সময়ের অমোঘ নিয়মে আমাদের জীবন থেকে একটি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। গত বছরের এই দিনগুলোতে আমরা যেভাবে পবিত্র রমজানের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলাম, দেখতে দেখতে সেই সময়টি আবারো আমাদের দ্বারে কড়া নাড়ছে। অথচ বিগত দিনগুলোতে আমরা আমাদের আমলনামায় কী সঞ্চয় করেছি, তার হিসাব কষার ফুরসত আমাদের মেলেনি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর কিতাবে স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি দিনগুলোর আবর্তন ঘটান মানুষের ঈমানি পরীক্ষার জন্য এবং মুমিনদের যাচাই করার জন্য (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৪০)। ইমাম ইবনে কাসির রহমতুল্লাহি আলাইহি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সময়ের এই দ্রুতবেগকে মানবজীবনের এক সতর্কবাণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমাদের জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড যে সোনার চেয়েও মূল্যবান, তা আমরা প্রায়ই বিস্মৃত হই। পাহাড় পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করেও অতিবাহিত হয়ে যাওয়া একটি মুহূর্তও ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমাদের চারপাশের কত মানুষ গত রমজানে আমাদের সঙ্গে ছিল, যারা আজ অন্ধকার কবরের বাসিন্দা। আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবানি যে তিনি আমাদের আবারো এই বরকতময় মাস পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগ দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের পাঁচটি অমূল্য সম্পদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যার মধ্যে বার্ধক্যের পূর্বে যৌবন এবং মৃত্যুর পূর্বে জীবনের মূল্যায়ন করা অন্যতম (মুস্তাদরাকুল হাকিম, ৭৮৪৬)। রমজান কেবল একটি মাস নয়, বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধির এক বসন্তকাল। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মাসের আগমনে সাহাবীদের সুসংবাদ দিতেন। তিনি বলতেন, জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত হওয়া এবং শয়তানের শৃঙ্খলিত হওয়ার এই মাসটি মুমিনের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার (মুসনাদে আহমাদ, ৭১৪৮)। সালাফদের জীবনে রমজানের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। তারা বছরের ছয় মাস আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন যেন তারা রমজান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন এবং পরবর্তী ছয় মাস দোয়া করতেন যেন তাদের আমলগুলো কবুল হয়। তাদের এই আকুতি প্রমাণ করে যে, রমজান কেবল আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়, বরং এটি ছিল তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
রমজানের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় অর্জন করা (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৩)। ওলামায়ে কেরাম বলেন, রোজা কেবল পানাহার বর্জনের নাম নয়, বরং এটি নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশিক্ষণ। যদি কেউ মিথ্যা ও পাপাচার বর্জন করতে না পারে, তবে তার উপবাস থাকার মধ্যে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই (সহীহ বুখারী, ৬০৫৭)। আমাদের পূর্বসূরি সালাফরা এই তাকওয়ার মানদণ্ড এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যা আজ আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি সাবালক হওয়ার পর থেকে কখনো গীবত করেননি বলে জানা যায়। ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি কখনো আল্লাহর নামে অহেতুক শপথ করেননি। তাদের জীবন ছিল আল্লাহর ভয়ে কম্পমান। আবু সুলাইমান আদ-দারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রতিদিন আয়নায় নিজের চেহারা দেখতেন এই ভয়ে যে, গুনাহের কারণে তাঁর চেহারা মলিন হয়ে গেল কি না। তাদের এই চেতনা আমাদের শেখায় যে, ইবাদতের মূল নির্যাস হলো অন্তরের নিষ্ঠা।
হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মতো ব্যক্তিরা সারা বছর রোজা রাখতেন এবং রাতের অধিকাংশ সময় ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন। তার শাহাদাতের মুহূর্তেও হাতে কুরআন ছিল এবং তিনি রোজা অবস্থায় ছিলেন। একইভাবে আবু তালহা আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর সারা জীবন রোজা রেখেছেন। সালাফদের এই ত্যাগ ও নিষ্ঠা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ছিল। বর্তমান যুগে আমাদের রমজান পালনের চিত্রটি অনেক ক্ষেত্রেই হতাশাজনক। আমাদের তরুণ প্রজন্মের রাত কাটে সোশ্যাল মিডিয়া আর বিনোদনের জোয়ারে, আর দিন কাটে অলস ঘুমে। ব্যবসায়ীদের কাছে এটি ইবাদতের মৌসুম হওয়ার বদলে নিছক মুনাফা অর্জনের মৌসুমে পরিণত হয়েছে। মায়েরা ব্যস্ত থাকেন বাহারি ইফতারের আয়োজনে, ফলে ইবাদতের মূল স্বাদ থেকে তারা বঞ্চিত হন। মসজিদের প্রথম দশকের ভিড় শেষ দশকে গিয়ে কেনাকাটার ভিড়ে হারিয়ে যায়।
রমজান আমাদের শেখায় ধৈর্য ও শৃঙ্খলার পাঠ। এটি এমন এক মাস যা একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন হিসেবে গড়ে তোলে। ইবনুল কাইয়িম রহমতুল্লাহি আলাইহি যথার্থই বলেছেন, সিয়াম হলো মুত্তাকিদের জন্য লাগাম এবং যোদ্ধাদের জন্য ঢাল। আল্লাহর পক্ষ থেকে এই পুরস্কারের ঘোষণা এসেছে যে, রোজার প্রতিদান তিনি স্বয়ং প্রদান করবেন (সহীহ বুখারী, ৭৪৯২)। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি যা একজন মুমিনকে গাইরুল্লাহ বা আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়। রমজান মানে কেবল ক্ষুধার্থ থাকা নয়, বরং এটি হলো নিজের ক্রোধ ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার মাস। আমাদের উচিত এই সুযোগকে কাজে লাগানো এবং অলসতার মেঘ সরিয়ে হৃদয়ে তাকওয়ার সূর্যকে উদিত করা।
পরিশেষে, আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই সালাফদের জীবনের দিকে যারা মৃত্যুর সময়ও আফসোস করতেন যে তারা আর রোজা রাখতে পারবেন না কিংবা রাতের দীর্ঘ ইবাদত করতে পারবেন না। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মতো মহান সাহাবীরা ইবাদতের স্বাদ ও তৃষ্ণা হারানোর ভয়ে ক্রন্দন করতেন। আমরা কি কখনো ভেবেছি আমাদের শেষ সময়টি কেমন হবে? আল্লাহ তাআলা আমাদের আহ্বান করেছেন তাঁর আহ্বায়কের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য (সূরা আল-আহক্বাফ, ৪৬:৩১-৩২)। এই রমজান হোক আমাদের জীবনের মোড় পরিবর্তনের মাস। আমরা যেন কেবল খাবারের আয়োজনে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের আত্মাকে আলোকিত করি। আল্লাহ আমাদের রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে কবুল করুন এবং আমাদের লাইলাতুল কদরের পুণ্যার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।

আপনার মতামত লিখুন :