রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২

ইমাম মাহদী ও বৈশ্বিক ত্রাণকর্তার ধারণা: বিভিন্ন ধর্মের মিল ও পার্থক্য

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
ইমাম মাহদী ও বৈশ্বিক ত্রাণকর্তার ধারণা: বিভিন্ন ধর্মের মিল ও পার্থক্য

শান্তি ও ন্যায়ের প্রতীক্ষায় বিশ্ব

আমরা বর্তমানে এমন এক জটিল ও অস্থির যুগে বাস করছি যেখানে বিশ্বজুড়ে অন্যায়, অবিচার এবং বিশৃঙ্খলা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্মগুলোতে একজন মহান ত্রাণকর্তার আগমনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে। কেবল মুসলিমরাই নন বরং পৃথিবীর প্রায় সকল বড় ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই একজন অতিমানবীয় ব্যক্তিত্বের আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী প্রচলিত আছে যিনি পৃথিবীকে পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করবেন। হিন্দু ধর্মে যাকে ‍‍`কল্কি অবতার‍‍` বলা হয়, খ্রিস্টানরা যাকে ‍‍`যীশু খ্রীষ্ট‍‍` বা হযরত ঈসা (আ.)-এর দ্বিতীয় আগমন হিসেবে বিশ্বাস করে এবং ইহুদিরা যাদের ‍‍`মাসীহ্‍‍` বা মেসায়াহ-এর জন্য দীর্ঘকাল প্রতীক্ষা করছে। মুসলিমদের আকিদা অনুযায়ী ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমনের সাথে এই বৈশ্বিক বিশ্বাসগুলোর একটি গভীর ও রহস্যময় সম্পর্ক রয়েছে যা একজন সচেতন মুমিনের জন্য জানা অত্যন্ত জরুরি। এই বৈশ্বিক বিশ্বাসগুলোর সঠিক সমন্বয় এবং ইসলামের সুমহান শিক্ষার আলোকে এর সত্যতা অনুধাবন করতে না পারলে বর্তমান ফিতনার যুগে বিভ্রান্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।

ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমন মুসলিম উম্মাহর জন্য কোনো সাধারণ ঘটনা নয় বরং এটি কিয়ামতের অন্যতম বড় আলামত এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর অকাট্য ভবিষ্যদ্বাণী। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো এই বিশ্বাসের একটি বিশ্বজনীন রূপ আমরা অন্যান্য ধর্মগুলোতেও দেখতে পাই। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে মানবজাতি যখনই চরম সংকটে পতিত হয়েছে তখনই তারা একজন ঐশী নেতার স্বপ্ন দেখেছে। এই স্বপ্ন বা বিশ্বাস কোনো নিছক কল্পনা নয় বরং এটি প্রমাণ করে যে মানুষের অন্তরে আদি থেকেই এক পরম সত্যের বীজ বপন করা হয়েছিল। ইসলামি শরীয়তের আলোকে ইমাম মাহদী (আ.) হলেন সেই ব্যক্তি যিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বংশধারায় আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীতে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। অন্যান্য ধর্মে যে ত্রাণকর্তার কথা বলা হয়েছে তার সাথে ইমাম মাহদীর চারিত্রিক ও আদর্শিক মিলগুলো এক গভীর সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।

খ্রিস্টান ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী যীশু খ্রীষ্ট বা হযরত ঈসা (আ.) শেষ সময়ে পৃথিবীতে পুনরায় অবতরণ করবেন। ইসলামি আকিদাতেও হযরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ইসলাম এখানে একটি সূক্ষ্ম ও চমৎকার সমন্বয় পেশ করেছে। হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম মাহদী (আ.) যখন পৃথিবীতে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করবেন ঠিক সেই সময়ে সিরিয়ার দামেস্কের সাদা মিনারে হযরত ঈসা (আ.) অবতরণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীস অনুযায়ী ঈসা (আ.) পৃথিবীতে এসে ইমাম মাহদী (আ.)-এর পেছনে সালাত আদায় করবেন (সহীহ মুসলিম, ২৯০)। এটি প্রমাণ করে যে খ্রিস্টানরা যার প্রতীক্ষায় আছে এবং মুসলিমরা যাকে পাওয়ার আশা করে তারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। এই যৌথ নেতৃত্বই প্রমাণ করে যে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত পরিকল্পনাটি ঐশীভাবে নির্ধারিত।

অন্যদিকে ইহুদি ধর্মে ‍‍`মাসীহ্‍‍` বা মেসায়াহ-এর ধারণাটি অত্যন্ত প্রবল। তারা বিশ্বাস করে একজন দাউদীয় বংশধর এসে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে বিশ্বশক্তিতে রূপান্তরিত করবেন। তবে এখানে একটি বিশাল তাত্ত্বিক পার্থক্য এবং বিভ্রান্তির জায়গা রয়েছে। ইহুদিরা যার প্রতীক্ষায় আছে ইসলাম তাকে ‍‍`দাজ্জাল‍‍` বা মিথ্যা মসীহ্ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইসলামি ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী দাজ্জাল যখন নিজেকে মসীহ্ হিসেবে দাবি করবে তখন ইহুদিদের একটি বড় অংশ তাকে অনুসরণ করবে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো দাজ্জাল হবে ধ্বংসের প্রতীক আর ইমাম মাহদী ও হযরত ঈসা (আ.) হবেন সত্যের প্রতীক। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করে ইহুদিদের এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের অবসান ঘটাবেন। ফলে ইহুদিদের ত্রাণকর্তার ধারণাটি বিকৃত হলেও এর মূলে একজন শক্তিশালী নেতার আগমনের যে বিশ্বাস ছিল তা ইসলামি ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের সাথে মিলে যায়।

সনাতন বা হিন্দু ধর্মের দিকে তাকালে আমরা ‍‍`কল্কি অবতার‍‍`-এর কথা জানতে পারি। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী কলিযুগের সমাপ্তিতে যখন অধর্ম চরমে পৌঁছাবে তখন বিষ্ণুর দশম অবতার হিসেবে কল্কি পৃথিবীতে আসবেন। তিনি শ্বেত ঘোড়ায় চড়ে তলোয়ার হাতে দুষ্টের দমন করবেন এবং সত্যযুগ ফিরিয়ে আনবেন। এখানে কল্কি অবতারের আগমনের উদ্দেশ্য এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমনের উদ্দেশ্য অভিন্ন। উভয়েই অন্যায়ের অন্ধকার দূর করে পৃথিবীতে এক বিশুদ্ধ সত্যের আলো ছড়িয়ে দেবেন বলে বিশ্বাস করা হয়। যদিও এই বর্ণনার উৎস ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন তবুও এই বৈশ্বিক ঐকমত্য প্রমাণ করে যে আখেরী যামানার ভয়াবহতা সম্পর্কে প্রতিটি জাতিকে সতর্ক করা হয়েছিল। একজন মুমিন যখন এই মিলগুলো দেখেন তখন তার ঈমান আরও মজবুত হয় কারণ তিনি বুঝতে পারেন যে ইসলামের প্রতিটি ভবিষ্যদ্বাণী কতটা নিখুঁত এবং বিশ্বজনীন।

এই বৈশ্বিক বিশ্বাসগুলোর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এটি কেবল ধর্মীয় আলোচনার বিষয় নয় বরং এটি প্রমাণ করে যে মানবজাতির মুক্তি এবং হিদায়াতের জন্য আল্লাহ তাআলা প্রতিটি যুগে নবী-রাসূলদের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কালক্রমে সেই বার্তাগুলোর রূপ পরিবর্তিত হলেও এর মূল কাঠামোটি রয়ে গেছে। ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমন যখন ঘটবে তখন তিনি কেবল মুসলিমদের রাজনৈতিক নেতা হবেন না বরং তিনি হবেন মানবতার জন্য এক পরম আশ্রয়স্থল। তাঁর আগমনে পৃথিবীর সকল জুলুম ও শোষণ বিদায় নেবে। এই মহাসত্যটি অনুধাবন করার জন্য বর্তমান যুগে সঠিক ইলম বা জ্ঞান অর্জন করা জরুরি। কারণ দাজ্জালি ফিতনার এই যুগে অনেকেই ভণ্ড মাহদী সেজে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতে পারে।

মুসলিম হিসেবে বর্তমান সময়ে আমাদের দায়িত্ব হলো নিজেদের ঈমানকে রক্ষা করা এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমনের জন্য নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলা। কেবল অলসভাবে প্রতীক্ষা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়। আখেরী যামানার ফিতনাগুলো থেকে বেঁচে থাকতে হলে কুরআন ও সুন্নাহর সুদৃঢ় রজ্জুকে আঁকড়ে ধরতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শিখিয়ে দেওয়া আমল ও দুআগুলোর মাধ্যমে দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় চাইতে হবে। যখন আমরা দেখি যে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে এবং অন্য ধর্মের ভবিষ্যদ্বাণীগুলোও একই সময়ের দিকে নির্দেশ করছে তখন আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। এটি আমাদের গাফলত বা উদাসীনতা কাটানোর এক চরম সুযোগ।

পরিশেষে ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমন এক ধ্রুব সত্য যা কেবল সময়ের অপেক্ষা। ২০২৬ সালের এই উত্তাল পৃথিবীতে যারা হিদায়াতের পথ খুঁজছেন তাদের জন্য উম্মাহ কণ্ঠ সর্বদা সঠিক তথ্য ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা প্রদান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বৈশ্বিক বিশ্বাসের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আমাদের উচিত বিবাদ না করে সত্যকে চিনে নেওয়া। ইসলাম আমাদের যে পথের দিশা দিয়েছে তা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং স্বচ্ছ। ঈমানী জীবনকে সমৃদ্ধ করতে এবং আখেরী যামানার সকল পরীক্ষা থেকে উত্তীর্ণ হতে হলে আমাদের অবিচল থাকতে হবে আল্লাহর পথে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সহীহ বুঝ দান করুন এবং ফিতনার অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে সিরাতুল মুস্তাকিমে পরিচালিত করুন। আমীন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

ফিকহ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!