ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা আরকম দেশটির রক্ষণশীল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সিনিয়ুজকে এক লক্ষ ইউরো জরিমানা করার ঘোষণা দিয়েছে। মূলত মুসলিম ও আলজেরীয় নাগরিকদের লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলক এবং বিদ্বেষমূলক কন্টেন্ট প্রচার করার অভিযোগে এই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
২০২৫ সালে এই চ্যানেলটির জনপ্রিয় টকশো ল’হিউর ডেস প্রস-এ সম্প্রচারিত দুটি বিতর্কিত পর্বের ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্ত জানায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। আরকমের তদন্তে উঠে এসেছে যে ওই অনুষ্ঠানগুলোতে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী এবং ধর্মীয় অনুসারীদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে যা ফ্রান্সের প্রচলিত সম্প্রচার আইনের পরিপন্থী। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে এই ধরনের প্রচারণার ফলে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি বিতর্কিত পর্বে ফ্রান্সে বসবাসরত আলজেরীয় নাগরিকদের উপস্থিতিকে জননিরাপত্তার জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল। সেখানে কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই একটি পুরো জাতিকে অপরাধ বা নিরাপত্তার হুমকির সাথে যুক্ত করে আলোচনা করা হয়। আরকম তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে একটি নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের এভাবে ঢালাওভাবে অপরাধী বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করা কেবল সাংবাদিকতার নৈতিকতা বিরোধীই নয় বরং এটি সরাসরি বর্ণবাদ ও বৈষম্যকে উৎসাহিত করে।
অনুষ্ঠানের আলোচনায় উপস্থাপক এবং অতিথিরা এমন সব মন্তব্য করেছেন যা সরাসরি একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর শামিল। ফরাসি আইনে জাতীয়তা বা ধর্মের ভিত্তিতে কারো বিরুদ্ধে ঘৃণা বা বৈষম্য উস্কে দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং সিনিয়ুজ সেই আইনের লঙ্ঘন করেছে বলে সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে।
অন্য একটি পর্বে ফিলিস্তিনিদের নিয়ে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছিল বলে আরকমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সকল ফিলিস্তিনি নাগরিককে পরোক্ষভাবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। আরকম বলেছে যে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সাধারণ জনগণকে সম্মিলিতভাবে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত করা চরম বিভ্রান্তিকর এবং এটি বৈষম্যমূলক আচরণকে উস্কে দেয়।
এই ধরনের উপস্থাপনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি ফ্রান্সে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি আরও মনে করিয়ে দিয়েছে যে গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ ও সঠিক তথ্য প্রচার করা কিন্তু সিনিয়ুজ তাদের সম্পাদকীয় নীতিতে বারবার একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিনিয়ুজ চ্যানেলটিকে প্রায়শই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স নিউজের সাথে তুলনা করা হয় কারণ এর সম্পাদকীয় অবস্থান অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং অভিবাসন বিরোধী। এর আগেও এই চ্যানেলটিকে তাদের বিভিন্ন বিতর্কিত অনুষ্ঠানের জন্য আরকম থেকে একাধিকবার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।
বারবার সর্তক করার পরেও চ্যানেলের নীতিতে কোনো পরিবর্তন না আসায় এবার সরাসরি আর্থিক জরিমানার পথে হাঁটলো ফরাসি কর্তৃপক্ষ। আরকমের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে বাকস্বাধীনতা মানে ঘৃণা ছড়ানো নয়। একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকলেও সেটি অন্যের অধিকার বা সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। ভবিষ্যতে এই ধরনের বিষয় প্রচারের ক্ষেত্রে চ্যানেলটিকে আরও সতর্ক থাকার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সের গণমাধ্যম আইন অনুযায়ী যেকোনো প্রকার বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা হেট স্পিচ কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিশেষ করে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের মতো বিষয়গুলোতে সংবাদমাধ্যমগুলোকে অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকতে হয়। সিনিয়ুজের বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপটি দেশটির অন্যান্য গণমাধ্যমের জন্যও একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আরকম জানিয়েছে যে তারা নিয়মিতভাবে এই চ্যানেলটির প্রতিটি অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বা জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে কোনো বক্তব্য প্রচার না করা হয়।
এই জরিমানার বিষয়ে সিনিয়ুজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি তবে ফ্রান্সে মানবাধিকার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা মনে করছে যে সংবাদমাধ্যমের আড়ালে যারা ঘৃণা ছড়ায় তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
ইউরোপের দেশগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিম বিদ্বেষ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে আরকমের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আলজেরীয় এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিলেন যে কিছু সংবাদমাধ্যম পরিকল্পিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য অভিবাসন ইস্যুকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মনে ভীতি তৈরি করা হচ্ছে। সিনিয়ুজের ওপর এই এক লক্ষ ইউরোর জরিমানা সেই দীর্ঘদিনের অভিযোগের একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ফরাসি সমাজে মুসলিমদের অবদান এবং তাদের নাগরিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তাদের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি মিডিয়া পরিবেশ নিশ্চিত করা যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার ধর্ম বা বর্ণের কারণে লাঞ্ছিত না হয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারে।
সবশেষে আরকম তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে যে তারা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক শাস্তিই দেয়নি বরং এটি একটি নৈতিক বার্তা। সংবাদমাধ্যমের শক্তিকে সমাজ ধ্বংসের কাজে ব্যবহার না করে বরং সত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করা উচিত। ফ্রান্সের মতো বহুসাংস্কৃতিক দেশে যেখানে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করে সেখানে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ক্ষমার অযোগ্য।
এই জরিমানা প্রদানের মাধ্যমে চ্যানেলটির ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে তা ভবিষ্যতে বৈষম্যমূলক সংবাদ প্রচার বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফরাসি সরকার এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোও এই বিষয়ে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যাতে সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি বা বিদ্বেষ না ছড়ায়।

আপনার মতামত লিখুন :