ইসলামিক লাইফস্টাইল কেবল বাহ্যিক কিছু রীতিনীতি পালনের নাম নয়, বরং এটি হৃদয়ের প্রশান্তি এবং আত্মার বিকাশের এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। আধুনিক এই ডিজিটাল যুগে যেখানে চারদিকে অস্থিরতা আর মানসিক চাপের হাতছানি, সেখানে ইসলামি জীবনধারা হতে পারে আমাদের জন্য পরম আশ্রয়ের স্থল। একজন মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্যই হলো তার প্রতিটি কাজকে ইবাদতে পরিণত করা। আমরা যখন সুন্নাহর আলোকে আমাদের প্রাত্যহিক রুটিন সাজাই, তখন সাধারণ কাজগুলোও সওয়াবের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করা যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: ”﴿فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَىٰ﴾ ফামানি ত্তাবাউ হুদা-ইয়া ফালা ইয়াদিল্লু ওয়া লা ইয়াশাক্বা।“ ”অর্থ: যে আমার প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না।“ (সূরা তহা, ২০:১২৩)
ইসলামিক লাইফস্টাইলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো পরিমিতিবোধ ও শোকর আদায়। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে খাবার গ্রহণ করি, সেই খাবারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুন্নাহর চর্চা আমাদের শারীরিক সুস্থতার গ্যারান্টি দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ সবসময় বসে পানি পান করা, ডান হাতে খাবার খাওয়া এবং খাবারের শেষে আল্লাহর প্রশংসা করার শিক্ষা দিয়েছেন। বর্তমান সময়ে `ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং` বা সবিরাম উপবাস নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক গবেষণা করছে, অথচ আমাদের প্রিয় নবী ﷺ সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখার মাধ্যমে এই শিক্ষা হাজার বছর আগেই দিয়ে গিয়েছেন। এই অভ্যাসগুলো কেবল আমাদের পাকস্থলীকে বিশ্রাম দেয় না, বরং আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বা `সেলফ কন্ট্রোল` বৃদ্ধি করে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইন্টারনেটের এই যুগে ইসলামিক লাইফস্টাইল অনুসরণ করা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। বিনোদনের নামে আমরা যেন হারাম কোনো কাজে লিপ্ত না হই এবং সময়ের অপচয় না করি, সেদিকে খেয়াল রাখাই হলো প্রকৃত সচেতনতা। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের জীবন হবে পরোপকারমুখী। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে মানুষের জন্য বেশি কল্যাণকর” (সহীহ আল-জামি, ৬৬৬৩)। মানুষের সাথে লেনদেনে সততা বজায় রাখা, কারো বিপদে এগিয়ে আসা এবং জিহ্বাকে সংযত রাখা ইসলামি জীবনধারার অপরিহার্য অংশ। আমরা যখন এই গুণগুলো নিজের মাঝে ধারণ করি, তখন আমাদের ব্যক্তিত্বে এক ধরনের ঐশ্বরিক জ্যোতি ফুটে ওঠে যা অন্যকেও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে।
পারিবারিক জীবনে ইসলামিক লাইফস্টাইলের গুরুত্ব অপরিসীম। মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন, জীবনসঙ্গীর সাথে সহমর্মিতা এবং সন্তানদের সঠিক দ্বীনি শিক্ষায় গড়ে তোলা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব। আমাদের ঘরগুলো যেন কেবল ইটের দেয়াল না হয়, বরং সেখানে যেন জিকির ও কুরআনের তিলাওয়াত গুঞ্জরিত হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাথে ঘরোয়া কাজে সাহায্য করতেন এবং তাদের সাথে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠতেন। এই যে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা, যেখানে কঠোরতা নেই কিন্তু নিয়মানুবর্তিতা আছে, এটাই হলো ইসলামের আসল সৌন্দর্য।
পরিশেষে, ইসলামিক লাইফস্টাইল আমাদের শেখায় কীভাবে অল্পে তুষ্ট থাকতে হয় এবং বড় বড় বিপদেও সবর বা ধৈর্য ধারণ করতে হয়। আমাদের জীবন সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর প্রভাব অনন্তকালের। তাই আসুন, আমরা আমাদের ফ্যাশন থেকে শুরু করে খাদ্যাভ্যাস, আমাদের চিন্তা থেকে শুরু করে কর্ম—সবকিছুতেই সুন্নাহর ছোঁয়া নিয়ে আসি। যখন আমাদের প্রতিটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত হবে, তখনই আমরা প্রকৃত সুখের সন্ধান পাব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর অবিচল থাকার এবং প্রকৃত ইসলামি জীবনধারা যাপনের তৌফিক দান করুন।

আপনার মতামত লিখুন :