পৃথিবীর এই দৃশ্যপট বড়ই বিচিত্র এবং মাঝে মাঝে আমাদের সাধারণ যুক্তির বাইরে চলে যায়। আমরা অনেক সময় দেখি একজন সৎ মানুষ, যিনি জীবনে কোনোদিন মিথ্যার আশ্রয় নেননি, সর্বদা মানুষের উপকার করেছেন এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলেছেন, তিনিই হয়তো সারাজীবন অভাব-অনটন আর শারীরিক অসুস্থতায় জর্জরিত হয়ে আছেন। অন্যদিকে এমন একজন ব্যক্তি যার আয়ের উৎস সম্পূর্ণ হারাম, যিনি অন্যের উপর জুলুম করেন এবং আল্লাহর ইবাদত থেকে শত হাত দূরে থাকেন, তাকেই হয়তো দেখা যায় জাগতিক সব ধরনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আর বিলাসিতার মধ্যে নিমজ্জিত।
এই বৈপরীত্য দেখে অনেক সময় ঈমানদার হৃদয়েও প্রশ্ন জাগে যে, আল্লাহ কেন তাঁর প্রিয় বান্দাদের এত কষ্ট দেন? সৎ পথে চলার পরেও কেন জীবন এত কণ্টকাকীর্ণ হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের জাগতিক দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ঈমানি প্রজ্ঞার আলোতে তাকাতে হবে। মূলত মুমিনের জীবন কোনো নিছক দুর্ঘটনা নয় বরং এক সুনিপুণ পরিকল্পনার অংশ।
ইসলামের মৌলিক শিক্ষা আমাদের জানায় যে, এই পৃথিবী মুমিনের জন্য কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য বা ভোগের জায়গা নয়। বরং এটি একটি পরীক্ষাগার মাত্র। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর কালামে পাকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মানুষকে ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ ও জীবনের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)। এই পরীক্ষা কেন? কারণ সোনাকে যেমন আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি করা হয়, তেমনি একজন মুমিনকে বিপদের আগুনে দগ্ধ করে তার ঈমানকে মজবুত করা হয় এবং তার ভেতরের কালিমা দূর করা হয়।
আমরা যখন দুনিয়ার সুখ-শান্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির মাপকাঠি বানিয়ে ফেলি, তখনই আমাদের মনে সংশয় জাগে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব আল্লাহর কাছে এতটাই মূল্যহীন যে, তিনি তাঁর প্রিয়তম সৃষ্টি অর্থাৎ নবীদেরও এই দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে মানুষের মধ্যে কাদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়, তখন তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছিলেন যে নবীদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী তাদের এবং মানুষের দ্বীনদারি বা ঈমানের শক্তি অনুযায়ী এই পরীক্ষার তীব্রতা নির্ধারিত হয় (সুনানে ইবনে মাজাহ, ৪০২৩)।
এই মহাসত্যটি বোঝার পর আমাদের সামনে পরিষ্কার হয় যে, কষ্ট পাওয়া মানেই আল্লাহর গজব নয়। বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ মনোযোগ ও ভালোবাসার লক্ষণ। আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, তাদের তিনি পবিত্র করতে চান। মানুষ হিসেবে আমাদের অজান্তে অনেক ভুল বা পাপ হয়ে যায়। আল্লাহ যদি কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন এবং চান যে সে পরকালে কোনো পাপের বোঝা ছাড়া তাঁর সামনে দাঁড়াক, তবে তিনি দুনিয়াতে তাকে ছোটখাটো কিছু বিপদ বা অসুস্থতা দেন। এই কষ্টের প্রতিটি মুহূর্তের বিনিময়ে বান্দার গুনাহগুলো ঝরে পড়ে।
শীতকালে গাছ থেকে যেমন শুকনো পাতা ঝরে যায়, মুমিনের প্রতিটি শারীরিক বা মানসিক যন্ত্রণার বিনিময়ে তার আমলনামা থেকে পাপের বোঝা তেমনি কমে যায় (সহীহ আল-বুখারী, ৫৬৪১)। এটি আল্লাহর এক বিশেষ রহমত, যা দিয়ে তিনি বান্দাকে আখিরাতের ভয়াবহ আজাব থেকে রক্ষা করার বন্দোবস্ত করেন।
বিপদ আসার দ্বিতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মর্যাদা বৃদ্ধি বা রফ‘উল দারাজাত। জান্নাতের অনেক উঁচু মাকাম বা স্তর এমন আছে যা কেবল নামাজ, রোজা বা সাধারণ দান-খয়রাত দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। আল্লাহ যখন কোনো বান্দার জন্য জান্নাতুল ফেরদাউসের এমন কোনো সুউচ্চ আসন নির্ধারণ করেন যা বান্দার আমল দিয়ে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তখন তিনি সেই বান্দাকে বিশেষ কোনো পরীক্ষায় ফেলেন। হতে পারে তা সন্তান হারানো, দীর্ঘস্থায়ী রোগ বা সামাজিক মর্যাদা হারানো।
যখন সেই বান্দা চরম ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর ফয়সালার উপর তুষ্ট থাকে, তখন আল্লাহ সেই ধৈর্যের উসিলায় তাকে জান্নাতের সেই উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেন (সুনানে আবি দাউদ, ৩০৯০)। তাই যে কষ্টকে আমরা অভিশাপ মনে করছি, তা হয়তো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ প্রমোশন।
অন্যদিকে যারা আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার পরেও সুখে আছে, তাদের এই সুখকে বলা হয় ‘ইস্তিদরাজ’ বা অবকাশ। এটি প্রকৃত সুখ নয় বরং এক ধরনের মোহ। আল্লাহ যখন কোনো পাপিষ্ঠকে তার অবাধ্যতায় ছাড় দিতে থাকেন এবং তার নিয়ামত বাড়িয়ে দেন, তখন সে মনে করে সে সঠিক পথে আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। যখন সে তার পাপের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়, তখন আল্লাহ তাকে হঠাৎ এমনভাবে পাকড়াও করেন যে তার আর ফেরার পথ থাকে না (সূরা আল-আন‘আম, ৬:৪৪)।
দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার স্বরূপ আর কাফিরের জন্য জান্নাত স্বরূপ (সহীহ মুসলিম, ২৯৫৬)। কারাগার কখনোই আরামদায়ক হয় না, সেখানে বিধি-নিষেধ থাকে, সেখানে ধৈর্য ধরতে হয়। মুমিন জানে যে তার আসল বাড়ি জান্নাত, তাই সে এই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী কষ্টগুলোকে পরকালের স্থায়ী সুখের বিনিময়ে বরণ করে নেয়।
পরিশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তিনি তাদের পরীক্ষায় ফেলেন। বিপদে আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন, সেটাই আমাদের ঈমানের প্রকৃত পরিচয়। আমরা যদি অভিযোগ করি যে কেন আমার সাথেই এমন হলো, তবে আমরা আল্লাহর অসন্তুষ্টি অর্জন করি। আর যদি আমরা বিশ্বাস রাখি যে আমার রবের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে গভীর কোনো কল্যাণ নিহিত আছে, তবে আমরা তাঁর সন্তুষ্টির জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। কষ্টের রাত যতই দীর্ঘ হোক না কেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বস্তির সকাল নিশ্চিতভাবেই আসবে। কারণ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ দুইবার ওয়াদা করেছেন যে নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে (সূরা আশ-শারহ, ৯৪:৬)। তাই ভালো মানুষের জীবনে কষ্ট আসাটা কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি এক মহাবিজয়ের পূর্বপ্রস্তুতি।

আপনার মতামত লিখুন :