নাকি সেই আকাশের সুনিপুণ সৃষ্টিকর্তার অসীম ক্ষমতা অনুভব করি? একটি প্রস্ফুটিত ফুল দেখার সময় কি আমরা শুধু তার সুবাস ও সৌন্দর্যে বিমোহিত হই নাকি সেই শিল্পী সত্তাকে স্মরণ করি যিনি শূন্য থেকে এই রঙের খেলা দেখিয়েছেন? অনেক সময় আমাদের চামড়ার চোখ দুটো খোলা থাকলেও অন্তরের চোখটি হয়তো সুপ্ত বা অন্ধ হয়ে থাকে। এই বিশাল পৃথিবীতে আল্লাহর হাজারো নিদর্শনের মাঝে থেকেও আমরা যেন এক আধ্যাত্মিক অন্ধত্বের শিকার হয়ে বেঁচে আছি। অথচ এই পার্থিব দৃষ্টির চেয়েও হৃদয়ের গভীরের সেই অন্তর্দৃষ্টি বা ‘বসিরাহ’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের ঈমানি জীবনে যখন স্থবিরতা চলে আসে, যখন ইবাদতের স্বাদ আমরা পাই না কিংবা রুটিন মাফিক আমল করেও হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব করি না, তখন বুঝতে হবে আমাদের আর আমাদের রবের মাঝখানে একটি পর্দা পড়ে গেছে। এই অবস্থাকে বলা হয় আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব। এটি কোনো শারীরিক ত্রুটি নয়, বরং এটি হৃদয়ের এক প্রকার ব্যাধি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে এই চিরন্তন সত্যটি অত্যন্ত অলঙ্কারপূর্ণ ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।
﴿فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: ফা ইন্নাহা লা তা‘মাল আবসারু ওয়া লাকিন তা‘মাল ক্বুলুবুল্লাতী ফিস সুদূর। অর্থ: প্রকৃতপক্ষে চোখ তো অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হয় বক্ষস্থিত অন্তর। (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৪৬)
আল্লাহর এই কালাম আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে শরীরের চোখ সচল থাকলেও মানুষের অন্তর মৃত বা অন্ধ হতে পারে। এই অন্ধত্বের নেপথ্যে কাজ করে আমাদের কৃত গুনাহের মরিচা। যখন একজন মুমিন ক্রমাগত হারাম জিনিস দেখার মাধ্যমে স্বীয় দৃষ্টিকে কলুষিত করে, তখন তার হৃদয়ের আয়না ঘোলাটে হয়ে যায় এবং সেখানে রবের নূর বা আলো প্রতিফলিত হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, দুনিয়ার অতি মোহ এবং চাকচিক্য আমাদের চিন্তাশক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমরা রিজিকের দুশ্চিন্তা আর অগোছালো জীবনের পেছনে ছুটতে ছুটতে থমকে দাঁড়িয়ে চিন্তা করার সময় পাই না যে এই যে সূর্যটা প্রতিদিন নিয়ম করে উদিত হচ্ছে কিংবা এই অতি ক্ষুদ্র পাখিটি প্রতিদিন তার আহার জোগাড় করছে—এগুলো কার ইশারায় হচ্ছে? এই অভ্যাসগত জীবন আমাদের কাছে অলৌকিক নিদর্শনগুলোকে অত্যন্ত সাধারণ বানিয়ে ফেলেছে। অথচ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে আল্লাহর নিদর্শন দেখার সেই ঐশ্বরিক চোখ হারায়, পরকালেও তার জন্য এক কঠিন পরিণতির কথা বলা হয়েছে।
এই আধ্যাত্মিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের প্রয়োজন সেই ‘বসিরাহ’ বা অন্তরের আলোকবর্তিকা। হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এই দৃষ্টির মাধ্যমেই নক্ষত্র, চাঁদ আর সূর্যের পরিবর্তন দেখে মহাবিশ্বের স্রষ্টাকে চিনেছিলেন। তিনি শুধু তাকিয়ে থাকেননি, বরং তিনি ‘দেখেছিলেন’। এই তাকিয়ে থাকা আর দেখার মাঝখানের ব্যবধানটাই হলো প্রকৃত ঈমান। যখন আপনার অন্তরের এই চোখ খুলে যাবে, তখন আপনার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত পাল্টে যাবে। মৃত মাটিকে বৃষ্টির পানি দিয়ে যেভাবে আল্লাহ জীবিত করেন, আপনার হৃদয়ে সেই বিশ্বাস জাগবে যে তিনি আপনার মৃতপ্রায় স্বপ্নগুলোকেও সফল করতে পারেন।
