শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২

শাবান মাসের ফজিলত ও রামাদানের প্রস্তুতিতে করণীয় ৫টি আমল

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

সময়ের দ্রুত ধাবমান গতিতে আমাদের দুয়ারে আবারও কড়া নাড়ছে পবিত্র মাহে রমজান। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে বছর ঘুরে মুমিনের হৃদয়ে আনন্দের বার্তা পৌঁছাতে আবারও আগমন ঘটছে মহিমান্বিত এই মাসের। ইসলামের ক্যালেন্ডারে রজব মাস বিদায় নিয়েছে এবং শাবান মাস আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে যা মূলত রমজানের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে এবং মুমিনের জন্য প্রস্তুতির এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেয়। পশ্চিম আকাশে যখনই শাবানের একফালি বাঁকা চাঁদ হেসে ওঠে তখনই আল্লাহর প্রিয় বান্দারা নড়েচড়ে বসেন এবং নিজেদের আত্মশুদ্ধির চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেন। শাবান মাস হলো রমজানের ভূমিকা স্বরূপ। যেমন কোনো বড় মেহমান আসার আগে ঘরদোর গুছিয়ে রাখতে হয় ঠিক তেমনি রমজানের মতো মহান মেহমানকে বরণ করার জন্য শাবান মাসে হৃদয়ের আঙিনা পরিষ্কার করতে হয়।

শাবান মাসকে অবহেলায় কাটিয়ে দেওয়া উচিত নয় কারণ এই মাসেই নির্ধারিত হয় রমজানে আমরা কতটা সফল হতে পারব। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই মাসটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং উম্মতকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিতেন যে কীভাবে রমজানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। এই শাবান মাসেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে বান্দার বাৎসরিক আমলনামা পেশ করা হয় যা এই মাসের গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অথচ আফসোসের বিষয় হলো আমাদের সমাজের অনেকেই এই মাসটির ফজিলত সম্পর্কে গাফেল থাকেন এবং গড্ডালিকা প্রবাহে সময় অতিবাহিত করেন। শাবান মাসে রমজানের প্রস্তুতির জন্য আমাদের পাঁচটি সুনির্দিষ্ট আমলের প্রতি মনোনিবেশ করা প্রয়োজন যা হাদিস ও সালাফদের জীবনী থেকে প্রমাণিত।

প্রথমত শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল এবং এটি রমজানের প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সায়্যিদুনা উসামা বিন জায়েদ (রা.) একবার রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করেছিলেন হে আল্লাহর রাসূল আমি আপনাকে শাবান মাসে যত বেশি রোজা রাখতে দেখি অন্য কোনো মাসে তো এত রোজা রাখতে দেখি না এর কারণ কী? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছিলেন এটি এমন একটি মাস যা রজব এবং রমজানের মধ্যবর্তী অথচ মানুষ এই মাসটি সম্পর্কে উদাসীন থাকে এটি এমন একটি মাস যেই মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে বান্দার আমলনামা ওত্থাপন করা হয় তাই আমি পছন্দ করি যে আমার আমলনামা যখন আল্লাহর কাছে পেশ করা হবে তখন যেন আমি রোজাদার অবস্থায় থাকি (সুনানে নাসাঈ, ২৩৫৭)। এই হাদিসটি থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি যে শাবান মাসের রোজা আল্লাহর কাছে কতটা প্রিয় এবং এটি বান্দার আমলনামা পেশ করার মুহূর্তে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে শাবান মাসের চেয়ে বেশি অন্য কোনো মাসে নফল রোজা রাখতে দেখিনি তিনি যেন পুরো শাবান মাসই রোজা রাখতেন (সহীহ আল-বুখারী, ১৯৬৯)। এমনকি উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.) থেকেও বর্ণিত আছে যে তিনি বলেছেন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে শাবান ও রমজান ছাড়া অন্য কোনো দুই মাস টানা রোজা রাখতে দেখিনি (সুনানে তিরমিজি, ৭৩৬)। এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে নবীজি (সা.) শাবান মাসকে রমজানের মহড়া হিসেবে গ্রহণ করতেন যাতে রমজানের ফরজ রোজাগুলো পালন করা শরীরের জন্য সহজ হয়ে যায় এবং কোনো ক্লান্তি বা অবসাদ ইবাদতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

দ্বিতীয়ত সালাতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং জামাতে সালাত আদায়ের অভ্যাস গড়ে তোলা শাবান মাসের অন্যতম প্রধান করণীয়। যদি আমাদের সালাতে কোনো ধরনের গাফিলতি বা অলসতা থেকে থাকে তবে শাবান মাসই হলো সেই অলসতা ঝেড়ে ফেলার উপযুক্ত সময়। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে গিয়ে তাকবীরে উলার সাথে আদায় করার চেষ্টা করতে হবে এবং সালাতের মধ্যে খুশুখুজু বা একাগ্রতা বৃদ্ধির মশক করতে হবে। আমরা যদি এখন থেকেই সালাতে মনোযোগী হতে না পারি তবে রমজানের দীর্ঘ তারাবীহ এবং কিয়ামুল লাইলে মনোযোগ ধরে রাখা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। সালাত হলো মুমিনের মেরাজ এবং আল্লাহর সাথে কথোপকথনের মাধ্যম তাই এই মাধ্যমটিকে শক্তিশালী করার জন্য শাবান মাসে নফল সালাতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।

তৃতীয়ত বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা শাবান মাসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত কারণ রমজান হলো কুরআন নাজিলের মাস আর শাবান হলো সেই কুরআনকে বরণ করার প্রস্তুতির মাস। সালাফদের যুগে শাবান মাসকে কারীদের মাস বা তিলাওয়াতকারীদের মাস বলা হতো। বিখ্যাত তাবেয়ী সালামা বিন কুহাইল (রহ.) বলতেন শাবান মাস হলো কারীদের মাস এবং এই মাসে তিনি অন্য সব কাজ কমিয়ে দিয়ে কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল হয়ে যেতেন। আমর বিন কাইস (রহ.) যখন শাবান মাসের চাঁদ দেখতেন তখন তিনি তার দোকানপাট বন্ধ করে দিতেন এবং নিজেকে সম্পূর্ণভাবে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য ফারেগ করে নিতেন। আমাদেরও উচিত ঘর থেকে ধুলো পড়া কুরআনটি হাতে নেওয়া এবং প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় বের করে অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত করা যাতে রমজানে আমরা কুরআনের গভীরতায় ডুব দিতে পারি।

চতুর্থত কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত হওয়া রমজানের প্রস্তুতির একটি অপরিহার্য অংশ। রমজানে আমরা সাহরি খাওয়ার জন্য শেষ রাতে উঠি কিন্তু শাবান মাসে যদি আমরা এখন থেকেই শেষ রাতে ওঠার অভ্যাস না করি তবে রমজানে হঠাৎ করে ওঠা এবং ইবাদত করা কষ্টকর হতে পারে। তাই এখন থেকেই রাতে ঘুমানোর আগে নিয়ত করা এবং শেষ রাতে উঠে অন্তত দুই চার রাকাত নফল সালাত আদায় করা উচিত। আল্লাহ তাআলা রাতের শেষ প্রহরে প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাকতে থাকেন কে আছো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আমি তাকে ক্ষমা করব কে আছো রিযিক অন্বেষণকারী আমি তাকে রিযিক দেব। এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা কোনো বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ হতে পারে না। তাহাজ্জুদের এই অভ্যাস আমাদের আত্মাকে শক্তিশালী করবে এবং রমজানের সিয়াম ও কিয়ামের জন্য আমাদের শরীর ও মনকে প্রস্তুত করবে।

পঞ্চমত সীমিত পরিসরে হলেও রমজানের রুটিনে এখন থেকেই আমল শুরু করে দেওয়া প্রয়োজন। রমজান এলে হঠাৎ করে আমাদের খাদ্যাভ্যাস ঘুমের সময় এবং দৈনন্দিন রুটিনে বিশাল পরিবর্তন আসে যার ফলে শুরুর দিকে অনেকের শরীর খারাপ হয়ে যায় বা ইবাদতে মনোযোগ থাকে না। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য শাবান মাসেই আমাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা কম খাওয়া কম ঘুমানো এবং বেশি ইবাদত করার অভ্যাস করা উচিত। আমাদের সালাফগণ বলতেন রজব হলো বীজ বপনের মাস শাবান হলো ক্ষেতে পানি সেচ দেওয়ার মাস আর রমজান হলো ফসল ঘরে তোলার মাস। যদি আমরা শাবান মাসে আমাদের ইবাদতের চারাগাছে পানি না দেই অর্থাৎ আমলের মাধ্যমে সেগুলোকে সজীব না করি তবে রমজানে আমরা কাঙ্ক্ষিত ফসল বা রুহানি ফয়দা ঘরে তুলতে পারব না। গাছ যেমন পানি ছাড়া শুকিয়ে যায় এবং ফল দেয় না ঠিক তেমনি শাবান মাসের প্রস্তুতি ছাড়া রমজানের ইবাদতগুলো প্রাণহীন হয়ে পড়তে পারে।

শাবান মাসে আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা। হিংসা বিদ্বেষ অহংকার এবং শিরক থেকে নিজেকে মুক্ত করে এক পবিত্র অন্তর নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে জান্নাতই হবে তার আবাস (সূরা আন-নাযিআত, ৭৯:৪০-৪১)। এই আয়াতকে সামনে রেখে আমাদের নফসের সাথে জিহাদ করতে হবে এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। শাবান মাসে নবীজি (সা.) যে আমলগুলো করতেন সেগুলো আমাদের জন্য পাথেয়। তিনি কখনো অলসতাকে প্রশ্রয় দিতেন না বরং ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। আমাদেরও উচিত নবীজির সুন্নাহ অনুসরণ করে এই মাসটিকে অবহেলায় না কাটিয়ে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো। মনে রাখতে হবে হায়াত ও মউত আল্লাহর হাতে আমরা জানি না আগামী রমজান আমাদের নসিবে আছে কি না কিংবা এই শাবানই আমাদের জীবনের শেষ সুযোগ কি না। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে গনীমত মনে করে আমল করতে হবে। দুনিয়ার ব্যস্ততা ও মোহ আমাদের আখেরাত ভুলিয়ে রেখেছে কিন্তু কবরের অন্ধকার ও হাশরের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে এখনই আমাদের জেগে উঠতে হবে। সামান্য দুনিয়াবি লাভের জন্য আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করি কিন্তু অনন্তকালের সুখের জন্য আমরা কি দৈনিক কিছুক্ষণ সময় বের করতে পারি না? শাবান মাস আমাদেরকে সেই সুযোগই দিচ্ছে থাকার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া আল্লাহর প্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া এবং গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার শপথ নেওয়া। আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি এই শাবান মাসকে আমরা আমাদের জীবনের সেরা প্রস্তুতিমূলক মাস হিসেবে গ্রহণ করব। আমরা বেশি বেশি নফল রোজা রাখব জামাতে সালাত আদায়ে যত্নবান হব কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর করব তাহাজ্জুদে চোখের পানি ফেলব এবং নিজেদের দৈনন্দিন রুটিনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী সাজিয়ে নেব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শাবান মাসের হক আদায় করার এবং রমজানের পূর্ণাঙ্গ বরকত হাসিল করার তৌফিক দান করুন আমাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে নেককার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

ফিকহ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!