রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯ ফাল্গুন ১৪৩২

হিজরতের সেই রাত ও বিপদে আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসার শিক্ষা

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম
হিজরতের সেই রাত ও বিপদে আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসার শিক্ষা

অসহায়ত্বে আল্লাহর অজেয় নিরাপত্তা / Ai

মানুষের জীবন এক অদ্ভুত অমীমাংসিত সমীকরণ যেখানে কখনো সাফল্য আনন্দ নিয়ে আসে আবার কখনো ব্যর্থতা ও প্রতিকূলতা তাকে চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমাদের এই যাপিত জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন চারপাশের চেনা পৃথিবীটা হঠাৎ করেই অচেনা হয়ে যায় এবং আপন মানুষেরা দূরে সরে গিয়ে আমাদের নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে ফেলে রেখে যায়। এই যে মানবিক অক্ষমতা এবং পরিস্থিতির কাছে নতি স্বীকারের প্রবণতা এটি প্রতিটি মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ইসলামের সুমহান ইতিহাস ও ঈমানি চেতনা আমাদের শেখায় যে চরম অন্ধকার মুহূর্তেও এক অদৃশ্য অজেয় শক্তির অস্তিত্ব আমাদের সাথে ছায়ার মতো মিশে থাকে।

 হিজরতের সেই মহিমান্বিত রাতের কথা চিন্তা করলে আমরা দেখতে পাই যে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কার কাফেরদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কেবল আল্লাহর নির্দেশে অজানার পথে পা বাড়িয়েছিলেন তখন তাঁর জাগতিক কোনো শক্তি ছিল না। সেই রাতে সওর গুহার ভেতরে যখন শত্রু বাহিনী তাঁদের একদম সন্নিকটে পৌঁছে গিয়েছিল এবং গুহার মুখে তাঁদের পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল তখন মানবীয় বিচারে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে অমোঘ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন তা কিয়ামত পর্যন্ত আসা প্রতিটি বিচলিত হৃদয়ের জন্য এক পরম ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেছিলেন যে তুমি চিন্তা করো না বা ভয় পেয়ো না নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন (সূরা আত-তাওবা, ৯:৪০)।

বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা বা তাওয়াক্কুল কেবল মুখে উচ্চারিত কোনো শব্দ নয় বরং এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা ও ঈমানি ভিত্তি। যখন কোনো ব্যক্তি অনুভব করে যে মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার আবর্তন এবং তার শরীরের প্রতিটি ধমনীর রক্ত প্রবাহ যাঁর ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তিনি যখন তার সাথে আছেন তখন দুনিয়ার কোনো প্রতিকূলতাই তাকে পরাজিত করতে পারে না। বর্তমান যুগে মানুষ যখন ডিপ্রেশন বা মানসিক বিষণ্ণতায় ভোগে তখন তার মূলে থাকে এই ভরসার অভাব। আমরা আমাদের মেধা ও পরিশ্রমকে ফলাফল লাভের একমাত্র উপায় মনে করি এবং যখন তা ব্যর্থ হয় তখন আমরা ভেঙে পড়ি। অথচ একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো যিনি তায়েফের ময়দানে পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েও আল্লাহর ওপর থেকে ভরসা হারাননি। সেই অসহায়ত্বই ছিল তাঁর শক্তির উৎস কারণ তিনি জানতেন যে আল্লাহর সাহায্য ও সান্নিধ্যই হলো মুমিনের একমাত্র প্রকৃত নিরাপত্তা। এই উপলব্ধি যখন অন্তরে গেঁথে যায় তখন মানুষের চারপাশের ভয় ও আতঙ্ক দূর হয়ে যায় এবং এক অদ্ভুত প্রশান্তি হৃদয়ে বাসা বাঁধে যা কোনো জাগতিক সম্পদ দিয়ে কেনা সম্ভব নয়।

আধ্যাত্মিক এই আরোগ্য লাভের জন্য জিকির বা মহান রবের নিরবচ্ছিন্ন স্মরণ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। যখন মানুষের আত্মা পাপের কলুষতায় বা দুনিয়াবি চিন্তায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা’ বা ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো আশ্রয় নেই’ এই মন্ত্রটি হৃদয়ে সঞ্জীবনী সুধা হিসেবে কাজ করে। আমরা যখন আমাদের জীবনের সমস্ত ভার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেই এবং মনে মনে বলি যে সব কিছু তাঁরই ইচ্ছায় পরিচালিত হচ্ছে তখন আমাদের নফসের অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। এই জিকির কেবল মুখ দিয়ে উচ্চারিত শব্দ নয় বরং এটি একটি গভীর হৃদস্পন্দন যা প্রমাণ করে যে আমরা আমাদের মালিকের প্রতি কতটা বিশ্বস্ত। প্রতিটি নিশ্বাস যখন আল্লাহর জিকিরের সাথে বের হয় তখন মানুষের জীবন সার্থক হয়ে ওঠে এবং তা পরকালের কঠিন সফরের জন্য শ্রেষ্ঠ পাথেয় হিসেবে জমা হয়। হিজরতের রাতের সেই স্থিরতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আল্লাহ যখন কাউকে রক্ষা করার ফয়সালা করেন তখন পৃথিবীর কোনো শক্তিই তার সামান্য ক্ষতি করতে সমর্থ হয় না।

সিজদাই হলো সেই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম যার দ্বারা বান্দা তার রবের সিদ্ধান্তের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটায়। সিজদাবনত অবস্থায় মানুষ যখন তার কপালকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় তখন সে মূলত তার আমিত্বকে বিসর্জন দেয় এবং মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। আমাদের জীবনের প্রতিটি সিজদা যেন আমাদের এবং রবের মাঝখানের পর্দা সরিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম হয়। যখন আমরা আমাদের জীবনের কোনো জটিল পরিস্থিতির সমাধান খুঁজে পাই না এবং কোনো কূলকিনারা করতে পারি না তখনও এই সিজদাই আমাদের আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত তাই এই সময়টুকু তাঁর স্মরণে অতিবাহিত করা এবং তাঁরই ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা বুদ্ধিমানের কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন যে আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি এতটাই দয়ালু যে তিনি তার প্রতি এক হাত অগ্রসর হন যখন বান্দা তাঁর দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে (সহীহ আল-বুখারী, ৭৫৩৬)। এই যে রবের দ্রুত ধাবিত হওয়া এটিই মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় আশা এবং ভরসার কেন্দ্রবিন্দু।

পরিশেষে আমাদের এই সংক্ষিপ্ত জীবনের প্রতিটি বাঁক এবং প্রতিটি পরীক্ষা যেন আমাদের আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে। আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্তটি যেন ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর জিকিরের মধ্য দিয়ে কাটে সেই আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে থাকা উচিত। দুনিয়াতে আমরা যা কিছু অর্জন করি না কেন আখেরাতে আমাদের সাথে কেবল আমাদের ইমান এবং সবরটুকুই যাবে। কবরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে শুরু করে হাশরের ময়দান পর্যন্ত আল্লাহর রহমত ছাড়া আমাদের আর কোনো ত্রাণকর্তা নেই। তাই আসুন আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি ব্যর্থতাকে তাঁর পরীক্ষা হিসেবে মেনে নেই এবং প্রতিটি সাফল্যকে তাঁর দান হিসেবে শুকরিয়া আদায় করি। আমাদের প্রতিটি নীরব কান্না যেন আল্লাহর আরশের দিকে ছুটে যায় এবং আমাদের অন্তরকে তাঁর অনন্ত দয়া ও করুণা দিয়ে পূর্ণ করে দেয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিজরতের রাতের সেই অবিচল ইমান দান করুন এবং আমাদের ওপর তাঁর অজেয় নিরাপত্তা চাদর বিছিয়ে দিন। আমীন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!