মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা তার সমগ্র অতীতকে মুছে দিয়ে এক নতুন ভবিষ্যতের সূচনা করতে পারে। পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকের যেকোনো একটি রজনী হতে পারে সেই মহিমান্বিত ক্ষণ যাকে আমরা লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত হিসেবে জানি। এটি কেবল একটি রাত নয় বরং এটি মুমিনের গন্তব্য বদলে দেওয়ার এক অনন্য সুযোগ। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই রাতের গুরুত্ব বর্ণনা করে পবিত্র কুরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেছেন যেখানে তিনি ইরশাদ করেছেন যে আমি কুরআন নাযিল করেছি কদরের রাতে এবং এই রাতটি হাজার মাসের চাইতেও বেশি উত্তম (সূরা আল-কদর, ৯৭:১-৩)। এই বাণীর গভীরতা উপলব্ধি করলে দেখা যায় যে একজন মানুষের গড় আয়ু যদি ষাট বা সত্তর বছর হয় তবে তার জীবনের একটি বড় অংশই কেটে যায় শৈশব, ঘুম, কর্মস্থল এবং সামাজিকতায়। প্রকৃত ইবাদতের জন্য বরাদ্দ সময় খুবই সীমিত। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদীকে এমন এক রজনী দান করেছেন যার একটি রাতের ইবাদত তিরাশি বছর চার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াব বয়ে আনে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক উপহার যা মূলত বান্দাকে জান্নাতে পৌঁছে দেওয়ার একটি বিশেষ অজুহাত মাত্র।
লাইলাতুল কদরের সময়কাল নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভিন্ন মত থাকলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন লাইলাতুল কদরকে রমজানের শেষ দশ রাতের মধ্যে অনুসন্ধান করতে (সহীহ আল-বুখারী, ২০২০)। যদিও আমাদের সমাজে সাতাশতম রজনীকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় তবে হাদিসের আলোকে শেষ দশকের প্রতিটি বেজোড় রাত এবং সামগ্রিকভাবে দশটি রাতই ইবাদতের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি অনেকটা এমন যে কোনো নিশ্চিত লটারির দশটি টিকেটের মধ্যে একটিতে বড় পুরস্কার আছে এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তি সেই পুরস্কার নিশ্চিত করতে দশটি টিকেটই সংগ্রহ করে। ঠিক তেমনি কদরের বরকত থেকে বঞ্চিত না হতে চাইলে শেষ দশ রাতের প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদতে কাটানো বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে যখন রমজানের শেষ দিকে অনেক মসজিদে খতম তারাবি শেষ হয়ে যায় তখন অলসতা না করে বরং ইবাদতের গতি আরও বাড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ছিল রমজানের শেষ দশ দিন তিনি কোমর বেঁধে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতেন এবং নিজের পরিবারকেও জাগিয়ে তুলতেন (সহীহ আল-বুখারী, ২০২৪)। এই সময়ে ব্যক্তিগত ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া প্রত্যেকের ঈমানি দায়িত্ব। যারা নিয়মিত নামাজে অভ্যস্ত নন তাদের জন্য এই দশ রাত হতে পারে নামাজের অভ্যাসের সূচনা এবং যারা নিয়মিত নামাজ পড়েন তাদের জন্য নফল ইবাদতের বসন্তকাল। এই রাতের অন্যতম সহজ ও কার্যকরী আমল হলো এশা এবং ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি জামাতের সাথে এশা ও ফজরের নামাজ আদায় করল সে যেন সারারাত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ল (সহীহ মুসলিম, ৬৫৬)। অর্থাৎ কেবল এই দুটি নামাজ জামাতে আদায়ের মাধ্যমে একজন মুমিন সারারাত ইবাদতের সওয়াব নিশ্চিত করতে পারেন যা লাইলাতুল কদরের রাতে হাজার মাসের সওয়াবে পরিণত হয়।
নামাজের পাশাপাশি এই রাতে দীর্ঘ সময় সিজদায় কাটানো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা অত্যন্ত জরুরি। সিজদা হলো বান্দার আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার সময়। এই সময়ে নিজের ভাষায় নিজের সকল পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করা উচিত। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কদরের রাতের দোয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন তখন তিনি তাকে একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছিলেন যা হলো আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি (জামে তিরমিজি, ৩৫১৩)। এর অর্থ হলো হে আল্লাহ আপনি ক্ষমাশীল এবং ক্ষমা করতে ভালোবাসেন তাই আমাকে ক্ষমা করুন। এই দোয়াটি এই রাতের মূল নির্যাস কারণ আল্লাহর ক্ষমা পেয়ে গেলে একজন মানুষের আর কোনো কিছুর অভাব থাকে না। এমনকি ঋতুস্রাব বা অন্য কোনো কারণে যেসব বোনেরা নামাজ পড়তে পারেন না তারাও জিকির, তাসবীহ এবং এই দোয়ার মাধ্যমে কদরের পূর্ণ ফজিলত লাভ করতে পারেন।
লাইলাতুল কদর হলো রহমত ও শান্তির রাত যা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এই রাতে জিবরাঈল আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে অগণিত ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং আল্লাহর নির্দেশে বিভিন্ন হুকুম নিয়ে ফেরেশতারা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েন। মুমিনের ইবাদতের মজলিসগুলোতে তারা শরিক হন এবং শান্তিময় পরিবেশ তৈরি করেন। এই মহাজাগতিক ইবাদতের মিছিলে শরিক হওয়ার সুযোগ কেবল রমজানের এই শেষ দিনগুলোতেই সম্ভব। আমাদের উচিত হবে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং সাধ্যমতো সাদাকাহ করার মাধ্যমে এই রাতগুলোকে রাঙিয়ে তোলা। কোনো একটি রাতও যেন অবহেলায় পার না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহিমান্বিত রাতের সন্ধান দিন এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।

আপনার মতামত লিখুন :