মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং অবরুদ্ধ হোর্মুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে একটি পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছে বলে ১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিবিসির সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দ্বিতীয় মাসে পদার্পণ করার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পর বেইজিং এই কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় সরাসরি যুক্ত হলো।এর আগে পাকিস্তান এই যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানে বেইজিং সেই প্রচেষ্টায় পূর্ণ সমর্থন দিয়ে একটি জোরালো কূটনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি করার চেষ্টা করছে।
লানজু বিশ্ববিদ্যালয়ের আফগানিস্তান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ঝু ইয়ংবিয়াও বিবিসিকে জানিয়েছেন যে নৈতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে চীন পাকিস্তানকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে যাতে ইসলামাবাদ এই সংকটে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এই পদক্ষেপটি বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় ধরণের পরিবর্তন কারণ যুদ্ধের প্রথম দিকে চীনের অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে নীরব।
পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিং সফর করে এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য চীনা সহায়তা চাওয়ার পর এই যৌথ শান্তি পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। বেইজিং ও ইসলামাবাদ উভয়ই একমত হয়েছে যে সংলাপ এবং কূটনীতিই এই সংঘাত নিরসনের একমাত্র কার্যকর পথ।
চীনের এই আকস্মিক সক্রিয়তার পেছনে প্রধানত অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের নিজস্ব তেলের মজুদ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সংকট দেশটির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসির চীনা প্রোগ্রামের চেয়ারম্যান ম্যাট পটিঞ্জার বিবিসিকে জানান যে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে যদি বিশ্বের অর্থনীতি ধীর হয়ে যায় তবে তা চীনের কারখানা এবং রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরণের বিপর্যয় ডেকে আনবে।
বিশেষ করে প্লাস্টিক থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স এবং সেমিকন্ডাক্টর তৈরির প্রতিটি পর্যায়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রভাব ফেলছে।মধ্যপ্রাচ্যে চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ গত কয়েক বছরে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধের পর চীনা ব্যবসায়ীরা মধ্যপ্রাচ্যকে তাদের নতুন বাজার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। গত বছর বাকি বিশ্বের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে চীনের রপ্তানি দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে বেড়েছে।
এছাড়া সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরাকে চীনের বড় ধরণের অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে। ইরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্ব রয়েছে এবং চীন ইরানের তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্রয় করে থাকে। এই অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতাই বেইজিংকে তেহরানের ওপর প্রভাব খাটানোর সুযোগ করে দিচ্ছে।
তবে এই শান্তি পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কোনো শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি নেই এবং জিবুতির বাইরে তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য ঘাঁটি নেই। এর আগে ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে চীন সফল হলেও বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের প্রভাব কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তাছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে চীনের অবস্থান এবং তাইওয়ান ও হংকং নিয়ে তাদের কঠোর নীতি বেইজিংয়ের নিরপেক্ষতাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই এখন পর্যন্ত এই পাঁচ দফা পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবুও শি জিনপিংয়ের এই উদ্যোগ তাকে একজন নিরপেক্ষ বিশ্বনেতা হিসেবে প্রমাণের সুযোগ করে দিচ্ছে যা ওয়াশিংটনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :