ইউরোপের বুকে মুসলিম শাসনের এক গৌরবময় অধ্যায় আল-আন্দালুস। সেই প্রাচীন ইতিহাসের নতুন এক সাক্ষী হয়ে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় এস্তেপোনা শহরে সম্প্রতি ১২টি প্রাচীন মুসলিম কবর আবিষ্কৃত হয়েছে। এই আবিষ্কারটি কেবল ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে স্পেনে মুসলমানদের জীবনযাত্রা ও ধর্মীয় রীতিনীতি সম্পর্কে নতুন অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করছে। এস্তেপোনা শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্র এবং সমুদ্র সৈকতের সংযোগস্থলে একটি বিশাল পথচারী বুলেভার্ড তৈরির কাজ চলাকালীন এই প্রাচীন সমাধিস্থলটির সন্ধান মেলে।
সান লরেঞ্জো এবং এস্পানা অ্যাভিনিউ বরাবর প্রায় ২২ হাজার বর্গমিটার এলাকার এই উন্নয়ন প্রকল্পের খননকাজ শুরু করার আগেই নগর কর্তৃপক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন। কারণ ওই এলাকায় একটি প্রাচীন মুসলিম গোরস্তান বা নেক্রোপলিসের অস্তিত্ব থাকার বিষয়ে আগে থেকেই ধারণা ছিল। স্থানীয় পরিকল্পনা আইন অনুযায়ী এই স্থানটি একটি সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষিত ছিল, যার ফলে নির্মাণকাজের প্রতিটি ধাপে বিশেষজ্ঞ প্রত্নতত্ত্ববিদদের নিবিড় তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা হয়েছে।
আবিষ্কৃত এই সমাধিগুলোতে শায়িত দেহগুলো ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে দাফন করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা নিশ্চিত করেছেন যে প্রতিটি দেহই মাটির সাথে সরাসরি সমাহিত করা হয়েছে এবং তাদের মুখমণ্ডল পবিত্র মক্কার দিকে ফেরানো ছিল। এটি মধ্যযুগীয় আল-আন্দালুসে মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অবিচলতার এক শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে। এই সমাধিগুলোর ওপর এখন বিস্তারিত ফরেনসিক বিশ্লেষণ চালানো হবে বলে জানা গেছে।
এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাহিত ব্যক্তিদের বয়স, লিঙ্গ এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া তাদের পুষ্টির মান এবং জীবনযাত্রার ধরণ সম্পর্কেও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে যা ওই সময়ের সমাজ কাঠামো বুঝতে গবেষকদের সহায়তা করবে। এস্তেপোনা শহরটি একসময় নাসরিড রাজবংশের অধীনে ‘ইস্তিব্বুনা’ নামে পরিচিত ছিল। ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ এই জনপদে এটিই প্রথম আবিষ্কার নয়; গত কয়েক বছরে এই শহরের প্রাচীন মদিনা এলাকা থেকে প্রায় ৬০০টির মতো মানুষের কঙ্কাল বা দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
খননকাজের সময় সমাধি ছাড়াও বেশ কিছু মধ্যযুগীয় অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে যা ইতিহাসের এক উত্তাল সময়ের ইঙ্গিত দেয়। প্রত্নতত্ত্ববিদরা পাঁচটি বড় পাথরের গোলা বা প্রজেক্টাইল খুঁজে পেয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দীতে খ্রিস্টান বাহিনী যখন মুসলিম শাসিত এই শহর অবরোধ করেছিল, তখন এই গোলাগুলো ব্যবহৃত হয়েছিল। এছাড়া একই এলাকা থেকে সেই সময়ের মৃৎপাত্র বা সিরামিক সামগ্রীর টুকরোও উদ্ধার করা হয়েছে। এই ছোট ছোট ভগ্নাবশেষগুলো থেকে গবেষকরা ওই সময়ের মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের তৈজসপত্র এবং শিল্পকলা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
আল-আন্দালুস আমলে এস্তেপোনা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলীয় অবস্থানের কারণে এটি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে মুসলিম শাসকরা এখানে শক্তিশালী দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন। বর্তমান আবিষ্কারগুলো সেই প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর অস্তিত্বকেই আরও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করছে।
