দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম মুসলিম প্রধান দেশ মালয়েশিয়া তার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বর্তমানে দেশটিতে ‘ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ ক্যাম্পেইন পুরোদমে চলছে যার লক্ষ্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা। এই প্রচারণার মাঝেই মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এডগার্ড ডি কাগান তার স্বদেশি নাগরিকদের জন্য একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। তিনি আমেরিকানদের মালয়েশিয়া ভ্রমণের আহ্বান জানিয়ে দেশটিকে একটি ‘ম্যাজিকাল’ বা জাদুকরী গন্তব্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কাগান তার কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় মালয়েশিয়ায় অতিবাহিত করার পর আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে অবসর গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। তার এই বিদায়ী মুহূর্তে তিনি মালয়েশিয়ার আতিথেয়তা এবং পর্যটন খাতের সম্ভাবনা নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক মন্তব্য করেন।
এডগার্ড ডি কাগান তার বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে মালয়েশিয়ার মানুষ অত্যন্ত চমৎকার এবং বন্ধুবৎসল। তাদের উষ্ণ আতিথেয়তা যেকোনো পর্যটককে মুগ্ধ করবে এবং এটিই মালয়েশিয়াকে অন্য দেশগুলোর থেকে আলাদা করে তুলেছে। তিনি মালয়েশিয়াকে জাদুকরী বলার পেছনে দেশটির সংস্কৃতি, জাতিসত্তা এবং ধর্মের সংমিশ্রণকে দায়ী করেছেন। এখানে মালয়, চীনা এবং ভারতীয় সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে যা পর্যটকদের জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার খাবার বা ফুড কালচার সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত কাগান বলেন যে এখানকার প্রতিটি অঞ্চলের খাবারের স্বাদ এবং বৈচিত্র্য অবিশ্বাস্য যা পর্যটকদের বারবার এখানে টেনে আনবে।
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকেও মালয়েশিয়া অত্যন্ত সমৃদ্ধ বলে মনে করেন এই বিদায়ী রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন যে মালয়েশিয়ায় পর্যটকদের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। কেউ যদি সমুদ্র সৈকত পছন্দ করেন তবে তার জন্য এখানে রয়েছে অসাধারণ সব সৈকত। আবার যারা অ্যাডভেঞ্চার বা পাহাড়ে চড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্য রয়েছে বিশালাকার পর্বতমালা। হিকিং করার সুবিধা এবং বন্যপ্রাণী দেখার জন্য মালয়েশিয়ার জঙ্গলগুলো বিশ্বসেরা। মালয়েশিয়ার বৈচিত্র্যময় ল্যান্ডস্কেপ পর্যটকদের এক ভিন্ন জগতের স্বাদ দেয়। কাগান তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান যে তিনি মালয়েশিয়ার অনেক স্থানে ভ্রমণ করেছেন তবে তার কাছে কুয়ালালামপুর এবং পেনাং শহর দুটি সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। কুয়ালালামপুরকে তিনি গতিশীলতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন।
রাষ্ট্রদূত কাগান কেবল শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি কেলান্তান, ইপো, কেডাহ, জোহর এবং পূর্ব উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণ করেছেন। এ ছাড়া সাবাহ এবং সারাওয়াকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান যে তার সময় স্বল্পতার কারণে তিনি মালয়েশিয়ার প্রতিটি প্রান্ত ঘুরে দেখতে পারেননি। তবে তিনি নিশ্চিত যে যারা মালয়েশিয়ায় আসবেন তারা এখানকার প্রতিটি স্থানকে ভালোবাসবেন। তিনি মালয়েশিয়ার গণপরিবহন ব্যবস্থারও ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিশেষ করে ইলেকট্রিক ট্রেন সার্ভিস বা ইটিএস ব্যবহার করে তিনি বহুবার পেনাং ভ্রমণ করেছেন। তার মতে এই ট্রেন সার্ভিস অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, সময়নিষ্ঠ এবং আরামদায়ক। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আফসোস প্রকাশ করে বলেন যে ব্যাংকক পর্যন্ত জঙ্গল রেলওয়েতে ভ্রমণ করতে না পারাটা তার অন্যতম বড় আক্ষেপ হয়ে থাকবে।
মালয়েশিয়ার পর্যটন শিল্পের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে আমেরিকান পর্যটকদের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় আগত পর্যটকদের তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৪তম স্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালে ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৮০ জন আমেরিকান মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেছেন যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৮.৪ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে আমেরিকানদের কাছে মালয়েশিয়া একটি নিরাপদ এবং আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। রাষ্ট্রদূত কাগান মনে করেন এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও অনেক বাড়বে যদি মার্কিন নাগরিকরা মালয়েশিয়ার প্রকৃত সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে পারে।
ধর্মীয় দিক থেকেও মালয়েশিয়া মুসলিম পর্যটকদের জন্য একটি আদর্শ স্থান। এখানকার হালাল খাবারের সহজলভ্যতা এবং প্রতিটি মোড়ে মোড়ে সুন্দর স্থাপত্যশৈলীর মসজিদ পর্যটকদের মনে প্রশান্তি আনে। ইসলামি ঐতিহ্য এবং আধুনিকায়নের এক অনন্য মেলবন্ধন এখানে দেখা যায়। রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে যদিও সরাসরি ধর্মীয় পর্যটনের কথা বলেননি কিন্তু তিনি যখন সংস্কৃতির সংমিশ্রণের কথা বলেছেন তখন সেখানে ইসলামি মূল্যবোধের প্রভাবটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। মালয়েশিয়ার সরকার ২০২৬ সালকে পর্যটন বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছে তার সুফল এখন পর্যটকরা পাচ্ছেন।
রাষ্ট্রদূত এডগার্ড ডি কাগানের এই আহ্বান কেবল একটি কূটনৈতিক বক্তব্য নয় বরং এটি একজন পর্যটকের হৃদয় থেকে আসা সত্য। মালয়েশিয়ার রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি শক্তিশালী দেশ থেকে পর্যটক আসা বৃদ্ধি পেলে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কাগান বিশ্বাস করেন যে পর্যটন হলো দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। যখন আমেরিকান পর্যটকরা মালয়েশিয়ার গ্রামে-গঞ্জে ভ্রমণ করবেন তখন তারা এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা এবং শান্তিপ্রিয় মানসিকতা সম্পর্কে জানতে পারবেন যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও ভূমিকা রাখবে।
পরিশেষে বিদায়ী এই মার্কিন কূটনীতিক তার উত্তরসূরি এবং মার্কিন নাগরিকদের জন্য মালয়েশিয়াকে একটি ‘মাস্ট ভিজিট’ বা অবশ্যই দর্শনীয় দেশ হিসেবে রেখে যাচ্ছেন। তিনি মনে করেন মালয়েশিয়ার জাদুকরী পরিবেশ যে কারো মন জয় করে নেবে। ‘ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ এর সাফল্যের পেছনে এই ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত জরুরি। পর্যটকদের জন্য মালয়েশিয়া কেবল একটি দেশ নয় বরং এটি একটি অভিজ্ঞতা যেখানে প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং আধুনিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। যারা এখনও মালয়েশিয়া ভ্রমণের পরিকল্পনা করেননি তাদের জন্য রাষ্ট্রদূত কাগানের এই বার্তা একটি বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :