হাঙ্গেরির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সোম্বাথেলিতে একটি পরিত্যক্ত পাবকে মুসলিম প্রার্থনা কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র উত্তেজনা ও বিভক্তি তৈরি হয়েছে। শহরটির মুসলিম জনসংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও কট্টরপন্থী এবং রক্ষণশীল সমালোচকরা এই উদ্যোগকে হাঙ্গেরির ‘খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য’-এর প্রতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করছেন। হাঙ্গেরিয়ান ইসলামিক কমিউনিটি নামক একটি সংগঠন সম্প্রতি ওই শহরের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া আতিথেয়তা কেন্দ্র বা পাব ক্রয় করে এবং সেটিকে একটি মসজিদ ও সামাজিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার ঘোষণা দেয়।
সংস্থাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাঙ্গেরীয়, ইংরেজি এবং তুর্কি ভাষায় এক বার্তায় জানায় যে তারা এই স্থানটিকে ‘বিশ্বাস, শান্তি এবং সম্প্রীতির একটি ঘর’ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। বিশেষ করে আসন্ন পবিত্র রমজান মাসের মধ্যেই কেন্দ্রটি চালু করার বিষয়ে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। বর্তমানে ভবনটির সংস্কার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে, যা এই বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে।
এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ একটি অনলাইন ও অফলাইন পিটিশন শুরু করেছে যেখানে ইতিমধ্যে প্রায় ১০ হাজার মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। বিরোধীদের প্রধান অভিযোগ হলো যে শহর কর্তৃপক্ষ এই সংবেদনশীল প্রকল্পটি অনুমোদন করার আগে সাধারণ জনগণের সাথে কোনো পরামর্শ বা আলোচনা করেনি। বিশেষ করে সোম্বাথেলির মেয়র আন্দ্রাস নেমেনি-র বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে যে তিনি কোনো জনমত যাচাই না করেই এই প্রকল্পের সবুজ সংকেত দিয়েছেন। আন্দ্রাস নেমেনি আগে হাঙ্গেরিয়ান সোশ্যালিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন এবং বর্তমানে স্বতন্ত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এই ইস্যুটিকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে বলে স্থানীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন। পিটিশনের ভাষা সরাসরি মুসলিম বিরোধী না হলেও এতে দাবি করা হয়েছে যে এই প্রার্থনা কেন্দ্রটি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতীক। স্বাক্ষরকারীদের মতে হাঙ্গেরির ‘খ্রিস্টীয় জাতীয় ঐতিহ্য’ হুমকির মুখে পড়ছে এবং তারা পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মতো হাঙ্গেরিতেও ‘প্যারালাল কমিউনিটি’ বা সমান্তরাল সমাজ গড়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো সোম্বাথেলি এবং এর আশপাশে বসবাসরত মুসলিমদের সংখ্যা মাত্র ১২০ জনের মতো যাদের বেশিরভাগই তুর্কি বংশোদ্ভূত। এত ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সাধারণ প্রার্থনা কক্ষ কীভাবে একটি জাতির ঐতিহ্যের জন্য হুমকি হতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তবে বিরোধিতাকারীদের মধ্যে কেউ কেউ ১৫২৬ সালের ঐতিহাসিক ‘মোহাকসের যুদ্ধ’-এর কথা টেনে আনছেন। ওই যুদ্ধে অটোমান তুর্কি বাহিনীর হাতে হাঙ্গেরীয় সেনাবাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল।
এখন সেই ঐতিহাসিক পরাজয়ের ৫০০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে একটি ছোট প্রার্থনা কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টিকে অনেক উগ্রবাদী গোষ্ঠী প্রতীকী যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। ঐতিহাসিকরা অবশ্য বলছেন যে ১৬শ শতাব্দীর একটি সামরিক পরাজয়কে বর্তমানের একটি ছোট ধর্মীয় সংস্কার কাজের সাথে তুলনা করা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর এবং এটি জনমনে অহেতুক ভীতি ও উত্তেজনা ছড়ানোর একটি অপচেষ্টা মাত্র। হাঙ্গেরির মতো মধ্য ইউরোপীয় দেশগুলোতে ইসলামভীতি বা ইসলামোফোবিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা দীর্ঘদিনের, যা এই ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রকল্পের সমর্থক এবং হাঙ্গেরিয়ান ইসলামিক কমিউনিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এই কেন্দ্রটি কোনো জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সংকেত নয় বরং এটি আগে থেকেই উপস্থিত থাকা একটি ছোট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রয়োজন মেটানোর একটি সুশৃঙ্খল প্রচেষ্টা মাত্র। হাঙ্গেরির সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং যেকোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী আইন মেনে তাদের উপাসনালয় স্থাপন করতে পারে। সেটি গির্জা, সিনাগগ কিংবা মসজিদ যাই হোক না কেন আইনের দৃষ্টিতে তা সুরক্ষিত।
মানবাধিকার রক্ষাকারীরা যুক্তি দিচ্ছেন যে একটি জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার করে সেখানে উপাসনার ব্যবস্থা করা যদি সভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয় তবে তা আসলে সহনশীলতার অভাবকেই প্রকাশ করে। স্থানীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ঘৃণা ছড়ানো বা তাদের কলঙ্কিত করা হাঙ্গেরির আইনি কাঠামোর পরিপন্থী।
শহর কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ করার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। তবে উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। মেয়র আন্দ্রাস নেমেনি দাবি করেছেন যে এটি একটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ভবনের সংস্কার কাজ যা প্রচলিত নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামিক কমিউনিটি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তাদের এই কেন্দ্রের উদ্দেশ্য হলো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে উৎসাহিত করা।
হাঙ্গেরির মতো দেশে যেখানে গত কয়েক বছরে অভিবাসন বিরোধী রাজনীতি অত্যন্ত প্রবল সেখানে এই ধরনের ছোট একটি স্থানীয় ইস্যুও জাতীয় বিতর্কের রূপ নিয়েছে। সোম্বাথেলির এই ঘটনাটি কেবল একটি মসজিদ বা প্রার্থনা কেন্দ্রের বিষয় নয় বরং এটি আধুনিক ইউরোপে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদের মধ্যবর্তী দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের একটি প্রতিফলন। সাধারণ মানুষ এবং সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে যে বিদ্বেষের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব যা একটি বহুসাংস্কৃতিক সমাজের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

আপনার মতামত লিখুন :