﴿رِّزْقًا لِّلْعِبَادِ ۖ وَأَحْيَيْنَا بِهِ بَلْدَةً مَّيْتًا﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: রিজকাল লিল ‘ইবাদি ওয়া আহইয়াইনা বিহী বালদাতাম মাইতা। অর্থ: বান্দাদের রিজিকের জন্য; এবং আমি তা দিয়ে মৃত ভূখণ্ডকে সঞ্জীবিত করি। (সূরা ক্বাফ, ৫০:১১)
সৃষ্টির এই বিশালত্বের দিকে তাকালে মানুষের অন্তরে আর অহংকার থাকে না। কোটি কোটি নক্ষত্রের এই মহাবিশ্বের সামনে নিজেকে তখন ধূলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র মনে হয়। নিজের দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন ও কারুকার্যের দিকে তাকালে হৃদয়ের গভীর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আল্লাহর শোকরিয়া বা আলহামদুলিল্লাহ উচ্চারিত হয়। তখন ইবাদত আর প্রাণহীন থাকে না। সিজদায় গেলে মুমিন অনুভব করতে পারে সে সেই মহান সত্তার সামনে কপাল নত করেছে যার হুকুমে সমুদ্রের ঢেউ গর্জে ওঠে এবং যার ইশারায় সময় বয়ে চলে। এই অনুভবই হলো ঈমানের আসল জ্বালানি যা একজন বান্দাকে তার রবের সাথে নিবিড় ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে।
এই অন্তরের দৃষ্টি লাভের প্রথম সোপান হলো তাযকিয়াহ বা আত্মশুদ্ধি। আমাদের হৃদয়ের আয়না থেকে গুনাহের মরিচা পরিষ্কার করতে হলে প্রচুর পরিমাণে ইস্তিগফার ও তাওবা করতে হবে। আল্লাহর কাছে কেঁদে বলতে হবে যে আমার অন্তর অন্ধকার হয়ে গেছে, আপনি দয়া করে এই গাফলতের পর্দা সরিয়ে দিন। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন তাফাক্কুর বা গভীর চিন্তাভাবনা। এটি একটি বিশেষ ইবাদত যা বর্তমানে আমরা অনেকটা ভুলেই গিয়েছি। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় নির্জনে বসে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে হবে। একটি ক্ষুদ্র পিঁপড়া কিংবা ঘাসের ডগার ভেতরে যে জটিল প্রাণশক্তির প্রবাহ চলছে, তার উৎস নিয়ে চিন্তা করা হৃদয়ের তালা খোলার চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে। তৃতীয়ত, কুরআনের বর্ণিত নিদর্শনের সাথে বাস্তব সৃষ্টিকে মিলিয়ে দেখা। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿وَفِي أَنفُسِكُمْ ۚ أَفَلَا تُبْصِرُونَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: ওয়া ফী আনফুসিকুম; আফালা তুবসিরূন? অর্থ: আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেই কি (নিদর্শন নেই)? তোমরা কি তা দেখো না? (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:২১)
কুরআনের আয়াত আর চোখের সামনে দৃশ্যমান জগত যখন একবিন্দুতে মিলিত হয়, তখন ঈমান এক নতুন উচ্চতা লাভ করে। পরিশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই বিশেষ দৃষ্টি কোনো পার্থিব অর্জনের বিষয় নয়, বরং এটি মহান রবের এক বিশেষ দান। তাই ‘আন-নূর’ এবং ‘আল-বাসীর’ রবের কাছে বিনীতভাবে সেই আলোর প্রার্থনা করতে হবে যা অন্ধকার জীবনকে আলোকিত করে তোলে। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের অন্তরের চোখ খুলে দিন এবং আপনার নিদর্শনের মাঝে আপনার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপনার মতামত লিখুন :