স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে মুসলিমদের সাতশ বছরেরও বেশি সময়ের রাজত্ব ছিল সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং জ্ঞানের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই দীর্ঘ সময়ে আন্দালুসিয়া অঞ্চলটি মুসলিম এবং খ্রিস্টানদের সহাবস্থান, সংঘাত এবং রাজনৈতিক মৈত্রীর এক জটিল কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। এস্তেপোনার বর্তমান উন্নয়ন প্রকল্পটির কাজ এখনও চলমান রয়েছে এবং প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করছেন যে খনন যত গভীর হবে আরও নতুন নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনা তৈরি হবে। স্প্যানিশ সরকার এবং আঞ্চলিক প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এই আবিষ্কারগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে।
তাদের মতে এই খনন কাজগুলো কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয় বরং স্পেনের মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা বহুস্তরীয় ইতিহাসকে পুনর্গঠন করার একটি সুযোগ। মুসলিমদের ফেলে যাওয়া এই উত্তরাধিকারগুলো আধুনিক স্পেনের জাতীয় পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত।
এস্তেপোনার এই খনন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতিতে এবং সতর্কতার সাথে পরিচালনা করা হচ্ছে যাতে কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। প্রাচীন ‘ইস্তিব্বুনা’ শহরটি একসময় জিব্রাল্টার প্রণালীর নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উদ্ধারকৃত সমাধিগুলো মূলত সাধারণ মানুষের হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে যারা ওই অঞ্চলের কৃষি বা সামুদ্রিক বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিলেন। তবে অস্ত্রশস্ত্রের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে এই জনপদটি সামরিক দিক থেকেও অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। স্পেনের পর্যটন শিল্পেও এই ধরনের আবিষ্কার বিশেষ প্রভাব ফেলে থাকে।
প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আল-আন্দালুসের স্থাপত্য ও ইতিহাস দেখতে গ্রানাডা, কর্ডোবা বা সেভিলের মতো শহরগুলোতে ভিড় করেন। এস্তেপোনার এই নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার শহরটিকে ঐতিহাসিক পর্যটনের নতুন এক গন্তব্যে পরিণত করতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনের পরিকল্পনা রয়েছে এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো এবং উদ্ধারকৃত সামগ্রীগুলো জনসাধারণের প্রদর্শনের জন্য কোনো জাদুঘর বা বিশেষ গ্যালারিতে সংরক্ষণ করা। এটি নতুন প্রজন্মের কাছে স্পেনের ইসলামী অতীতের এক জীবন্ত চিত্র তুলে ধরবে।
আল-আন্দালুস আমলের এই সমাধিগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কখনও হারিয়ে যায় না, বরং তা সময়ের পলি স্তরের নিচে অপেক্ষা করে সঠিক উন্মোচনের। এস্তেপোনার মাটির নিচে শায়িত এই বারোজন মানুষ এবং তাদের পূর্ববর্তী শত শত মানুষের কঙ্কাল কেবল হাড়ের স্তূপ নয়, বরং তারা এক সমৃদ্ধ সভ্যতার বাহক।
এই আবিষ্কারের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় আচরণ থেকে শুরু করে যুদ্ধবিগ্রহের কলাকৌশল সবকিছুই নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই সাইটটি নিয়ে আরও আশাবাদী এবং তারা মনে করেন এই অঞ্চলটি দক্ষিণ স্পেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভাণ্ডার হিসেবে প্রমাণিত হবে। স্পেনের ইসলামী ঐতিহ্যের এই পুনর্জাগরণ কেবল ইতিহাসের পাতায় নয়, বরং আধুনিক ইউরোপের বহুমুখী সংস্কৃতির চর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন :