রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২

মেটার নতুন স্মার্ট চশমা: ২০২৬ সালে আসছে চেহারা চেনার বিতর্কিত প্রযুক্তি

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ১২:০০ এএম
মেটার নতুন স্মার্ট চশমা: ২০২৬ সালে আসছে চেহারা চেনার বিতর্কিত প্রযুক্তি

বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা তাদের রে-ব্যান স্মার্ট চশমার জন্য ‘নেম ট্যাগ’ (Name Tag) নামক একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ফেসিয়াল রিকগনিশন বা চেহারা চেনার প্রযুক্তি চালু করার পরিকল্পনা করছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এই ফিচারটি বাজারে আসার কথা রয়েছে যা পরিধানকারীকে রাস্তার যেকোনো পথচারীর পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে সাহায্য করবে। সম্প্রতি মেটার ফাঁস হওয়া কিছু অভ্যন্তরীণ নথি থেকে জানা গেছে যে প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত সুকৌশলে এমন একটি সময়ে এই প্রযুক্তিটি চালু করতে চায় যখন সাধারণ মানুষ এবং প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যস্ত থাকবে। মেটা মনে করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী পরিবর্তনের ডামাডোলে তাদের এই নজরদারি প্রযুক্তির বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ গড়ে উঠবে না। মেটার রিয়েলিটি ল্যাবসের একটি নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে তারা একটি ‘ডাইনামিক পলিটিক্যাল এনভায়রনমেন্ট’-এর অপেক্ষায় আছে যাতে প্রাইভেসির তোয়াক্কা না করেই এই বিতর্কিত ফিচারটি বাজারে আনা যায়।

মেটার এই নতুন ফিচারটি রে-ব্যান স্মার্ট চশমার ক্যামেরাকে একটি শক্তিশালী নজরদারি যন্ত্রে পরিণত করবে। মেটা এআই (Meta AI)-এর সাহায্যে চশমা পরিধানকারী ব্যক্তি তার সামনে থাকা কোনো মানুষের দিকে তাকালেই তার নাম এবং মেটা অ্যাকাউন্টের তথ্য পেয়ে যেতে পারেন। যদিও মেটা দাবি করেছে যে প্রাথমিকভাবে এটি কেবল ব্যবহারকারীর পরিচিত বন্ধু-বান্ধব বা যাদের পাবলিক প্রোফাইল আছে তাদের ক্ষেত্রেই কাজ করবে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এটি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলবে। ইতিমধ্যেই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী দেখিয়েছেন যে কীভাবে মেটার এই চশমা এবং ওপেন-সোর্স ডাটাবেস ব্যবহার করে রিয়েল-টাইম ‘ডক্সিং’ বা মানুষের ব্যক্তিগত ঠিকানা ও ফোন নম্বর বের করে ফেলা সম্ভব। সেই পরীক্ষায় দেখা গেছে একজন অচেনা মানুষের দিকে তাকিয়েই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার জীবনবৃত্তান্ত বের করে ফেলা যাচ্ছে যা অপরাধীদের জন্য একটি ভয়াবহ হাতিয়ার হতে পারে।

উল্লেখ্য যে ২০২১ সালে মেটা (তৎকালীন ফেসবুক) তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেমটি বন্ধ করে দিয়েছিল। সে সময় প্রায় এক বিলিয়ন মানুষের ফেসপ্রিন্ট ডাটা মুছে ফেলার ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বলেছিল যে তারা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়ে আরও সচেতন হতে চায়। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই একই প্রযুক্তি আবার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তবে এবার তা সরাসরি মানুষের চোখের সামনে চশমার লেন্সে বসানো হচ্ছে। ২০২৫ সালে মেটা তাদের পার্টনার এসিলরলাক্সোটিকা (EssilorLuxottica)-এর মাধ্যমে প্রায় ৭০ লক্ষ জোড়া স্মার্ট চশমা বিক্রি করেছে যা নির্দেশ করে যে বিশ্বব্যাপী একটি বিশাল গোপন নজরদারি নেটওয়ার্ক ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে। প্রাইভেসি অ্যাডভোকেটরা সর্তক করে বলেছেন যে স্মার্ট চশমার ক্যামেরাগুলো এতটাই ছোট যে সাধারণ মানুষের পক্ষে এটি বোঝা কঠিন যে তাদের ছবি তোলা হচ্ছে নাকি লাইভ স্ক্যান করা হচ্ছে। চশমার গায়ে থাকা একটি ছোট এলইডি আলো ছবি তোলার সময় জ্বলে উঠলেও সেটিকে স্টিকার দিয়ে ঢেকে রাখা বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া খুবই সহজ যা অপরাধীদের জন্য বাড়তি সুবিধা।

আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (ACLU) এবং ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন (EFF)-এর মতো সংগঠনগুলো মেটার এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে এটি জনগণের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের ওপর একটি বড় আঘাত। বিশেষ করে প্রতিবাদী আন্দোলনকারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত নজরদারির পথ সুগম হবে। টেক্সাস এবং ইলিনয়ের মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে মেটা ইতিপূর্বে বায়োমেট্রিক ডাটা চুরির অভিযোগে শত শত কোটি ডলার জরিমানা গুনেছে। তবুও মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ এই প্রযুক্তিটি চালুর বিষয়ে অনড় বলে জানা গেছে। অভ্যন্তরীণ নথিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে মেটা প্রথমে দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের সাহায্য করার নাম করে এই ফিচারটির একটি ‘সফট লঞ্চ’ করতে পারে যাতে জনমনে এটি নিয়ে একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে এটি সাধারণ বাণিজ্যিক গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে গেলে প্রকাশ্য স্থানে সাধারণ মানুষের ‘অজ্ঞাত থাকা’ বা অ্যানোনিমিটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।

প্রযুক্তিবিদরা মনে করছেন মেটার এই নতুন পরিকল্পনা বিশ্বজুড়ে নজরদারি সংস্কৃতির এক নতুন যুগের সূচনা করবে। যেখানে প্রতিটি চশমা পরিহিত ব্যক্তি একজন সম্ভাব্য গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করবেন। ব্যক্তিগত তথ্য এখন আর কেবল অনলাইনে সীমাবদ্ধ নয় বরং ঘরের বাইরে পা দিলেই আপনার চেহারা হয়ে উঠবে একটি সার্চযোগ্য ডাটা। মেটা যদিও বলছে তারা বিষয়টি নিয়ে ‘চিন্তাভাবনা’ করছে এবং একটি ‘সতর্ক পদ্ধতি’ অবলম্বন করবে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ গোপন নথিগুলো মেটার উদ্দেশ্য নিয়ে বড় ধরণের প্রশ্ন তুলেছে। প্রযুক্তি যখন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করছে তখন এই ধরণের নজরদারি প্রযুক্তি জননিরাপত্তার জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ২০২৬ সালের এই সম্ভাব্য লঞ্চটি যদি সফল হয় তবে সাধারণ মানুষের প্রাইভেসি কেবল কাগুজে অধিকার হিসেবেই থেকে যাবে।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

প্রযুক্তি বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!