রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২

আইফোন-স্যামসাং কেনার দিন শেষ? ২৯ শতাংশ গ্রাহক এখন লিজ নিতে আগ্রহী

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ১১:৫৭ পিএম
আইফোন-স্যামসাং কেনার দিন শেষ? ২৯ শতাংশ গ্রাহক এখন লিজ নিতে আগ্রহী

বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন ব্যবহারের ধরন এবং কেনার অভ্যাসে এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এখন ক্রেতারা সরাসরি ফোন কেনার বদলে তা লিজ বা ভাড়ায় নেওয়ার দিকে বেশি ঝুঁকছেন। অলস্টেট প্রটেকশন প্ল্যানস-এর ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের এক জরিপ অনুযায়ী দেশটির প্রায় ২৯ শতাংশ স্মার্টফোন মালিক এখন তাদের পরবর্তী ডিভাইসের জন্য লিজ নেওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতি বছর নতুন মডেলের ফোন কেনা একটি আভিজাত্যের প্রতীক ছিল, সেখানে বর্তমানের এই পরিসংখ্যান নির্দেশ করছে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি বা ‘আপগ্রেড কালচার’ ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আকাশছোঁয়া দাম এবং নতুন মডেলে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের অভাব গ্রাহকদের মালিকানা থেকে সরে এসে সেবার দিকে ধাবিত করছে। মূলত অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে গ্রাহকরা এখন ১২০০ ডলার বা তার বেশি খরচ করে একটি ফোন কেনাকে অযৌক্তিক মনে করছেন এবং মাসিক কিস্তিতে বা লিজের মাধ্যমে তা ব্যবহারের সুবিধা খুঁজছেন।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে কাজ করছে বেশ কিছু গভীর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কারণ। ট্রেন্ডফোর্স-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে স্মার্টফোনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল মেমোরি চিপের দাম গত এক বছরে প্রায় ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ফোন তৈরির খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে যা সরাসরি গ্রাহকদের পকেটে প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে একটি প্রিমিয়াম ফোনের মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই চলে যায় মেমোরি ও স্টোরেজ কম্পোনেন্টের পেছনে। ফলে কোম্পানিগুলো ফোনের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে এবং ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় লিজ নেওয়ার পদ্ধতিটি একটি সহজ সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। লিজের মাধ্যমে গ্রাহকরা কোনো বিশাল অঙ্কের অগ্রিম টাকা ছাড়াই আধুনিক ফোন ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর ফোনটি পরিবর্তন করার নমনীয়তাও বজায় থাকছে।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে স্মার্টফোন কোম্পানিগুলো এখন তাদের হার্ডওয়্যারের চেয়ে সফটওয়্যার সাপোর্টের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। গুগল এবং স্যামসাংয়ের মতো জায়ান্টরা এখন তাদের প্রিমিয়াম ফোনে সাত বছর পর্যন্ত সিকিউরিটি এবং ওএস আপডেটের নিশ্চয়তা দিচ্ছে যা অ্যাপলও দীর্ঘদিন ধরে বজায় রেখেছে। এর ফলে একটি তিন বা চার বছরের পুরনো ফোনও এখন নতুনের মতো সচল থাকছে এবং ব্যবহারকারীদের মধ্যে দ্রুত ফোন বদলানোর তাগিদ কমে যাচ্ছে। অলস্টেট-এর জরিপে দেখা গেছে যে আমেরিকার মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ এখন ১২ মাসের মধ্যে ফোন পরিবর্তন করেন। অন্যদিকে ৪ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত ফোন ব্যবহার করা মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যেহেতু ফোনটি দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যাচ্ছে এবং কোম্পানিগুলোই এটি মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিচ্ছে, তাই গ্রাহকরা মনে করছেন এটি কেনার চেয়ে লিজ নেওয়া বা ‘ডিভাইস-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ মডেল গ্রহণ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী।

আরেকটি মজার বিষয় হলো বর্তমানে ফোনের বিপণনে ‘এআই’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফিচারগুলোকে যেভাবে বড় করে দেখানো হচ্ছে, সাধারণ গ্রাহকরা তার ওপর খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। জরিপ অনুযায়ী মাত্র ১৭ শতাংশ গ্রাহক এআই ফিচারের ওপর ভিত্তি করে ফোন কেনার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো ব্যাটারি লাইফ। ২০২৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ফোন কেনার প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাটারি লাইফ তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে। মানুষ চায় তাদের ফোনটি যেন একবার চার্জ দিলে সারাদিন নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেয় এবং কয়েক বছর ব্যবহারের পরেও যেন ব্যাটারির সক্ষমতা বজায় থাকে। কোম্পানিগুলো যখন শত শত এআই ফিচার দিয়ে বিজ্ঞাপনী প্রচারণা চালাচ্ছে, গ্রাহকরা তখন খুঁজছেন স্থায়িত্ব এবং সাশ্রয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই মূলত লিজ নেওয়ার বাজারকে শক্তিশালী করছে কারণ লিজ চুক্তিতে সাধারণত ব্যাটারি বা অন্য কোনো হার্ডওয়্যার সমস্যার ক্ষেত্রে দ্রুত রিপ্লেসমেন্ট বা সার্ভিসিংয়ের সুবিধা থাকে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন যে এই প্রবণতাটি কেবল সাময়িক কোনো বিষয় নয় বরং এটি বিশ্বব্যাপী ভোক্তা আচরণের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন। বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে তাতে নগদ এককালীন অর্থ ব্যয় করে একটি ডিজিটাল যন্ত্র কেনা অনেক পরিবারের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ছে। লিজ বা সাবস্ক্রিপশন ভিত্তিক মডেলগুলো গ্রাহককে অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি দিচ্ছে এবং প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলার সুযোগ করে দিচ্ছে। এছাড়া পরিবেশগত সচেতনতাও এখানে একটি ভূমিকা রাখছে। লিজ নেওয়া ফোনের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো সাধারণত পুরনো ফোনটি ফেরত নিয়ে তা রিসাইকেল বা রিফারবিশ করে পুনরায় বাজারে ছাড়ে যা ই-বর্জ্য কমাতে সাহায্য করে। যদিও এখনও অনেকে পুরনো ফোন ব্যাটারি ব্যাকআপ হিসেবে রেখে দেন তবে রিসাইক্লিং ও রিফারবিশড ফোনের জনপ্রিয়তা এই লিজ বাজারকে আরও টেকসই করে তুলছে।

স্মার্টফোন নির্মাতা এবং ক্যারিয়ার কোম্পানিগুলোও এই নতুন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা এখন সরাসরি ফোন বিক্রির চেয়ে বিভিন্ন লিজ প্যাকেজ এবং ইনস্যুরেন্স প্ল্যান তৈরিতে বেশি মনোযোগী হচ্ছে। এর ফলে গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের ইকোসিস্টেমে আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে। যদি কোনো গ্রাহক লিজের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির ফোন ব্যবহার শুরু করেন তবে তার অন্য কোম্পানিতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায় কারণ লিজের চুক্তিতে পরবর্তী মডেলে আপগ্রেড করার সুবিধা আগে থেকেই যুক্ত থাকে। এটি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি নিশ্চিত আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করছে। দক্ষিণ এশীয় বাজারে এই লিজ প্রথা এখনও খুব একটা জনপ্রিয় না হলেও উন্নত দেশগুলোর এই পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির মালিকানার চেয়ে তার ব্যবহার বা অ্যাক্সেস পাওয়ার বিষয়টিই বেশি প্রাধান্য পাবে।

পরিশেষে বলা যায় যে স্মার্টফোন এখন আর কেবল একটি গ্যাজেট বা শখের বস্তু নয় বরং এটি মানুষের জীবনের একটি অপরিহার্য বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। যখন কোনো পণ্য বিলাসদ্রব্য থেকে অপরিহার্য দ্রব্যে পরিণত হয় তখন তার বাজার কাঠামোও পরিবর্তিত হয়। আমেরিকান গ্রাহকদের লিজের প্রতি এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহ প্রমাণ করে যে মানুষ এখন প্রযুক্তির গ্ল্যামারের চেয়ে তার কার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেশি মূল্যায়ন করছে। আইফোন বা গ্যালাক্সি এস সিরিজের মতো ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোর দাম যদি বর্তমান গতিতে বাড়তে থাকে তবে মালিকানা সংস্কৃতির পুরোপুরি বিলুপ্তি কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটি প্রযুক্তির গণতান্ত্রিকীকরণেও ভূমিকা রাখতে পারে কারণ লিজের মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে উন্নত প্রযুক্তির ডিভাইস পৌঁছানো সম্ভব হবে যা সরাসরি কেনা অনেকের জন্যই অসম্ভব।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

প্রযুক্তি বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!