সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করার যে মহাপ্রকল্প ইবলিশ গ্রহণ করেছিল, তার চূড়ান্ত ও ভয়াবহ পরিসমাপ্তি ঘটবে জাহান্নামের অতল গহ্বরে। অহংকার ও অবাধ্যতার কারণে যে সত্তা আল্লাহর অভিশাপ কুড়িয়েছিল, তার সেই দম্ভ ধুলোয় মিশে যাওয়ার দৃশ্য হবে অত্যন্ত লোমহর্ষক। কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য অনুযায়ী, জাহান্নামের স্তরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে ইবলিশের জন্য। দুনিয়ার হিসেবে ১০০০ কোটি বছর বা তারও বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ইবলিশের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন হবে, তা ভাবলে একজন মুমিনের শরীর শিউরে ওঠে। অহংকারের বশবর্তী হয়ে যে ইবলিশ হযরত আদম আলাইহিস সালামের সামনে নত হতে অস্বীকার করেছিল এবং নিজেকে আগুনের তৈরি বলে শ্রেষ্ঠ দাবি করেছিল (সূরা আল-আরাফ, ৭:১২), সেই আগুনই তার চিরস্থায়ী দহনের কারণ হবে। আল্লাহ তাআলা ইবলিশকে কেয়ামত পর্যন্ত হায়াত দিয়েছিলেন কেবল তার কুফর ও অবাধ্যতার চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণের জন্য (সূরা আল-হিজর, ১৫:১৪-১৫)। কিন্তু বিচারের দিন শেষ হওয়ার পর যখন অনন্তকালের যাত্রা শুরু হবে, তখন ইবলিশকে নিক্ষেপ করা হবে জাহান্নামের সবচেয়ে গভীর স্তরে যাকে মুফাসসিরগণ `হাবিয়া` হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
জাহান্নামের এই অতল গহ্বরে ইবলিশকে রাখা হবে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ অবস্থায়। দুনিয়াতে সে তার অনুসারী ও শয়তান বাহিনী নিয়ে যে দাপট দেখাত, জাহান্নামে তার বিপরীত এক করুণ চিত্র ফুটে উঠবে। বর্ণনায় এসেছে, তাকে আগুনের তৈরি এক বিশাল সিন্দুক বা কফিনের ভেতর বন্দি করে রাখা হবে। এই নিঃসঙ্গতা তার অহংকার চূর্ণ করার অন্যতম মাধ্যম। দুনিয়াতে সে নির্জনতায় মানুষকে কুমন্ত্রণা দিত, আর আজ সে নিজেই সেই নির্জনতার শিকলবন্দি। সিন্দুকের ভেতর কোনো বাতাস নেই, আছে শুধু বিষাক্ত ও ফুটন্ত ধোঁয়া। তার শারীরিক যন্ত্রণা বর্ণনা করতে গিয়ে কুরআন আমাদের সতর্ক করে যে, জাহান্নামীদের চামড়া যখনই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, তখনই পুনরায় নতুন চামড়া সৃষ্টি করা হবে যাতে তারা আজাবের স্বাদ নিরন্তর পেতে থাকে (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৬)। ইবলিশের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া চলবে অনন্তকাল ধরে। জাহান্নামের সবচেয়ে হালকা শাস্তি হিসেবে যেখানে আগুনের জুতো পরিয়ে মগজ ফুটানোর কথা বলা হয়েছে (সহীহ মুসলিম, ২১৩), সেখানে ইবলিশের দহন হবে সেই আগুনের মূল কেন্দ্রে বা কোরের ভেতরে। তার শাস্তি হবে পাপাচারের মূল উৎস হিসেবে সবচেয়ে ভয়াবহ।
ইবলিশের তৃষ্ণা ও ক্ষুধা মেটানোর জন্য তাকে এমন সব খাদ্য ও পানীয় দেওয়া হবে যা কল্পনা করাও মানুষের সাধ্যের বাইরে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় সে যখন চিৎকার করবে, তখন তাকে দেওয়া হবে জাক্কুম গাছের ফল যা দেখতে শয়তানের মাথার মতো এবং যা পেটে যাওয়ার সাথে সাথে গলিত তামা বা তেলের মতো ফুটতে থাকবে (সূরা আস-সাফফাত, ৩৭:৬২-৬৬)। তৃষ্ণার্ত হয়ে যখন সে পানির জন্য হাহাকার করবে, তখন তাকে দেওয়া হবে `হামিম` বা অত্যন্ত উত্তপ্ত পানি। সেই পানি মুখের কাছে নিতেই তার মুখের মাংস খসে পড়বে এবং পান করার সাথে সাথে তার নাড়িভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন হয়ে পায়খানার রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে আসবে (সূরা আল-কাহফ, ১৮:২৯)। এই অমানবিক যন্ত্রণার কোনো শেষ নেই। ১০০০ কোটি বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় পার হওয়ার পর যখন যন্ত্রণার চরম সীমায় পৌঁছে ইবলিশ আল্লাহর কাছে মিনতি করবে যে তাকে যেন একবারের জন্য বের করা হয়, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসবে এক চূড়ান্ত ও অপমানজনক ধমক। আল্লাহ বলবেন, ধিকৃত কুকুরের মতো তোরা সেখানেই পড়ে থাক এবং আমার সাথে আর কোনো কথা বলিস না (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১০৮)। এই প্রত্যাখ্যান ইবলিশের জন্য আগুনের শাস্তির চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হবে কারণ এর মাধ্যমে আল্লাহর রহমতের দরজা তার জন্য চিরতরে সিলগালা হয়ে যাবে।
জাহান্নামে ইবলিশের আরেকটি বড় শাস্তি হবে তার অনুসারীদের ঘৃণা ও আক্রোশ। দুনিয়ার সমস্ত পাপিষ্ঠ মানুষ, ফেরাউন, নমরুদ এবং আবু লাহাবের মতো খলনায়করা যখন ইবলিশকে দেখতে পাবে, তখন তারা তাদের নিজেদের আজাব ভুলে গিয়ে ইবলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তারা তাকে তাদের ধ্বংসের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে আক্রমণ করবে। সেই মুহূর্তে ইবলিশ একটি ভাষণ দেবে যা কুরআনে সূরা ইব্রাহিমের মাধ্যমে আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। সে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বলবে যে, আল্লাহ তোমাদের সত্য ওয়াদা দিয়েছিলেন আর আমি দিয়েছিলাম মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। আজ আমার তোমাদের ওপর কোনো কর্তৃত্ব নেই। আমি শুধু তোমাদের ডেকেছিলাম আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। তাই আজ আমাকে গালি দিও না, বরং নিজেদেরই দোষারোপ করো। আজ আমি নিজেও তোমাদের কোনো উপকারে আসব না এবং তোমরাও আমাকে বাঁচাতে পারবে না (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:২২)। এই ভাষণ শুনে জাহান্নামীদের সমস্ত আশার প্রদীপ চিরতরে নিভে যাবে।
জাহান্নামের এই অনন্ত যাত্রায় ইবলিশের মনে হয়তো একটি ক্ষীণ আশা কাজ করত যে কোনো একদিন তার মৃত্যু হবে। কিন্তু সেই আশারও পরিসমাপ্তি ঘটবে যখন জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে মৃত্যুকে একটি দুম্বার আকৃতিতে এনে জবাই করে দেওয়া হবে (সহীহ বুখারী, ৬৫৪৮)। ফেরেশতারা ঘোষণা করবেন যে আজ থেকে আর কোনো মৃত্যু নেই, জান্নাতিরা জান্নাতে অমর এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে অমর। এই ঘোষণার পর ইবলিশের হাহাকার হবে আকাশছোঁয়া। সে চাইবে যেন সে মাটি হয়ে যেত বা তার অস্তিত্ব মিটে যেত (সূরা আন-নাবা, ৭৮:৪০)। কিন্তু না, তার এই শাস্তি চলবে কোনো বিরতিহীন চক্রের মতো। সময়ের কোনো ক্যালেন্ডার বা ঘড়ির কাঁটা সেখানে কাজ করবে না। কেবল থাকবে আগুনের দহন, জাক্কুমের তিক্ততা এবং চিরস্থায়ী নিঃসঙ্গতা। ইবলিশের এই চরম পরিণতি আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা যে, অহংকার ও আল্লাহর অবাধ্যতা কেবল ধ্বংসই বয়ে আনে। তার ধোঁকা থেকে বাঁচতে আমাদের সর্বদা আল্লাহর পানাহ চাইতে হবে এবং সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর অটল থাকতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :