ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে বলে ১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। গত ৪ মার্চ ইরান কর্তৃক হোর্মুজ প্রণালী আনুষ্ঠানিকভাবে অবরুদ্ধ করার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতার এনার্জি তাদের সমস্ত রপ্তানিতে ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ বা অনিবার্য কারণবশত কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। আইইএ (IEA) এই পরিস্থিতিকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ বিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২৭ মার্চ এক ঘোষণায় জানিয়েছেন যে, তেহরানের অনুরোধে তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলা ১০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন। এই বিরতির সময়সীমা আগামী ৬ এপ্রিল রাত ৮টা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেছেন যে ইরানের সাথে আলোচনা ‘খুব ভালো’ চলছে।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো আলোচনার কথা স্বীকার করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরতি মূলত এক ধরণের কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই প্রক্রিয়াকে ‘বোমা দিয়ে আলোচনা’ (negotiating with bombs) বলে বর্ণনা করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চুক্তি না হলে হামলা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাবে কেবল তেলের দামই বাড়েনি, বরং বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও জরুরি অবস্থা তৈরি হয়েছে। গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (GCC) ভুক্ত দেশগুলোতে খাদ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার ফলে লুলা রিটেইল-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আকাশপথে নিত্যপণ্য পরিবহনে বাধ্য হচ্ছে। ইউরোপে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি গ্যাসের মজুদ ৩০ শতাংশে নেমে আসায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
জার্মানি ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে ইতিমধ্যেই জ্বালানি জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।ভ্রমণ নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (ICAO) কঠোর সতর্কতা জারি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বর্তমানে অনিরাপদ হওয়ায় অধিকাংশ এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। ইরান, ইসরায়েল, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে ‘ডু নট ট্রাভেল’ বা ভ্রমণের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে।
যুদ্ধের স্থায়িত্ব নিয়ে ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, মার্কিন সামরিক অভিযান আগামী ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে। তবে ইরান শর্ত দিয়েছে যে ভবিষ্যতে আর কোনো আগ্রাসন হবে না—এমন গ্যারান্টি পেলেই তারা যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজি। মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপ বিশ্বকে আরও বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :