শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২৩ মাঘ ১৪৩২

গণতন্ত্র বনাম প্রকৃত নেতৃত্ব: মুসলিম উম্মাহর মুক্তির সঠিক পথ কী

নিউজ ডেস্ক ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম
গণতন্ত্র বনাম প্রকৃত নেতৃত্ব: মুসলিম উম্মাহর মুক্তির সঠিক পথ কী

ক্ষমতার চেয়ে জ্ঞানের শক্তিই ইসলামের মূল ভিত্তি। ছবি: AI

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুসলিম উম্মাহর করণীয় নির্ধারণে শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাক এক গভীর ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তার মতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান তা মূলত মানুষের আবেগকে পুঁজি করে একটি চক্রাকার লুপের মতো কাজ করে যেখানে মানুষ বারবার ভোট দিয়ে আশাবাদী হয় এবং পরবর্তী কয়েক বছর কেবল হতাশা ও গালমন্দ করে কাটায়। গণতন্ত্রকে তিনি ছোট বাচ্চার হাতে ধরিয়ে দেওয়া ললিপপের সাথে তুলনা করেছেন যা মানুষকে সাময়িক ভুলিয়ে রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনে না। 

তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা সবার থাকলেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পদ্ধতিগত ভুল রয়েছে। শায়খ দাবি করেন যে ১৬ কোটি মানুষের ভোটের চেয়েও প্রথম আলো বা ব্র্যাকের মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অনেক বেশি কারণ তারা জ্ঞান এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির অধিকারী। মুসলিম উম্মাহর আজকের সংকটের মূল কারণ হিসেবে তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক মানসিকতার উত্তরাধিকার বা গোলামির স্বভাবকে দায়ী করেছেন যা মানুষকে সংকীর্ণমনা ও মিথ্যার আশ্রয়ী করে তুলেছে। 

পবিত্র কুরআনে আদম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম থেকে শুরু করে দাউদ ও সুলায়মান আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম পর্যন্ত সবার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি ছিল জ্ঞান যা বর্তমানে পাশ্চাত্য কুক্ষিগত করে রেখেছে। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানরা আমেরিকা বা ইসরাইলের প্রযুক্তির বিপরীতে নিজেদের জ্ঞানীয় শক্তি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত নিছক মিছিল বা স্লোগান দিয়ে কোনো স্থায়ী বিজয় আসবে না।

নেতৃত্বের মানদণ্ড হিসেবে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্নত চারিত্রিক গুণাবলি ও ধৈর্যকে মডেল হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানান যেখানে শত্রুর প্রতিও কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ বা কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহৃত হয়নি। তিনি গণতন্ত্রকে গোলাম তৈরির কারখানা হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন এর পুরো কাঠামো মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে যা প্রকৃত নেতা নয় বরং অনুগত দাস তৈরি করে। মুসা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের উদাহরণ টেনে তিনি বুঝিয়েছেন যে যখন কোনো জাতির অন্তরে ঈমান বিল গায়েব বা অদৃশ্যের ওপর অটল বিশ্বাস তৈরি হয় তখনই তারা ফেরাউনের মতো প্রবল শক্তির সামনে দাঁড়ানোর সাহস পায়। জাদুকরদের লাঠি আর মুসা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের লাঠির পার্থক্য ছিল চাক্ষুষ অলীক কল্পনা আর বাস্তব মোজেজার মধ্যে যা কেবল শক্তিশালী ঈমানদাররাই অনুধাবন করতে পারে। 

মুসলমানদের মুক্তির জন্য তিনি পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেছেন যা হলো গভীর জ্ঞান ও শিক্ষা, সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতা, ঈমান বিল গায়েব বা অদৃশ্যের ওপর পূর্ণ ইয়াকিন, বিশুদ্ধ তাওহীদ এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহর সাহায্য। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে বদরের যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত করার জন্য যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সারা রাত অশ্রুসিক্ত নয়নে সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হয় তবে আজকের গুনাহগার উম্মত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও রাতের তাহাজ্জুদ ছাড়া বিজয় অর্জনের কল্পনা করাটাও অবান্তর। 

সালাতকে তিনি আরশের অধিপতির সাথে সরাসরি যোগাযোগের এক শক্তিশালী প্রযুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা মানুষের সব পাসওয়ার্ড বা ফিঙ্গারপ্রিন্টের চেয়েও অধিক কার্যকরী। পরিশেষে তার বার্তা ছিল স্পষ্ট যে বর্তমান রাজনৈতিক গোলকধাঁধা থেকে মুক্তি পেতে হলে মুসলমানদের আবেগ বর্জন করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক শুদ্ধির পথে ফিরে আসতে হবে। দান-সদকা ও সামাজিক কাজের চেয়েও জ্ঞানভিত্তিক বিপ্লব ও শক্তিশালী মিডিয়া হাউস তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। 

আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো বিজয় সম্ভব নয় আর সেই সাহায্য পেতে হলে নিজেদের আমল ও আখলাককে নববী আদর্শে রাঙাতে হবে। শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন প্রকৃত নেতৃত্ব তখনই তৈরি হবে যখন মুসলমানরা মিথ্যার এই গণতান্ত্রিক কালচার থেকে বেরিয়ে সত্যের ওপর অবিচল থাকবে এবং নিজেদের মেধাকে বিদেশের কাছে পাচার হতে না দিয়ে দেশ ও মিল্লাতের সেবায় নিয়োজিত করবে। এই সামগ্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!