সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩২

জান্নাতের অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য ও মুমিনের অনন্ত জীবনের পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ১০:১৩ এএম
জান্নাতের অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য ও মুমিনের অনন্ত জীবনের পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা

অনন্ত সুখের ঠিকানা জান্নাত /Ai

জান্নাত হলো মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য প্রস্তুতকৃত এমন এক পরম সুখের ঠিকানা, যা কোনো চর্মচক্ষু আজ পর্যন্ত দেখেনি, কোনো কর্ণ যার বিবরণ কখনো শ্রবণ করেনি এবং কোনো মানুষের কল্পনাশক্তির পরিধি যার বিশালতাকে স্পর্শ করতে পারেনি (সহীহ বুখারী, ৩২৪৪)। দুনিয়ার নশ্বর জীবনের পর হাশরের ময়দান পার হয়ে মুমিনের গন্তব্য হবে এই চিরস্থায়ী শান্তির উদ্যান। জান্নাত এমন এক জগত যেখানে দুঃখ, কষ্ট বা হতাশার কোনো লেশমাত্র থাকবে না। কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে যখন মানুষের প্রতিটি কর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হবে, তখন যাদের আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে এবং যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন, তাদের জন্যই নির্ধারিত রয়েছে এই মহিমান্বিত আবাস। তবে জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে মুমিনদের এক বিশেষ পবিত্রকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। হাশরের ময়দান থেকে জান্নাতের দরজার দিকে যাওয়ার পথে মুমিনদের প্রথমে একটি বিশেষ নহরে গোসল করানো হবে, যা তাদের শরীরের সকল প্রকার বাহ্যিক অপবিত্রতা ও দুনিয়ার মলিনতা দূর করে দেবে। এরপর তাদের পান করানো হবে জান্নাতের সুশীতল পানি, যা তাদের অন্তরের সকল হিংসা, বিদ্বেষ ও নেতিবাচকতাকে ধুয়ে মুছে সম্পূর্ণ পবিত্র করে তুলবে। জান্নাতিরা যখন জান্নাতের দরজায় পৌঁছাবে, তখন তাদের শরীরের অনাকাঙ্ক্ষিত ত্রুটিগুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং তারা ইউসুফ আলাইহিস সালামের মতো সৌন্দর্য এবং ঈসা আলাইহিস সালামের মতো ৩৩ বছর বয়সের টগবগে যুবক হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে (সহীহ মুসলিম, ২৮৩৫)।

জান্নাতের বিশালতা ও এর শৃঙ্খলা মুমিনকে বিমোহিত করবে। জান্নাতের মোট আটটি দরজা রয়েছে এবং প্রতিটি দরজা নির্দিষ্ট আমলকারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। যারা দুনিয়াতে নিষ্ঠার সাথে নিয়মিত সালাত আদায় করেছে তাদের জন্য ‍‍`বাবুস সালাত‍‍`, যারা পরম ধৈর্যের সাথে সিয়াম পালন করেছে তাদের জন্য ‍‍`বাবুর রাইয়ান‍‍`, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অকাতরে দান-সাদাকা করেছে তাদের জন্য ‍‍`বাবুস সাদাকা‍‍` এবং যারা আল্লাহর কালিমাকে সমুন্নত রাখতে জিহাদ করেছে তাদের জন্য ‍‍`বাবুল জিহাদ‍‍` নামক দরজা দিয়ে প্রবেশের আহ্বান জানানো হবে (সহীহ বুখারী, ১৮৯৭)। এছাড়াও যারা হজ সম্পাদন করেছে, যারা নিজেদের তীব্র রাগ নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং যারা সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মগ্ন ছিল, তাদের জন্য আল্লাহ বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ প্রবেশপথ নির্ধারণ করে রেখেছেন। জান্নাতের প্রতিটি দরজার চৌকাঠের ব্যবধান হবে মক্কা থেকে হিজরের দূরত্বের সমান বিশাল, তবুও সেদিন আল্লাহর রহমতপ্রত্যাশী মুমিনদের ভিড়ে তা পূর্ণ হয়ে যাবে। জান্নাতিরা যখন দরজার সামনে দাঁড়াবে, তখন জান্নাতের প্রধান রক্ষী ফেরেশতা রিদওয়ান তাদের সাদর সম্ভাষণ জানাবে। দরজা খোলার সাথে সাথেই জান্নাতের ভেতর থেকে এক মৃদু ও সুশীতল বাতাস প্রবাহিত হবে, যার ঘ্রাণ কয়েক বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে। সেই সুবাস মুমিনের আত্মাকে এমনভাবে প্রশান্ত করবে যে মুহূর্তের মধ্যেই দুনিয়ার সমস্ত যাতনা ও কষ্টের স্মৃতি মন থেকে মুছে যাবে। জান্নাতের মাটি হবে জাফরানের এবং কঙ্কর হবে মহামূল্যবান মণি-মুক্তার। এখানকার প্রাসাদগুলো তৈরি হবে সোনা ও রুপার ইট দিয়ে, যার গাঁথুনি হবে সুগন্ধি কস্তুরীর (সুনানে তিরমিজী, ২৫ ২৬)।

জান্নাতে প্রবেশের পর মুমিনরা তাদের জন্য প্রস্তুতকৃত বিশাল সব প্রাসাদ ও উদ্যান দেখতে পাবে। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এমন জীবন যার কোনো শেষ নেই এবং এমন স্বাস্থ্য যা কখনো ব্যাধিগ্রস্ত হবে না (সহীহ মুসলিম, ২৮৩৭)। জান্নাতের আপ্যায়ন শুরু হবে অত্যন্ত রাজকীয়ভাবে। জান্নাতিদের সর্বপ্রথম মাছের কলিজার ভুনা দিয়ে আপ্যায়ন করা হবে (সহীহ বুখারী, ৬৫২০)। জান্নাতের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে চারটি বিশেষ নদী—দুধের নদী যার স্বাদ কখনো নষ্ট হয় না, মধুর নদী যা অত্যন্ত স্বচ্ছ, পানির নদী যা সদা নির্মল এবং শারাবান তাহুরা বা পবিত্র পানীয়ের নদী যা পান করলে কোনো অপকার হবে না বরং তা হবে হৃদয়ের জন্য পরম তৃপ্তিদায়ক (সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:১৫)। জান্নাতের ফলমূলের স্বাদ হবে অতুলনীয়। যখনই কোনো জান্নাতি কোনো ফলের আকাঙ্ক্ষা করবে, বৃক্ষের ডালগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার হাতের নাগালে চলে আসবে। পোশাক-পরিচ্ছদেও থাকবে আভিজাত্যের ছাপ। মুমিনদের পোশাক হবে মিহি সবুজ রেশম ও কারুকার্যখচিত মখমলের তৈরি, যা হবে চিরনতুন এবং অত্যন্ত উজ্জ্বল (সূরা আল-ইনসান, ৭৬:২১)। তাদের হাতে পরিয়ে দেওয়া হবে সোনা ও রুপার কঙ্কন, যা তাদের রাজকীয় মর্যাদাকে ফুটিয়ে তুলবে।

জান্নাতের সামাজিক জীবন হবে অত্যন্ত মধুর। দুনিয়ার নেককার স্ত্রী, সন্তান ও পিতামাতার সাথে মুমিনরা পুনরায় মিলিত হবে, যা তাদের আনন্দকে পূর্ণতা দান করবে। সেখানে কোনো বিবাদ, মনোমালিন্য বা অসার কথাবার্তা থাকবে না। যারা দুনিয়াতে একাকী ছিলেন বা অসুখী ছিলেন, আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাতে সর্বোৎকৃষ্ট সঙ্গী ও হুরদের ব্যবস্থা করবেন। জান্নাতের হুররা হবে অত্যন্ত লাবণ্যময়ী ও প্রেমময়ী। জান্নাতের একটি অসাধারণ ঘটনা হবে ‍‍`মৃত্যুর মৃত্যু‍‍`। জান্নাতি ও জাহান্নামীরা নিজ নিজ স্থানে থিতু হওয়ার পর মৃত্যুকে একটি দুম্বার আকৃতিতে এনে জবাই করা হবে এবং ঘোষণা করা হবে যে এখন থেকে কেবল অনন্ত জীবন, আর কোনোদিন মৃত্যু আসবে না (সহীহ বুখারী, ৬৫৪৮)। এই ঘোষণায় মুমিনদের আনন্দ আটখানা হয়ে যাবে। জান্নাতের বিশালতা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে সেখানে ‍‍`তুবা‍‍` নামক একটি গাছ আছে যার ছায়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহীর একশত বছর সময় লাগবে (সহীহ বুখারী, ৩২৪৪)। জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর জান্নাতুল ফিরদাউস থেকে সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়েছে এবং এটি সরাসরি আল্লাহর আরশের নিচে অবস্থিত।

জান্নাতের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হবে মহান আল্লাহর দর্শন লাভ। যখন জান্নাতিরা তাদের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া পূরণ করে সুখে থাকবে, তখন আল্লাহ তাদের জিজ্ঞেস করবেন তারা আরও কিছু চায় কি না। তারা বলবে যে আল্লাহ তাদের যা দিয়েছেন তাতেই তারা ধন্য। তখন আল্লাহ তার নূরানি চেহারা থেকে পর্দা সরিয়ে নেবেন। আল্লাহর সেই অপরূপ দর্শন লাভের পর মুমিনরা অনুভব করবে যে জান্নাতের অন্য সকল নেয়ামত এই দর্শনের কাছে তুচ্ছ (সহীহ মুসলিম, ১৮৩)। আল্লাহর এই দিদারই হবে জান্নাতের সর্বোচ্চ সার্থকতা। এছাড়াও প্রতি সপ্তাহে জান্নাতিদের জন্য একটি বিশেষ বাজার বসবে যেখানে উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা সুগন্ধি বাতাস তাদের রূপ ও সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেবে (সহীহ মুসলিম, ২৮৩৩)। জান্নাতের এই জীবন হবে সম্পূর্ণ কর্মহীন ও ক্লান্তিহীন। সেখানে কোনো ঘুম বা অপবিত্রতার প্রয়োজন হবে না। জান্নাতিদের মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাসবিহ ও আল্লাহর গুণগান বের হবে, যা তাদের আত্মার খোরাক হিসেবে কাজ করবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

মোটিভেশন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!