শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২৩ মাঘ ১৪৩২

মৃত্যুর ডাক ও শেষ গন্তব্য কবর: পরকালীন পাথেয় সংগ্রহের আহ্বান

নিউজ ডেস্ক ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ১০:৪০ এএম
মৃত্যুর ডাক ও শেষ গন্তব্য কবর: পরকালীন পাথেয় সংগ্রহের আহ্বান

কবরের নীরবতা ও আখেরাতের চিন্তা। ছবি: AI

কোন এক নির্জন কবরস্থানের ফটকে হয়তো খোদাই করা ছিল সেই অমোঘ সত্য যা আমাদের প্রত্যেকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য—গন্তব্য তোমার এটাই ছিল। আমরা যখন পৃথিবীর বুক চিরে দর্পভরে হেঁটে চলি, তখন কি একবারও ভাবি যে আমাদের পায়ের নিচে কত হাজারো মানুষ আজ চিরনিদ্রায় শায়িত? যাদের নাম হয়তো আমাদের জানা নেই, কিন্তু তাদের মতোই হবে আমাদের প্রত্যেকের জীবনের শেষ অধ্যায়। এই পৃথিবীর আলোয় আমরা এসেছিলাম একবুক কান্না নিয়ে, আর একদিন আমাদের বিদায় নিতে হবে একরাশ নীরবতা সঙ্গী করে। আমাদের জীবনের পথে হেঁটে যাওয়া প্রতিটি কদম যেন আমাদের সেই মাটির শীতল কোলের দিকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জীবনটা আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী আর মৃত্যু যে কতটা ধ্রুব সত্য, তা অনুধাবন করার জন্য একটু নিভৃত চিন্তা ও হৃদয়ের গভীর থেকে অনুভুতি প্রয়োজন।

মানুষের জীবনের ব্যস্ততার কোনো শেষ নেই। কেউ হয়তো এইমাত্র নতুন একটি গাড়ি কিনেছে, কেউবা কাঙ্ক্ষিত চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পেয়েছে কিংবা নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই হৃদপিণ্ড থেমে যায়। যে ভাইটি কিছুক্ষণ আগেও পাশে ছিল, যার হাসির শব্দে মুখরিত ছিল ঘর, আজ সে কেবলই স্মৃতি। তাকে নিজ হাতে গোসল দেওয়া হয়, সাদা কাফনে জড়িয়ে দেওয়া হয় আর অতি আপন মানুষরাই তাকে কবরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রেখে আসে। এই পার্থিব জীবন থেকে আসলে আমরা কী নিয়ে যাচ্ছি? যেখানে সবকিছু পড়ে থাকবে, কোনো তালি নেই, কোনো ছবি নেই, এমনকি ইনবক্সে জমে থাকা অগণিত মেসেজগুলোর কোনো উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাও আর থাকবে না। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে এই ধ্রুব সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন।

﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ وَنَبْلُوكুম بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً ۖ وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: কুল্লু নাফসিন যা-ইকাতুল মাউত, ওয়া নাবলুকুম বিশ-শাররি ওয়াল খাইরি ফিতনাতান, ওয়া ইলাইনা তুরজাউন। অর্থ: প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আর আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি। আর আমার কাছেই তোমাদের ফিরে আসতে হবে। (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩৫)

আল্লাহর এই ঘোষণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মৃত্যু কোনো শেষ নয়, বরং এটি হলো মালিকের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি পথ। আমরা যে ঘর থেকে দুনিয়ায় এসেছিলাম, একদিন সেই আসলি ঘরেই ফিরে যেতে হবে। কখনও কি আমরা কল্পনা করেছি আমাদের নাম যদি কবরের সেই পাথরে খোদাই করা হয়—অমুকের পুত্র অমুক, জন্ম এত সালে এবং মৃত্যু অমুক তারিখে? মাটির নিচে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ নেই। কবরের মাটি কোনো আইনি চুক্তি চেনে না, চেনে না কোনো পদমর্যাদা। সেখানে সবাই সমানভাবে শায়িত। এ প্রসঙ্গে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ আমাদের সঠিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, প্রজ্ঞাবান সেই ব্যক্তি যে নিজের নফসকে বশীভূত করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। (জামে আত-তিরমিযি, ২৪৫৯)

আজ যতক্ষণ আমাদের শরীরে প্রাণ আছে এবং সময় আমাদের অনুকূলে আছে, ততক্ষণই নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত যে আমি কি সেই দিনের জন্য প্রস্তুত? আমার কবর কি নেক আমলের আলোয় আলোকিত হবে নাকি গুনাহের অন্ধকারে ছেয়ে থাকবে? দুনিয়া আমাদের ভালোবাসার অভিনয় করলেও আসলে সে আমাদের স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে ফেলে দেয়। আমরা যত বড় হিরো হই না কেন, একদিন আমাদের রঙিন ছবিগুলো সাদা-কালো হয়ে যাবে। আমাদের অতি জনপ্রিয়তার ভিড় ঠেলে একদিন কেবল শোনা যাবে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। কবরস্থানগুলো নীরব থাকলেও তারা যেন গর্জনে বলে চলেছে যে তারাও একদিন আমাদের মতো জীবিত ছিল এবং একদিন আমরাও তাদের মতো মাটিতে মিশে যাব। আমাদের আপনজনরা হয়তো গত সপ্তাহেই চলে গিয়েছেন, তবুও কি আমাদের ব্যস্ততা আর অহংকার একবিন্দু কমেছে?

রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দুনিয়ায় নিজেকে একজন পথিকের মতো মনে করতেন। তিনি বলতেন, আমার সাথে এই দুনিয়ার সম্পর্ক একজন আরোহীর মতো, যে গ্রীষ্মের দুপুরে কোনো গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার গন্তব্যের দিকে রওনা দেয়। (জামে আত-তিরমিযি, ২৩৭৭) তাঁর মৃত্যু-চেতনা ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতেন। নবী করিম ﷺ যখন জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা দিতেন, তখন তাঁর চোখ ভিজে যেত উম্মতের চিন্তায়। তিনি বলতেন, কবর হলো আখেরাতের প্রথম মঞ্জিল। যে এখানে মুক্তি পাবে তার পরবর্তী পথগুলো সহজ হয়ে যাবে, আর যার জন্য এখানে মুক্তি নেই তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। (জামে আত-তিরমিযি)

সাহাবায়ে কেরামদের জীবনেও মৃত্যুর এই স্মরণ ছিল নিত্যসঙ্গী। আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) প্রতিদিন নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে একদিন তাকেও মাটির নিচে হিসাবের আসামি হয়ে দাঁড়াতে হবে। তিনি একটি সাধারণ হাড্ডি হাতে নিয়ে কাঁদতেন আর ভাবতেন একদিন তার শরীরও এমন মাটিতে মিশে যাবে। উসমান ইবনে আফফান (রা.) কবরের পাশে দাঁড়ালে তাঁর দাড়ি চোখের পানিতে ভিজে যেত। তিনি জানতেন যে কবরই হলো সেই চিরস্থায়ী জীবনের প্রবেশদ্বার যা নির্ধারণ করবে পরের ধাপগুলো কেমন হবে। তাবেয়ীন ও বড় বড় আলেমগণও একই পথে চলেছেন। হাসান আল বসরি (রহ.) কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁদতেন এবং বলতেন যে এই মাটি কত হাজারো মানুষের নীরব কথা জানে যারা আজ ফিরতে চায় কিন্তু ফেরার কোনো পথ নেই।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রহ.) মৃত্যুর কথা শুনলে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন এবং বলতেন যে ব্যক্তি কবরের প্রস্তুতি ছাড়া হাসাহাসি করে সে আসলে মহাধোঁকায় আছে। প্রতিটি নবী ও রাসূল আমাদের মৃত্যুর প্রস্তুতির কথা বলেছেন কারণ আল্লাহর সাথে একদিন আমাদের মোলাকাত হবেই। সেদিন যেন আমাদের লজ্জিত হতে না হয়, সেটাই ছিল তাদের জীবনের মূল সাধনা। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি আমাদের ফোন যখন অফ হয়ে যাবে, চশমাটা টেবিলের এক কোণে পড়ে থাকবে আর চারপাশ থেকে শোনা যাবে দাফনের প্রস্তুতি চলছে, তখন আমাদের সাথে কবরে কী যাবে? দামী গাড়ি, দামী ফোন নাকি অর্জিত সার্টিফিকেট? না, কেবল আমাদের নেক আমল, ধৈর্য আর বিশুদ্ধ নিয়তটুকুই হবে আমাদের একমাত্র সম্বল।

﴿كَأَنَّهُمْ يَوْমَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: কা-আন্নাহুম ইয়াওমা ইয়ারাওনাহা লাম ইয়ালবাছু ইল্লা আশিইয়াতান আও দুহাহা। অর্থ: যেদিন তারা তা দেখবে, সেদিন তাদের মনে হবে তারা যেন মাত্র এক সন্ধ্যা বা এক প্রভাতের বেশি অবস্থান করেনি। (সূরা আন-নাযিয়াত, ৭৯:৪৬)

কুরআনের এই আয়াতে যেন সময়ের প্রকৃত স্বরূপ ফুটে উঠেছে। কাল হাশরের ময়দানে আমাদের দীর্ঘ এই পার্থিব জীবনকে মনে হবে স্রেফ একটি বিকেল বা এক সকালের সময়। তখন আমাদের আর কোনো অজুহাত দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। একদিন হয়তো মসজিদের মাইকে ঘোষণা আসবে অমুক ভাই আর নেই, জানাজা হবে অমুক সময়ে। সেই ‘অমুক’ ব্যক্তিটি যদি আপনি বা আমি হই, তবে আমাদের পরিচয় কেবল হবে দুই-একজন সাক্ষীর গवाही—লোকটি ভালো ছিল কি না। এটাই হবে মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের শেষ রেফারেন্স। মৃত্যু আসলে কোনো ভয়ের বিষয় নয় বরং এটি হলো আত্মার জাগরণ। যদি আমরা প্রস্তুত থাকি তবে মৃত্যু হবে আমাদের জন্য মুক্তির শুভ সংবাদ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেকটি মানুষ সকালে উঠে তার নফস বা আত্মার ব্যবসা করে—কেউ তাকে মুক্ত করে দেয় আবার কেউ তাকে ধ্বংস করে দেয়। (সহীহ মুসলিম) আমরা প্রতিদিন কী করছি? আমরা কি আমাদের আত্মাকে জান্নাতের পথে মুক্ত করছি নাকি জাহান্নামের পথে ধ্বংস করছি? আমরা আমাদের ক্যারিয়ার গড়ি, ফ্ল্যাট সাজাই কিন্তু কবরের অন্ধকার দূর করার জন্য কি এক রাকাত তাহাজ্জুদের আলো সঞ্চয় করি? আমাদের জান্নাত আজ আমাদের জন্য নীরব অপেক্ষায় আছে। যদি আমরা এখনই আল্লাহর কাছে ফিরে আসি, খাঁটি মনে তাওবা করি তবে হতে পারে আজ রাতেই আল্লাহ আমাদের নাম জান্নাতিদের তালিকায় লিখে দেবেন। কবরের চিন্তা যেন আমাদের হতাশ না করে বরং আমাদের মধ্যে আল্লাহর ভয় ও আশা জাগ্রত করে। আমাদের প্রতিটি সেজদা যেন হৃদস্পর্শী হয় এবং প্রতিটি অশ্রুবিন্দু যেন কাল কবরের আলো হয়ে জ্বলে ওঠে।

﴿قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ ۝ وَذَكَرَ اسْمَ রَبِّهِ فَصَلَّىٰ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: ক্বদ আফলাহা মান তাঝাক্কা। ওয়া যাকারাসমা রাব্বিহী ফাসল্লা। অর্থ: নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে এবং তার রবের নাম স্মরণ করে সালাত আদায় করে। (সূরা আল-আ’লা, ৮৭:১৪-১৫)

জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য কেবল বেঁচে থাকা নয় বরং মরার পর সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা। কবরের প্রশান্তি পেতে হলে আজই নিজের ভেতরের অবাধ্যতাকে দমন করতে হবে। গোপন গুনাহ থেকে ফিরে আসতে হবে এবং ছুটে যাওয়া নামাজগুলো সময়মতো আদায় করতে হবে। কারণ আমরা জানি না আজকের এই সূর্যটাই হয়তো আমাদের জীবনের শেষ আলো। আল্লাহর রহমতের দরজা সবসময় খোলা আছে। আমাদের কবর অপেক্ষা করছে আমাদের নেক আমল আর তাওবার আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য। এই মৃত্যুচিন্তাকে আমাদের জীবনের আলোকবর্তিকা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আমাদের আমলনামা যেন নেকিতে ভরে ওঠে এবং আমাদের হৃদয় যেন আল্লাহর প্রেমে সিক্ত হয়। পরিশেষে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা তিনি যেন আমাদের মৃত্যু দেন ঈমানের সাথে এবং আমাদের কবরকে জান্নাতের একটি টুকরা বানিয়ে দেন। আমীন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

মোটিভেশন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!