সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও মানবিকতার অবক্ষয়: একটি গাণিতিক পর্যালোচনা

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ১০:৪৩ এএম
প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও মানবিকতার অবক্ষয়: একটি গাণিতিক পর্যালোচনা

প্রযুক্তির মায়াজালে বন্দি বিবেক /Ai

বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আমাদের জীবনের সংজ্ঞাকে আমূল বদলে দিয়েছে। আমরা আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের চিন্তার জগতকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আমাদের পকেটে থাকা ছোট্ট স্মার্টফোনটি আজ পুরো পৃথিবীর তথ্যের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তি আজ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিশ্বের শত কোটি মানুষের নাড়ির খবর এনে দিচ্ছে। শায়খ আনিসুর রহমান আশরাফীর একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এখানে প্রণিধানযোগ্য, যেখানে তিনি উন্নত চিকিৎসার তথ্যের জন্য প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছিলেন এবং নিমিষেই বিদেশের হাসপাতালের বিস্তারিত বিবরণ লাভ করেছিলেন। এটি নিঃসন্দেহে বিজ্ঞানের এক আশীর্বাদ। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠে তাকালে আমরা এক ভয়ংকর ও বীভৎস বাস্তবতার মুখোমুখি হই। প্রশ্ন জাগে, এই যন্ত্র আমাদের মানুষ হিসেবে উন্নত করছে নাকি আমাদের ভেতরকার মানবিক সত্তাকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে? গ্লোবাল ভিলেজের এই যুগে পৃথিবী ছোট হয়ে এলেও মানুষের মনের সংকীর্ণতা এবং অনুভূতিহীনতা আজ আকাশচুম্বি।

আমাদের এই অনুভূতিহীনতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল নোয়াখালীর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। সেখানে একটি প্রবাসী পরিবারের সাতজন সদস্য যখন পানিতে ডুবে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিল, তখন পাড়ে উপস্থিত শত শত মানুষ তাদের বাঁচাতে এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ব্যস্ত ছিল নিজ নিজ মোবাইলে ভিডিও করতে। এই যে মানুষের জীবনের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল, এটি কি একটি সুস্থ ও সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে? প্রযুক্তির নেশা আমাদের ভেতর থেকে দয়া, মায়া ও সহমর্মিতার মতো মৌলিক মানবিক গুণগুলোকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। আমরা আজ রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে স্ক্রিনের পিক্সেলকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি। আর্তনাদ করা মানুষের বাঁচার আকুতি আজ আমাদের কানে পৌঁছায় না, কারণ আমাদের সমস্ত মনোযোগ তখন ক্যামেরার ফ্রেম ঠিক করার দিকে। এই নির্মমতা প্রমাণ করে যে আমরা প্রযুক্তির দাসত্ব করতে গিয়ে নিজেদের বিবেককে বিসর্জন দিয়েছি।

আমাদের যুবসমাজের বর্তমান চিত্রটি আরও হতাশাজনক। হাতে দামি স্মার্টফোন থাকা মানেই আজ প্রত্যেকেই নিজেকে একেকজন বড় বিশ্লেষক বা সাংবাদিক মনে করছেন। গঠনমূলক কাজের পরিবর্তে তারা সারারাত জেগে মোবাইলে অশ্লীলতা ও অনর্থক বিনোদনে মত্ত থাকছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে তিনি জিন ও মানুষকে কেবল তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)। কিন্তু শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে আজকের যুবকরা সেই মহৎ উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে সময়ের অপচয় করছে। শয়তান মানুষকে দরিদ্রতার ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করে (সূরা আল-বাকারা, ২:২৬৮)। এই ডিজিটাল যুগে শয়তানের সেই ফাঁদগুলো আরও সুনিপুণ হয়েছে। মানুষ মনে করছে তার এই যৌবন ও সময় চিরস্থায়ী, অথচ মৃত্যু যে কোনো মুহূর্তে অতর্কিতে হানা দিতে পারে। জীবনের এই অসারতাকে গাণিতিক হিসাব দিয়ে বিচার করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

একটি সাধারণ গাণিতিক হিসাব আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে হিজরি ১৪৪৭ সন চলছে। আজ থেকে প্রায় ১৪৪৬ বছর আগে বদরের যুদ্ধে ইসলামের শত্রু আবু জাহেল নিহত হয়েছিল। সে পৃথিবীতে বেঁচে ছিল বড়জোর ৬০ বা ৭০ বছর। অর্থাৎ সে মাটির উপরে ছিল মাত্র কয়েক দশক, কিন্তু মাটির নিচে অর্থাৎ কবরের জীবনে সে আজ প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে অবস্থান করছে। মানুষের গড় আয়ু যদি $L$ হয় এবং কবরের সময় যদি $G$ হয়, তবে দেখা যায় $G$ এর মান $L$ এর চেয়ে শতগুণ বেশি। আমাদের পূর্বপুরুষরাও একইভাবে স্বল্প সময়ের জন্য পৃথিবীতে এসেছিলেন এবং আজ তারা দীর্ঘকাল ধরে কবরের বাসিন্দা। এই সংক্ষিপ্ত ৬০-৭০ বছরের জন্য আমরা যে পরিমাণ মেধা ও শ্রম ব্যয় করছি, তার কিঞ্চিৎ অংশও কি অনন্তকালের সেই কবরের জীবনের জন্য সঞ্চয় করছি? এই উদাসীনতা কি একজন বুদ্ধিমান মানুষের পরিচয় হতে পারে? মাটির উপরের জৌলুস সাজাতে গিয়ে আমরা মাটির নিচের ঘরটি অন্ধকার করে রাখছি।

সমাজে নৈতিকতার এই ধস আমাদের দুর্নীতির দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। মানুষের বিপদের সময় তাদের জিম্মি করে অর্থ উপার্জন করা আজ সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দুর্যোগের সময় পানির বোতলের দাম ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া এক ধরনের পৈশাচিক মানসিকতা। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে প্রতিটি ভালো কাজই সদাকা। এমনকি অপর ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলাও একটি ইবাদত (জামে আত-তিরমিযী, ১৯৫৬)। কিন্তু আমরা আজ সেই মানসিকতা হারিয়ে কেবল নিজের স্বার্থের পেছনে ছুটছি। সময়ের অপচয় নিয়ে জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহর একটি পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তিন ধরনের ক্ষতির কথা বলেছেন—সরাসরি গুনাহে লিপ্ত হওয়া, অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করা এবং নিজের সক্ষমতার চেয়ে কম নেক আমল করা। আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত দামী। যে সময়টি একবার চলে যাচ্ছে, তা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তাই সময়ের প্রতিটি অংশকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জনকল্যাণে ব্যয় করা মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।

পরিশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে যে মানুষের বিবেক ও অনুভূতিই তাকে পশু থেকে আলাদা করে। যার জীবন শরীয়তের গণ্ডিতে নিয়ন্ত্রিত নয়, আল্লাহ তাকে পশুর চেয়েও অধম বলেছেন (সূরা আল-আ‍‍`রাফ, ৭:১৭৯)। প্রযুক্তির এই প্লাবনে ভেসে না গিয়ে আমাদের আখেরাতমুখী জীবনের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস যেন আল্লাহর জিকিরে সজীব থাকে। চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনর্থক আড্ডা কিংবা মোবাইলে অশ্লীলতা দেখে নিজের জীবনকে অপবিত্র করা কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজ নয়। আসুন আমরা প্রযুক্তির দাসত্ব ছেড়ে আল্লাহর গোলামি গ্রহণ করি। মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করি এবং একে অপরের বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়াই। আমাদের এই সংক্ষিপ্ত জীবনের প্রতিটি কাজ যেন পরকালের পাথেয় হিসেবে কবুল হয়। আল্লাহ আমাদের প্রযুক্তির মোহ থেকে মুক্ত হয়ে খাঁটি মানুষ এবং সত্যিকারের মুমিন হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

মোটিভেশন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!