স্মার্টফোন প্রযুক্তিতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত এবং কিছুটা বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সিলিকন-কার্বন ব্যাটারি। অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বাজার পর্যবেক্ষক দাবি করছেন যে অ্যাপল, স্যামসাং বা গুগলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কেন এই ব্যাটারি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে না তার মূল কারণ এর সুরক্ষা ঝুঁকি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে যে সিলিকন-কার্বন ব্যাটারি ব্যবহারের ফলে এটি ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত ফুলে যেতে পারে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা এই প্রযুক্তির চতুর্থ বছরে পা রেখেছি তখন এই ভয়ের পেছনে কতটা সত্যতা আছে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। মূলত সিলিকন কণাগুলো চার্জিং বা লিথিয়েশন প্রক্রিয়ার সময় আয়তনে বৃদ্ধি পায় এবং তাত্ত্বিকভাবে এটি ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে যা যেকোনো ডিভাইসের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যা এই সমস্যার সমাধান অনেক আগেই বের করে ফেলেছে।
২০২৩ সালে বিশ্বের প্রথম সিলিকন-কার্বন ব্যাটারি সম্বলিত স্মার্টফোন হিসেবে বাজারে আসে অনার ম্যাজিক ৫ প্রো। ৫০০০ এমএএইচ-এর বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন এই ব্যাটারিটি তখন থেকেই ব্যবহারকারীদের নজরে ছিল। গত তিন বছরে এই নির্দিষ্ট মডেলটি বা এর পরবর্তী সংস্করণগুলোর ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের ব্যাটারি ফুলে যাওয়া বা বিস্ফোরণের ঘটনা বিশ্বজুড়ে রেকর্ড করা হয়নি। যদি এই প্রযুক্তি সত্যিই এতখানি অনিরাপদ হতো তবে গত তিন বছরে আমরা বড় কোনো রিকল বা পণ্য ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেখতে পেতাম। বরং আমরা দেখেছি অনার ম্যাজিক ৬ প্রো, ওয়ানপ্লাস এস ৩ প্রো এবং শাওমি ১৪ আলট্রার মতো ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোতে এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার। বর্তমানে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে অনেক কোম্পানি তাদের ফোনে ৭০০০ থেকে ১০০০ মিঅ্যাম্পিয়ার আওয়ারের ব্যাটারি ব্যবহার করছে যা অত্যন্ত পাতলা ফর্মে সম্ভব হয়েছে কেবল এই সিলিকন-কার্বন প্রযুক্তির কারণেই।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে ৩০০ শতাংশ ফুলে যাওয়ার বিষয়টি কি তবে কেবলই গুজব? বিষয়টি পুরোপুরি গুজব নয় বরং এটি একটি বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ যা এখন জয় করা সম্ভব হয়েছে। সিলিকন-কার্বন ব্যাটারির নেগেটিভ ইলেক্ট্রোড বা অ্যানোড অংশে সিলিকনের প্রলেপ দেওয়া থাকে এবং একে শক্তিশালী করা হয় কার্বন স্ট্রাকচার দিয়ে। সিলিকনের প্রসারণ রোধ করতে বিজ্ঞানীরা `বায়োনিক হানি-কম্ব` বা মৌমাছির চাকের মতো একটি আণবিক কাঠামো ব্যবহার করেন। এই কাঠামোটি একটি যান্ত্রিক বাফারের মতো কাজ করে যা সিলিকনকে বাইরের দিকে চাপ দেওয়ার বদলে এর ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম শূন্যস্থানে প্রসারিত হতে সাহায্য করে। ফলে ব্যাটারির বাইরের আবরণে কোনো বাড়তি চাপ তৈরি হয় না। এছাড়া ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোতে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত চিপ ব্যবহার করা হয় যা ব্যাটারির অভ্যন্তরীণ চাপ এবং তাপমাত্রা প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই চার্জিং কমিয়ে দেয়।
মজার বিষয় হলো আমরা যখন নতুন সিলিকন-কার্বন প্রযুক্তি নিয়ে চিন্তিত তখন আমাদের অতি পরিচিত সাধারণ লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিগুলোই বেশি দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে লিথিয়াম ব্যাটারি সম্বলিত বেশ কিছু ডিভাইসের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা গেছে। শাওমির একটি নির্দিষ্ট মডেলের পাওয়ার ব্যাংক আগুনের ঝুঁকির কারণে বাজার থেকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এমনকি আইফোনের কিছু মডেলে বিমানে ভ্রমণের সময় উচ্চ চাপের কারণে ব্যাটারি ফুলে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে যা ল্যান্ড করার পর আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। এর তুলনায় সিলিকন-কার্বন ব্যাটারির রেকর্ড এখন পর্যন্ত অনেক বেশি পরিষ্কার। যেহেতু এই ব্যাটারিগুলো এখনো মূলত প্রিমিয়াম বা ফ্ল্যাগশিপ ফোনেই সীমাবদ্ধ তাই কোম্পানিগুলো এর মান নিয়ন্ত্রণে অনেক বেশি কড়াকড়ি আরোপ করে। সস্তা বা এন্ট্রি-লেভেলের ফোনে এখনো এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়নি যেখানে সাধারণত কম বাজেটের কারণে মানের সাথে আপস করার সুযোগ থাকে।
যদি আপনার ফোনের ব্যাটারি কখনো ফুলে যায় তবে কিছু লক্ষণ দেখে তা বুঝতে পারবেন। ফোনের পেছনের অংশ যদি কিছুটা উঁচু হয়ে যায় বা স্ক্রিনটি ফ্রেম থেকে আলগা হয়ে আসে তবে বুঝতে হবে ভেতরে গ্যাস জমেছে। অনেক সময় ব্যাটারি লিক হলে নেলপলিশের মতো মিষ্টি রাসায়নিক গন্ধ পাওয়া যেতে পারে। এমন অবস্থায় ফোনটি দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া উচিত এবং কোনোভাবেই চার্জে দেওয়া ঠিক হবে না। ফুলে যাওয়া ব্যাটারি নিজে ঠিক করার চেষ্টা করা বা ফুটো করা জীবনঘাতী হতে পারে। পরিশেষে বলা যায় যে সিলিকন-কার্বন ব্যাটারি নিয়ে ভয়ের চেয়ে এর সুবিধা অনেক বেশি। এটি যেমন ফোনকে দীর্ঘক্ষণ সচল রাখে তেমনি ফোনের গঠনকেও রাখে স্লিম। গত তিন বছরের তথ্য প্রমাণ বলছে যে ৩০০ শতাংশ ফুলে যাওয়ার তত্ত্বটি কেবল ল্যাবরেটরির প্রাথমিক পর্যায়ের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল যা বর্তমানের উন্নত ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এআই ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে সফলভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :