মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাতের জেরে জীবন এবং জীবিকার টানাপোড়েনে পড়েছেন এশীয় অভিবাসী কর্মীরা, যাদের একটি বড় অংশ এখন প্রাণভয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন বলে বিবিসির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মতো ধনী দেশগুলোতে কয়েক দশক ধরে এশীয় দেশগুলোর কোটি কোটি শ্রমিক কাজ করে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই দেশগুলো ইরানি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় সেখানকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে।
বিশেষ করে যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেখানকার প্রবাসীরা এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।ফিলিপাইনের ৪৯ বছর বয়সী গৃহকর্মী নরমা টাকটাকন কাতারে দীর্ঘ দুই দশক ধরে কাজ করছেন। তিনি বিবিসিকে জানান যে সাইরেনের শব্দ শুনলেই তিনি এখন প্রার্থনায় বসেন এবং আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র দেখার অভিজ্ঞতায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তার মতো লক্ষ লক্ষ অভিবাসী কর্মীর কাছে বিদেশের মাটিতে অর্জিত অর্থই ছিল দারিদ্র্য থেকে বাঁচার একমাত্র পথ।
টাকটাকন তার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে এই ঝুঁকি নিচ্ছেন, কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি তাকে আবারও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য করছে। তিনি জানান যে কাতারে একজন গৃহকর্মী মাসে প্রায় ৫০০ মার্কিন ডলার আয় করেন, যা ফিলিপাইনের সমজাতীয় চাকরির তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি।
সংঘাতের ভয়াবহতা এখন আর কেবল আতঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মার্চ আবু ধাবিতে ইরানি হামলায় ২৯ বছর বয়সী নেপালি নিরাপত্তা রক্ষী দিবাস শ্রেষ্ঠ নিহত হন। দিবাসের পরিবার জানায় যে তিনি ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত তাদের পৈত্রিক বাড়ি পুনর্নির্মাণের জন্য অর্থ সঞ্চয় করছিলেন।
তিনি তার পরিবারকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি নিরাপদ আছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তার স্বপ্ন কেড়ে নেয়। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে ৫৫ বছর বয়সী বাংলাদেশি পানি সরবরাহকারী আহমদ আলী নিহত হন। তার ছেলে আব্দুল হক জানান যে তার বাবা রমজান মাসে ইফতারের সময় এই দুর্ঘটনার শিকার হন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) দেওয়া তথ্যমতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ অভিবাসী কর্মী রয়েছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা। বিবিসি জানিয়েছে যে এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জন দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী কর্মী নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলে নিযুক্ত ফিলিপাইন দূতাবাস নিশ্চিত করেছে যে ৩২ বছর বয়সী মেরি অ্যান ভিওলাসকুয়েজ নামক এক ফিলিপিনো কর্মী তেল আবিবে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় আহত হন। তিনি তার রোগীকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দুর্ঘটনার কবলে পড়েন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ এবং ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর অর্থনীতিতে এই প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফিলিপাইনের মোট অর্থনীতির ১০ শতাংশ আসে রেমিট্যান্স থেকে যার অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫০০ বাংলাদেশি কর্মীকে সরকারি উদ্যোগে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাহরাইন থেকে আরও কয়েকটি বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ফিলিপাইন সরকার জানিয়েছে যে গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার কর্মী এবং তাদের পরিবারকে ম্যানিলায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্লাইটের পথ দীর্ঘ হওয়ায় অনেক কর্মীকে কুয়েত বা কাতার থেকে প্রথমে সড়কপথে সৌদি আরব এবং সেখান থেকে বিমানে করে দেশে ফিরতে হচ্ছে।
তবে সবার জন্য দেশে ফেরার সুযোগ নেই। মিয়ানমারের ৩১ বছর বয়সী সু সু দুবাইয়ে একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে কাজ করেন। তিনি জানান যে তার নিজ দেশ মিয়ানমারও গৃহযুদ্ধে বিদ্ধস্ত, তাই দুবাইয়ে বিপদ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখানেই থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি সবসময় একটি জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখেন যাতে সাইরেন বাজলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেন। এই অভিবাসী কর্মীদের জন্য এখন একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সচ্ছলতার হাতছানি রয়েছে, অন্যদিকে মাথার ওপর উড়তে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রাণঘাতী হুমকিও বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে তাতে এশীয় শ্রমবাজারের এই বিশাল উৎস ভবিষ্যতে সঙ্কটের মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

আপনার মতামত লিখুন :