মানুষের জীবন এক বিরামহীন দৌড়ের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে লক্ষ্য কেবল বস্তুগত উন্নতি এবং জাগতিক আভিজাত্য। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হলো দুনিয়ার লোভ এবং সম্পদ বাড়ানোর এক উন্মত্ত প্রতিযোগিতা যা মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করে ফেলেছে। আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্য আমাদের শেখাচ্ছে আরো গাড়ি, আরো বাড়ি, আরো দালান এবং আরো স্থাবর সম্পত্তির মালিক হওয়ার নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা। এই ‘আরো চাই’ এর হাহাকার মানুষকে এতটাই অন্ধ করে রেখেছে যে সে তার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নেতাগিরি, মাতব্বরি, অহংকার এবং জৌলুস নিয়ে বাড়াবাড়ি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেখানে তিনি ইরশাদ করেছেন যে প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে আখেরাত ভুলিয়ে দিয়েছে যতক্ষণ না তোমরা কবরে গিয়ে পৌঁছাও (সূরা আত-তাকাসুর, ১০২:১-২)। অর্থাৎ এই দুনিয়ার মোহ মানুষকে এমন এক ঘোরের মধ্যে রাখে যা কেবল মৃত্যুর পরেই কাটবে কিন্তু ততক্ষণে হয়তো সংশোধনের কোনো সুযোগ অবশিষ্ট থাকবে না। আল্লাহ সতর্ক করে বলছেন যে এই গাফিলতি বা অবহেলার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে এবং কবরে প্রবেশের পর মানুষ তার প্রতিটি নাফরমানির শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। হাশরের ময়দানে জাহান্নামের আগুনের লেলিহান শিখা দেখার পর মানুষের মনে হবে যে দুনিয়ার এই তুচ্ছ স্বার্থের জন্য কেন সে তার অনন্তকালের আখেরাতকে ধ্বংস করল।
দুনিয়ার সামান্য ও তুচ্ছ স্বার্থের জন্য মানুষ আজ তার স্রষ্টাকে ভুলে গেছে। জীবিকার দোহাই দিয়ে মানুষ রবের হুকুম পালনে অবহেলা করছে। দেখা যায় যে সামান্য কিছু পণ্য বিক্রির লোভে কিংবা রাস্তার পাশে কেনাবেচার ব্যস্ততায় মানুষ ওয়াক্তের পর ওয়াক্ত নামাজ ছেড়ে দিচ্ছে। সামান্য বেতন বা নগণ্য একটি চাকরির খাতিরে মানুষ তার পালনকর্তার হুকুম অমান্য করতে দ্বিধা বোধ করছে না। অথচ সেই রবই তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে রিজিক দিচ্ছেন। মানুষের এই অকৃতজ্ঞতা তাকে অন্ধকার পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সামান্য বুট-মুড়ির দোকান বা বিড়ি-সিগারেটের ব্যবসার মায়া আমাদের আখেরাতের বিশাল প্রাপ্তি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। যুবসমাজের দিকে তাকালে আজ বুক ফেটে মায়া হয় কারণ তারা কয়েক হাজার টাকার একটি মোবাইল হাতে পেয়ে নিজের ইজ্জত, চরিত্র ও আখেরাত বিসর্জন দিচ্ছে। এই ডিজিটাল যন্ত্রের নেশায় পড়ে তারা তাদের বংশের সম্মান ও ইসলামের মূল্যবোধ ভুলে গেছে। রাত জেগে অশ্লীল ভিডিও দেখা এবং অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়ে তারা নিজেদের জীবন ও যৌবনকে ধ্বংস করছে। এই অশ্লীলতার শেষ কোথায় তা কি তারা একবারও ভেবে দেখেছে? একজন যুবক যদি দিন-রাত স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকে তবে তার ভবিষ্যৎ এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সে কী রেখে যাচ্ছে তা একটি বড় প্রশ্ন। যে সন্তান এক ওয়াক্ত নামাজ পড়ে না বা কুরআন তেলাওয়াত করতে জানে না তার ইহকাল ও পরকাল উভয়ই অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত।
একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের জীবনের মৌলিক ভিত্তি হওয়া উচিত গুনাহ বর্জন এবং আল্লাহর হুকুম পালন। কিন্তু আজ আমরা ইসলামকে নিজের খেয়ালখুশি মতো মানার চেষ্টা করি। মন চাইলে ইবাদত করি আর স্বার্থে আঘাত লাগলে তা বর্জন করি। অথচ ঈমানের দাবি হলো নামাজ যত কষ্টকরই হোক তা আদায় করতেই হবে। সুদ, ঘুষ ও হারামের কোটি কোটি টাকার অফার এলেও একজন প্রকৃত মুমিন তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে কারণ তার রবের সন্তুষ্টিই তার কাছে সব। এই চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সংকল্পই হলো তাকওয়া। আল্লাহ তাআলা চান যে বান্দা কেবল তাঁর জন্য গুনাহ ছাড়বে এবং বিনিময়ে তিনি তাকে অনন্তকালের জান্নাত দান করবেন। যে ব্যক্তি ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছেও ফজরের জামাত ধরার জন্য ব্যাকুল থাকে সেই প্রকৃত মুত্তাকি। হারামের পথে উপার্জন করে বিত্তবান হওয়া সহজ হতে পারে কিন্তু একজন মাদ্রাসার শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম সামান্য বেতনে স্ত্রী-সন্তানের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেলেও হারামের দিকে পা বাড়ান না কারণ তিনি জানেন অল্প আয়ে বরকত আছে কিন্তু হারামে কেবল ধ্বংস। মুমিনের বিশ্বাস হলো এই দুনিয়াই শেষ নয় বরং আসল জীবন হলো আখেরাতের জীবন। দুনিয়াতে আমি যেমনই থাকি না কেন দেখার বিষয় হলো পরকালে আমার অবস্থান কী হবে।
আত্মশুদ্ধি ও হেদায়েতের জন্য পবিত্র কুরআনকে আঁকড়ে ধরা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কুরআন কেবল পাঠের জন্য নয় বরং এটি মুত্তাকিদের পথপ্রদর্শক হিসেবে নাজিল হয়েছে (সূরা আল-বাকারা, ২:২)। এটি হলো রহমত, সুসংবাদ এবং জীবনের প্রতিটি সমস্যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা। যেদিন পৃথিবীতে আল্লাহর জিকির এবং কুরআন তেলাওয়াত বন্ধ হয়ে যাবে সেদিনই কিয়ামত সংঘটিত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষ্যমতে যতক্ষণ পৃথিবীতে আল্লাহ আল্লাহ বলার মতো একজন লোকও থাকবে ততক্ষণ পৃথিবী ধ্বংস হবে না (সহীহ মুসলিম, ১৪৮)। আমাদের শরীরের নিঃশ্বাস যেমন প্রাণের স্পন্দন ঠিক তেমনি আল্লাহর জিকির হলো পৃথিবীর প্রাণের স্পন্দন। অথচ আজ কত শত মুসলমান আছে যারা শুদ্ধ করে রবের নাম নিতে পারে না বা কুরআন পড়তে পারে না। যার হৃদয়ে কুরআনের আলো নেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে একটি বিরান ঘরের সাথে তুলনা করেছেন (সুনানে তিরমিজি, ২৯১৩)। বিরান ঘরে যেমন ক্ষতিকর পোকা-মাকড় থাকে তেমনি কুরআনহীন হৃদয়ে পশুবৃত্তি ও অহংকার বাসা বাঁধে। যারা আল্লাহর নিদর্শন দেখে না বা তাঁর কথা শোনে না তারা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট (সূরা আল-আরাফ, ৭:১৭৯)।
বর্তমান সমাজে জিনা বা ব্যভিচার এক মরণব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখের জিনা, কানের জিনা এবং হাতের জিনা আজ আমাদের যুবসমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবধান করেছেন যে লজ্জাস্থান এই সমস্ত পাপাচারকে চূড়ান্ত রূপ দান করে (সহীহ বুখারি, ৬২৪৩)। আল্লাহ তাআলা কেবল জিনা নয় বরং জিনার কাছে যেতেও নিষেধ করেছেন (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩২)। অশ্লীলতা মানুষকে জাহান্নামের ইন্ধন হিসেবে গড়ে তোলে। পর্দার বিধান লঙ্ঘন এবং বেপর্দা হয়ে চলাফেরা করা একজন নারীকেও শাস্তির মুখোমুখি করতে পারে। সূরা আল-ফুরকানে আল্লাহ তিনটি কবিরা গুনাহের কথা বলেছেন যার শাস্তি হবে দ্বিগুণ এবং যা মানুষকে লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল জাহান্নামে রাখবে। কিন্তু দয়াময় আল্লাহ তাঁর ক্ষমার দরজা খোলা রেখেছেন। যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং নেক আমল করে আল্লাহ তাদের পূর্বের গুনাহগুলোকে নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দেন (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭০)। মালিক আমাদের শাস্তি দিতে চান না বরং তিনি আমাদের ক্ষমা করতেই ভালোবাসেন। তাই এখনো সময় আছে রবের দিকে ফিরে আসার। ষাট বা সত্তর বছর বয়সেও যারা পাপাচার ছাড়তে পারেননি তাদের ভাবা উচিত কবরের সেই মুহূর্তের কথা যখন ফেরেশতারা লোহার মুগুর দিয়ে আঘাত করবে (সহীহ বুখারি, ১৩৩৮)। সেই ভয়াবহ শাস্তি থেকে বাঁচতে আজই চোখের পানি ফেলে তওবা করা জরুরি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে ফেরার তৌফিক দান করুন। আমীন।

আপনার মতামত লিখুন :