বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল, ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের উত্থান

উম্মাহ কণ্ঠ এপ্রিল ১, ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের উত্থান

মধ্যস্থতায় পাকিস্তান

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে পাকিস্তান এক অভাবনীয় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিস্মিত করেছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ট্রাম্প সম্প্রতি মুনিরকে তার অত্যন্ত পছন্দসই সমরনায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে আসিম মুনির ইরানকে অন্য অনেকের চেয়ে ভালো চেনেন।.

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনী নিহত হওয়ার পর থেকে এই যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ১ মার্চ সেই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান উভয় পক্ষের মধ্যে বার্তার আদান-প্রদান এবং উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ভৌগোলিক ও ধর্মীয় কারণে ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত এবং গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানে কোনো মার্কিন বিমান ঘাঁটি না থাকায় দেশটি বর্তমানে একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে এই সংকট মোকাবিলা করার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে এই কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল রাজনৈতিক নয় বরং এর পেছনে পাকিস্তানের গভীর অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তান তার জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ আমদানি করে থাকে হোর্মুজ প্রণালী দিয়ে যা যুদ্ধের কারণে বর্তমানে চরম বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে গত ৬ মার্চ পাকিস্তান সরকার দেশীয় বাজারে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম ২০ শতাংশ বা প্রতি লিটারে অন্তত ৫৫ রুপি বৃদ্ধি করেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়েছে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বিবিসিকে জানিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যার এই যুদ্ধে হারানো এবং পাওয়ার অনেক কিছু রয়েছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। করাচির ইনস্টিটিউট অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অধ্যাপক ফারহান সিদ্দিকী মনে করেন যে যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক চাপ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশেষ করে ইরান কর্তৃক হোর্মুজ প্রণালী আংশিক বন্ধ করে দেওয়া বা সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা পাকিস্তানের মতো আমদানিকারক দেশের জন্য বড় ঝুঁকি। এছাড়া ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে যার শর্ত অনুযায়ী কোনো এক দেশে হামলা হলে অন্য দেশ তাতে সহায়তা করতে বাধ্য থাকবে। সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান বড় ধরণের সংকটে পড়বে।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ জনমতও এই কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলছে। ইরানের শীর্ষ নেতা নিহতের পর করাচি ও ইসলামাবাদসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে যেখানে মার্কিন কনস্যুলেটে হামলার চেষ্টাও করা হয়। সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বিবিসিকে জানান যে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের আবেগ ব্যাপকভাবে ইরানের পক্ষে এবং নীতিনির্ধারকরা এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।

তবে এই উচ্চাভিলাষী কূটনীতির সফলতার ওপর পাকিস্তানের বৈশ্বিক অবস্থান নির্ভর করছে। যদি ইসলামাবাদ এই মধ্যস্থতায় সফল হয় তবে এটি দেশটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির শীর্ষে নিয়ে যাবে। অন্যদিকে ব্যর্থ হলে পাকিস্তান কেবল ‍‍`সরল বিশ্বাসে প্রচেষ্টা চালানো দেশ‍‍` হিসেবে গণ্য হবে বলে লোধি মন্তব্য করেছেন।

পাকিস্তান ২০২৫ সালে ভারত-পাকিস্তান সংকটের সময় ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলিয়েছিল। কুগেলম্যানের মতে ট্রাম্পের তোষামোদ করার এই কৌশল ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার মঙ্গলবার চীন সফরে যাচ্ছেন যা এই বহুমুখী কূটনীতির আরেকটি অংশ।

তবে কুগেলম্যান সতর্ক করে দিয়েছেন যে উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করা বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন। পাকিস্তান এখন এমন এক সুতার ওপর দিয়ে হাঁটছে যেখানে একদিকে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা এবং অন্যদিকে রয়েছে চরম অর্থনৈতিক সংকট।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!