সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩২

পৃথিবীর শেষ দিন ও কেয়ামতের ভয়াবহতা: এক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ১০:২৩ এএম
পৃথিবীর শেষ দিন ও কেয়ামতের ভয়াবহতা: এক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

মহাপ্রলয়ের প্রতীক্ষায় পৃথিবী /Ai

পৃথিবীর এই সুশৃঙ্খল অগ্রযাত্রা একদিন থমকে যাবে এবং এই সুবিশাল মহাবিশ্ব এক মহাপ্রলয়ের মুখে পড়বে যা ইসলামি পরিভাষায় কেয়ামত হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীর শেষ দিনটি কেমন হবে বা ধ্বংসের পূর্বে ঠিক কী কী ঘটবে তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী কেয়ামত হঠাৎ করে সংঘটিত হবে না বরং এর পূর্বে কিছু সুনির্দিষ্ট ও বড় ধরনের আলামত প্রকাশিত হবে। এই আলামতগুলোর মধ্যে দাজ্জালের আবির্ভাব, হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের আগমন এবং ভূগর্ভ থেকে এক অদ্ভুত প্রাণী দাব্বাতুল আরদ-এর আত্মপ্রকাশ অন্যতম। মহান আল্লাহ তাআলা এই প্রাণীটির বিষয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন যে যখন প্রতিশ্রুত সময় সমাগত হবে তখন তিনি ভূগর্ভ থেকে এমন এক জীব নির্গত করবেন যা মানুষের সাথে কথা বলবে এবং অবিশ্বাসীদের চিহ্নিত করবে (সূরা আন-নামল, ২৭:৮২)। এটি হবে মহাপ্রলয়ের অন্যতম নিকটবর্তী সঙ্কেত।

দাব্বাতুল আরদ বা সেই অদ্ভুত প্রাণীর আবির্ভাবের পর মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক নিয়মে এক বিরাট পরিবর্তন দেখা দেবে। তখন সূর্য তার স্বাভাবিক উদয়স্থল পরিবর্তন করে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। এটি হবে তওবা বা ক্ষমার দরজা চূড়ান্তভাবে বন্ধ হওয়ার মুহূর্ত। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী তিন দিন পর্যন্ত সূর্য পশ্চিমাকাশে উদিত হবে এবং সেই সময়ে কোনো কাফেরের ইসলাম গ্রহণ বা কোনো পাপীর তওবা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না (সহীহ বুখারী, ৪৬৩৬)। এই পরিবর্তনের সাথে সাথে গোটা আকাশ এক রহস্যময় ও যন্ত্রণাদায়ক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে যা চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্ররাজিকে ঢেকে ফেলবে। পবিত্র কুরআনে এই ধোঁয়াকে এক যন্ত্রণাদায়ক আজাব হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে যা মানুষকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে (সূরা আদ-দুখান, ৪৪:১০-১১)। সেই মুহূর্তে পথভ্রষ্ট মানুষেরা তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইবে কিন্তু তওবার সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার কারণে তা আর কোনো কাজে আসবে না।

কেয়ামতের প্রাক্কালে পৃথিবীতে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী প্রাচ্য, পাশ্চাত্য এবং আরব উপদ্বীপে তিনটি বড় ধরনের ভূমিকম্প সংঘটিত হবে। এরপর ইয়েমেন থেকে এক শীতল বাতাস প্রবাহিত হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে যা প্রতিটি মুমিনের জান কবজ করবে। পৃথিবীতে তখন আর কোনো কুরআন তিলাওয়াতকারী বা আল্লাহর নাম নেওয়ার মতো লোক অবশিষ্ট থাকবে না। এমনকি ইসলামের পবিত্রতম স্থান কাবা শরীফও আবিসিনিয়ার এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে যার পায়ের নলা হবে ছোট ছোট (সহীহ বুখারী, ১৫৯১)। পৃথিবীতে তখন শুধু সবচেয়ে নিকৃষ্ট পাপাচারী ও কাফেররাই জীবিত থাকবে যারা পশুর মতো আচরণ করবে এবং নৈতিকতার কোনো বালাই তাদের মধ্যে থাকবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষ্যমতে যতক্ষণ পৃথিবীতে আল্লাহ আল্লাহ বলার মতো একজন লোকও থাকবে ততক্ষণ কেয়ামত হবে না (সহীহ মুসলিম, ১৪৮)।

যখন পৃথিবীতে পাপাচার পূর্ণতা পাবে তখন আল্লাহ তাআলা হযরত ইসরাফিল আলাইহিস সালামকে শিঙায় প্রথম ফুৎকারের অনুমতি দেবেন। এই একটি মাত্র ফুৎকারের শব্দে পৃথিবী ও পর্বতমালা তাদের স্থান থেকে বিচ্যুত হবে এবং তুলোর মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে (সূরা আল-হাক্কাহ, ৬৯:১৩-১৫)। পর্বতসমূহ ভেঙে চুরমার হওয়া এবং পৃথিবীর প্রবল কম্পন পৃথিবীকে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে (সূরা আল-ওয়াকিয়াহ, ৫৬:৪-৫)। প্রথম ফুৎকারের সাথে সাথেই আসমান ও জমিনের সমস্ত জীব মৃত্যুবরণ করবে। এরপর একটি দীর্ঘ বিরতি থাকবে যা প্রায় চল্লিশ বছর বা মাসের হতে পারে এবং এই সময়ে পৃথিবীতে প্রবল বৃষ্টিপাত হবে যার ফলে মৃত মানুষের শরীরগুলো পুনরায় অংকুরিত ও সুসংগঠিত হবে। যখন মানুষের দৈহিক আকৃতি পূর্ণতা পাবে তখন দ্বিতীয় ফুৎকার দেওয়া হবে এবং সকল মানুষ জীবিত হয়ে মহান আল্লাহর সামনে হাশরের ময়দানে সমবেত হবে। সেই দিন পৃথিবী ও আসমান সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে এক নতুন আকৃতি ধারণ করবে (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৪৮)।

প্রথম ফুৎকারের পর মহাবিশ্বের সমস্ত ফেরেশতাও মৃত্যুবরণ করবেন। হাদিসের কিছু বর্ণনায় এই মৃত্যুর দৃশ্যগুলো অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে বর্ণিত হয়েছে। যদিও এই বর্ণনাগুলোর সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসীনদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে তবে এগুলো আমাদের মৃত্যুর ভয়াবহতা বুঝতে সাহায্য করে। জিবরাঈল, মিকাঈল এবং ইসরাফিল আলাইহিস সালামের মতো শ্রেষ্ঠ ফেরেশতারাও মালেকুল মাউতের মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করবেন। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম যখন মৃত্যুর ফরমান শুনবেন তখন তিনি আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করবেন এবং মৃত্যুর যন্ত্রণা সহজ করার প্রার্থনা জানাবেন। মিকাঈল আলাইহিস সালাম যিনি সৃষ্টির রিজিক ও বৃষ্টির দায়িত্বে ছিলেন তিনিও আল্লাহর নির্দেশে মৃত্যুবরণ করবেন। এমনকি খোদ মালেকুল মাউত যিনি সকল জীবের জান কবজ করেছেন তাকেও এক সময় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তিনি জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক বিকট চিৎকারের মাধ্যমে প্রাণত্যাগ করবেন যা শুনলে যেকোনো জীবিত প্রাণী বেহুঁশ হয়ে যেত।

সবশেষে এই মহাবিশ্বে একমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই অবশিষ্ট থাকবেন। তিনি তখন সারা বিশ্বকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করবেন যে তিনিই একমাত্র বাদশাহ। অহংকারী ও দম্ভকারীরা আজ কোথায় সেই প্রশ্ন করবেন তিনি। কিন্তু সেই মুহূর্তে উত্তর দেওয়ার মতো কেউ থাকবে না। আল্লাহ নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তরে ঘোষণা করবেন যে আজকের রাজত্ব একমাত্র মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর (সূরা গাফির, ৪০:১৬)। এভাবেই এক সময়ের জাঁকজমকপূর্ণ এই পৃথিবীর ইতি ঘটবে। কেয়ামতের এই ভয়াবহ চিত্র আমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয় যে এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী এবং আমাদের পরকালীন পাথেয় সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা পাওয়ার চেষ্টা করা এবং ঈমানের ওপর অটল থাকাই হলো এই কঠিন সময় থেকে নাজাত পাওয়ার একমাত্র পথ।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!