ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর গত ১০ অক্টোবর একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হলেও তা এখন কেবল কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার গাজার বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলায় অন্তত একজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও সাতজন গুরুতর আহত হয়েছেন। গাজার চিকিৎসা সূত্রগুলো এই হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী গাজা সিটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আল-তুফাহ পাড়ার জারকা এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা অতর্কিত গুলি বর্ষণ শুরু করলে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া মধ্য গাজার বুরেজ শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি লাইভ ফায়ারে চারজন ফিলিস্তিনি আহত হন যাদেরকে দ্রুত দির আল-বালাহর আল-আকসা মার্টার্স হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাদের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
দক্ষিণের খান ইউনুস এলাকাতেও ইসরায়েলি হামলায় দুই শিশুসহ তিনজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের পূর্ব দিকে তথাকথিত ইয়েলো লাইনের বাইরে ইসরায়েলি আর্টিলারি শেলিং বা কামানের গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। যদিও সেই এলাকায় তাৎক্ষণিক কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য যে এই ইয়েলো লাইন বা হলুদ রেখা মূলত গাজার পূর্বাঞ্চলীয় প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক মোতায়েন এবং ফিলিস্তিনিদের অবাধ চলাচলের সীমানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে গাজার অবকাঠামোর ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে এবং জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এই অঞ্চল পুনর্গঠনে অন্তত ৭০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত নিহতের মোট সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং আহতের সংখ্যা ১ লক্ষ ৭১ হাজারেরও বেশি।
গাজার অভ্যন্তরে এই সহিংসতার সমান্তরালে ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর অমানবিক আচরণের আরেকটি কালো অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। ফিলিস্তিনি বন্দি বিষয়ক সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে যে ইসরায়েলের নেগেভ কারাগারে বন্দি অবস্থায় ৫৯ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি অ্যাম্বুলেন্স অফিসার হাতাম ইসমাইল রায়ান মারা গেছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে তাকে আটক করা হয়েছিল। রায়ানের মৃত্যুর সংবাদটি ফিলিস্তিনি প্রিজনার সোসাইটি এবং ফিলিস্তিনি কমিশন অব ডিটেইনি অ্যাফেয়ার্স যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮৭ জন চিহ্নিত ফিলিস্তিনি বন্দি ইসরায়েলি হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যাটি ১০০-এর বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে কারণ গাজা থেকে আটক করা অনেক বন্দির কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিয়মতান্ত্রিক নির্যাতন, অনাহার, যৌন নিপীড়ন এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ঘটনা এখন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯ don’t ৬৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩২৪ জন ফিলিস্তিনি বন্দি ইসরায়েলি হেফাজতে মারা গেছেন এবং ইসরায়েল এখনও ৯৫ জন মৃত বন্দির মরদেহ আটকে রেখেছে। বর্তমানে ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে ৯ হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন যাদের মধ্যে প্রায় ৩৫০ জন শিশু। এই বন্দিদের মুক্তি এবং কারাগারে তাদের ওপর চলা নির্যাতনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিস্পৃহতা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। গাজার বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
গাজার পাশাপাশি লেবানন সীমান্তেও ইসরায়েলি আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ লেবাননের বিনতে জুবাইল জেলায় ইসরায়েলি ড্রোন থেকে ছোড়া তিনটি গাইডেড মিসাইলে একজন নিহত হয়েছেন। লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে যে এটিও একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। যদিও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে তারা হিজবুল্লাহর একজন সদস্যকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং আগ্রাসনের ফলে ইতোমধ্যে ৪ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে লেবাননের অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের পাঁচটি কৌশলগত পাহাড় দখল করে রেখেছে এবং নিয়মিতভাবে আকাশসীমা লঙ্ঘন করে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তাবলী বারবার লঙ্ঘিত হলেও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর এই ধারাবাহিক হামলা কেবল সাধারণ মানুষের প্রাণহানিই ঘটাচ্ছে না বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেও চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের বসতভিটা ধ্বংস এবং বন্দিদের ওপর নির্যাতন বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের চরম অবমাননার উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। গাজার ধ্বংসস্তূপের মাঝে যখন শিশুরা আসন্ন রমজান মাসকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক তখন এই ধরনের হামলা তাদের জীবনের অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি এখন কেবল নামমাত্র একটি রাজনৈতিক প্রলেপে পরিণত হয়েছে যা ফিলিস্তিনিদের রক্তক্ষরণ থামাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন :