পবিত্র রমজান মাস ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পবিত্র মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন। তবে যারা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতায় বিশেষ করে গ্লুকোমার মতো চোখের জটিল সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য রোজা রাখা এবং নিয়মিত ঔষধ ব্যবহারের বিষয়টি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। গ্লুকোমা এমন একটি রোগ যা চোখের অপটিক নার্ভকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এর ফলে স্থায়ী অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। এই রোগের প্রধান চিকিৎসা হলো নিয়মিত চোখের ড্রপ ব্যবহার করা যা চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু অনেক সময় রোগীদের মনে এই সংশয় জাগে যে রোজা থাকা অবস্থায় চোখের ড্রপ ব্যবহার করলে রোজা ভেঙে যাবে কি না। বিশেষ করে যখন ড্রপের স্বাদ গলায় অনুভূত হয় তখন এই ভয় আরও বেড়ে যায়।
গ্লুকোমা রোগীদের জন্য এই অনিশ্চয়তা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাজ্যের সেন্ট পলস আই ইউনিটের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রায় অর্ধেক মুসলিম রোগী মনে করেন রমজানে চোখের ড্রপ ব্যবহার করা রোজা ভঙ্গের কারণ হতে পারে। এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেক রোগী রমজান মাসে ড্রপ দেওয়া বন্ধ করে দেন অথবা অনিয়মিতভাবে ঔষধ ব্যবহার করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় চোখের পানি বা ড্রপ যখন চোখের কোণ দিয়ে গলার ভেতরে প্রবেশ করে তখন মানুষ তার স্বাদ অনুভব করতে পারে। এই স্বাদ পাওয়ার কারণেই অনেকে মনে করেন ঔষধটি পেটে চলে গেছে এবং রোজা নষ্ট হয়ে গেছে। তবে আধুনিক চিকিৎসা ও ইসলামি ফেকাহ শাস্ত্রের সমন্বিত ব্যাখ্যা এই ভীতি দূর করতে সহায়ক হতে পারে। ইসলামি শরিয়তের অধিকাংশ আলেম ও ফতোয়া বোর্ডের মতে চোখের ড্রপ ব্যবহার করলে রোজা নষ্ট হয় না। কারণ চোখ সরাসরি পাকস্থলীর সাথে যুক্ত কোনো স্বাভাবিক প্রবেশপথ নয় এবং ড্রপের খুব সামান্য অংশ যদি গলায় পৌঁছায়ও তা খাদ্য বা পানীয় হিসেবে গণ্য হয় না।
গ্লুকোমা এমন একটি অবস্থা যেখানে চোখের ভেতর তরল জমে চাপ বৃদ্ধি পায় যা সরাসরি মস্তিস্কে তথ্য প্রেরণকারী স্নায়ুকে আঘাত করে। যদি এই চাপ ঔষধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা না হয় তবে দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ধর্মীয় ইবাদত পালনের পাশাপাশি শরীরের সুস্থতা রক্ষা করাও ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবন রক্ষা এবং স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে রোগীদের উচিত হবে না কোনো অবস্থাতেই ড্রপ দেওয়া বন্ধ রাখা। তবে ধর্মীয় অনুভূতি ও মনের প্রশান্তির জন্য রোগীরা একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন যা ‘পাংক্টাল অক্লুশন’ নামে পরিচিত। ড্রপ দেওয়ার পরপরই চোখের কোণে নাকের পাশে আঙুল দিয়ে অন্তত দুই মিনিট হালকা চেপে ধরলে ঔষধটি চোখের ভেতরই সীমাবদ্ধ থাকে এবং গলার দিকে নামতে পারে না। এটি গ্লুকোমা চিকিৎসার একটি স্বীকৃত ভালো অভ্যাস কারণ এতে ড্রপটি চোখে দীর্ঘক্ষণ থাকে এবং ঔষধের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।
২০২৬ সালের রমজান মাসে যারা গ্লুকোমা নিয়ে রোজা রাখার পরিকল্পনা করছেন তাদের জন্য সময় ব্যবস্থাপনা একটি বড় সমাধান হতে পারে। যদি কোনো রোগী দিনের বেলা ড্রপ ব্যবহার নিয়ে অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় থাকেন তবে তিনি তার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ড্রপ দেওয়ার সময় পরিবর্তন করে নিতে পারেন। ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পাওয়া যায় যখন শরীরের স্বাভাবিক খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের বাধা থাকে না। এই সময়ের মধ্যে ড্রপগুলো ব্যবহার করলে রোজা নিয়ে কোনো মানসিক সংশয় তৈরি হওয়ার অবকাশ থাকে না। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঔষধের সময়সূচী পরিবর্তন করা উচিত নয় কারণ গ্লুকোমার ঔষধ একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর দেওয়ার প্রয়োজন হয়। ইসলাম মানুষের জন্য সহজ পথ প্রদর্শন করে এবং অসুস্থ ব্যক্তির জন্য বিশেষ ছাড় প্রদান করেছে। তবুও চোখের ড্রপের মতো জীবন রক্ষাকারী ঔষধ যা সরাসরি পাকস্থলীতে খাদ্য হিসেবে যায় না তা ব্যবহারে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই বলে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি গবেষকরা মত দিয়েছেন।
পরিশেষে সুস্থ চোখ মহান আল্লাহর এক অশেষ নিয়ামত। এই নিয়ামতকে রক্ষা করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। রমজানের ইবাদত যেন শারীরিক ক্ষতির কারণ না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান একজন মানুষকে পরিপূর্ণভাবে ইবাদতে মশগুল থাকতে সাহায্য করে। গ্লুকোমা রোগীরা সাহরি ও ইফতারের রুটিনের সাথে তাদের চোখের ড্রপ দেওয়ার সময়টিকে মিলিয়ে নিতে পারেন। ‘ঘুম থেকে ওঠা, ড্রপ দেওয়া, সাহরি করা এবং নামাজ পড়া’—এই সহজ জীবনধারা ২০২৬ সালের রমজানকে আরও সহজ ও নিরাপদ করে তুলবে। দৃষ্টিশক্তি বাঁচিয়ে রাখা এবং অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা একটি ইবাদত স্বরূপ। তাই গুজব বা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে চোখের চিকিৎসায় অবহেলা করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সঠিক নিয়ম মেনে চোখের ড্রপ ব্যবহার করুন এবং নিরাপদভাবে আপনার সিয়াম পালন সম্পন্ন করুন। উম্মাহ কণ্ঠ সর্বদা সত্য ও সঠিক তথ্য দিয়ে পাঠকদের পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আপনার মতামত লিখুন :