প্রযুক্তি বিশ্বে অ্যাপলের পণ্য পরিবর্তনের কৌশল সবসময়ই সুপরিকল্পিত এবং চমকপ্রদ। সম্প্রতি পাওয়া বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতা ও বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী অ্যাপল তাদের চারটি বড় পণ্য উৎপাদন বন্ধ বা ‘ডিসকন্টিনিউ’ করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই তালিকায় রয়েছে সাশ্রয়ী আইফোন ১৬ই, এম৩ আইপ্যাড এয়ার, স্টুডিও ডিসপ্লে এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাকবুক প্রো মডেলগুলো। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রিটেইল চ্যানেলে এই পণ্যগুলোর মজুত বা ইনভেন্টরি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে যা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ২০২৬ সালের শুরুর দিকেই অ্যাপল তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ডিভাইসগুলো বাজারে আনতে যাচ্ছে। অ্যাপলের চিরাচরিত কৌশল হলো নতুন পণ্য বাজারে ছাড়ার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই পুরনো মডেলের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া যাতে নতুন সংস্করণের জন্য বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা তৈরি হয়। বর্তমান এই কৃত্রিম সংকট বা ইনভেন্টরি ক্লিয়ারেন্স মূলত বসন্তকালীন বড় কোনো ইভেন্টের পূর্বাভাস দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইফোন ১৬ই মডেলটি বাজারে আসার মাত্র দশ মাসের মাথায় বিদায় নিতে যাচ্ছে যা অনেককেই অবাক করেছে। বাজেট-ফ্রেন্ডলি এই আইফোনটি তার পারফরম্যান্সের জন্য ব্যবহারকারীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে রিটেইল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে এই মডেলটির নতুন স্টক আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর মূল কারণ হলো আসন্ন আইফোন ১৭ই যা আরও উন্নত প্রসেসর এবং আধুনিক কানেক্টিভিটি ফিচার নিয়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উন্মোচিত হতে পারে। সাধারণত অ্যাপল তাদের বাজেট সিরিজে দীর্ঘ বিরতি নিলেও এবার তারা দ্রুত আপগ্রেড সাইকেলে চলে এসেছে যাতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা যায়। তাই যারা এখন আইফোন ১৬ই কেনার পরিকল্পনা করছেন তাদের জন্য পরামর্শ হলো কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করা কারণ নতুন মডেলটি অনেক বেশি শক্তিশালী স্পেসিফিকেশন নিয়ে আসছে।
আইফোনের পাশাপাশি অ্যাপলের জনপ্রিয় এম৩ আইপ্যাড এয়ারের সরবরাহও বাজারে সীমিত হয়ে পড়েছে। জানা গেছে যে অ্যাপল এম৪ চিপচালিত নতুন আইপ্যাড এয়ার বাজারে আনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এম৪ চিপের সংযোজন আইপ্যাডকে ল্যাপটপের সমতুল্য পারফরম্যান্স দিতে সক্ষম করবে যা বিশেষ করে গ্রাফিক ডিজাইনার এবং প্রফেশনালদের জন্য বড় পাওনা হবে। অন্যদিকে অ্যাপলের স্টুডিও ডিসপ্লেও বর্তমানে অনলাইন স্টোরগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে না বা শিপমেন্টের জন্য দীর্ঘ সময় নিচ্ছে। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ২০২৬ সালের শুরুতেই একটি নতুন ডিসপ্লে প্রযুক্তি বা এর উত্তরসূরি আসতে পারে। এছাড়া হাই-এন্ড ব্যবহারকারীদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে এম৪ প্রো এবং এম৪ ম্যাক্স সমৃদ্ধ ম্যাকবুক প্রো মডেলগুলোর সংকট। মার্চের শুরুতে এম৫ প্রো এবং এম৫ ম্যাক্স ভেরিয়েন্ট বাজারে আসার জোরালো সম্ভাবনা থাকায় অ্যাপল বর্তমানে পুরনো এম৪ চিপের হাই-এন্ড ল্যাপটপগুলোর উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
অ্যাপলের এই ইনভেন্টরি কৌশলের একটি বিশেষ দিক হলো তারা সাধারণত পুরনো পণ্যের দাম কমিয়ে স্টোক ক্লিয়ার করে না। বরং তারা সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে গ্রাহকদের নতুন মডেলের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। ২০২৬ সালের বসন্তকালীন এই রিফ্রেশ বা নতুন পণ্য সংযোজন গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত হতে চলেছে কারণ একসাথে চারটি ভিন্ন ক্যাটাগরির পণ্য নতুন রূপে আসছে। এই পরিবর্তনের ফলে অ্যাপলের ইকোসিস্টেমে প্রসেসিং পাওয়ার এবং কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে এক বিশাল লিপ বা উল্লম্ফন দেখা যাবে। বিশেষ করে এম৫ সিরিজের চিপগুলো অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স বা এআই ফিচারের সক্ষমতাকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। যারা বর্তমানে অ্যাপল পণ্য কেনার কথা ভাবছেন তাদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।
বাজার বিশ্লেষক আল ল্যান্ডেসের মতে এই ধরণের পরিকল্পিত সংকট প্রমাণ করে যে অ্যাপলের সাপ্লাই চেইন অত্যন্ত দক্ষ। যদি কেউ এই মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজনে ১৬ই আইফোন বা এম৩ আইপ্যাড কিনতে চান তবে তাদের সেকেন্ডারি মার্কেট বা খুচরা বিক্রেতাদের অবশিষ্ট স্টকের ওপর নির্ভর করতে হবে। অন্যথায় ধৈর্য ধারণ করলে আগামী মাসেই আরও উন্নত স্পেসিফিকেশন এবং নতুন ডিজাইনের পণ্য পাওয়ার সুযোগ থাকছে। অ্যাপলের এই কৌশলটি মূলত তাদের আপগ্রেড সাইকেলকে ত্বরান্বিত করার একটি প্রচেষ্টা। সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সালের প্রথম কোয়ার্টার অ্যাপল ভক্তদের জন্য অনেক বড় বড় চমক নিয়ে আসছে এবং বর্তমানের এই পণ্য স্বল্পতা মূলত সেই আসন্ন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।

আপনার মতামত লিখুন :