মানুষের জীবন এক বিরামহীন সংগ্রামের নাম যেখানে প্রতি পদক্ষেপে শয়তানের প্রলোভন ও নফসের তাড়না মুমিনকে হক পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে বর্তমান যুগের চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে একজন ঈমানদার যুবকের জন্য নিজের চরিত্র ও আমল হেফজ করা এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেঁচে থাকা মানেই হলো প্রতিটি ওয়াক্তের সালাত আদায়ের অঙ্গীকার পালন করা কারণ সালাতই হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সেতুবন্ধন। জোহর থেকে এশা প্রতিটি নামাজের ওয়াক্তে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো কেবল একটি প্রথা নয় বরং এটি হলো আত্মিক সজীবতা রক্ষার হাতিয়ার। শয়তান অনেক সময় মানুষকে বড় কোনো গুনাহের অপরাধবোধে ডুবিয়ে রাখতে চায় যাতে সে নিরাশ হয়ে ইবাদত ছেড়ে দেয়। হতে পারে কেউ চোখের জিনা বা হারাম কোনো দৃশ্যে আসক্ত হয়ে পড়েছে কিংবা সাময়িকভাবে পবিত্রতা হারিয়েছে কিন্তু এই বিচ্যুতি কখনো আল্লাহর রহমত থেকে চিরতরে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে না। আজানের ধ্বনি কানে আসার সাথে সাথেই মুমিনের কাজ হলো পবিত্র হয়ে তওবার মাধ্যমে রবের সামনে হাজিরা দেওয়া। গুনাহগার যুবকের তওবা আল্লাহর কাছে এতটাই প্রিয় যে তিনি একে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহের মাধ্যম বানিয়ে দেন। মুমিনের প্রকৃত সফলতা নিহিত রয়েছে গুনাহ করার পর দ্রুত ফিরে আসার মানসিকতার মধ্যে।
কিয়ামতের দিবসের ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে পবিত্র কুরআনের সেই অমূল্য বাণীর কথা স্মরণে আসে যেখানে বলা হয়েছে যে সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজেই আসবে না। কেবল সেই ব্যক্তিই মুক্তি পাবে যে আল্লাহর কাছে একটি সুস্থ ও পবিত্র অন্তর বা কালবুন সেলিম নিয়ে উপস্থিত হবে (সূরা আশ-শুআরা, ২৬:৮৮-৮৯)। এই সুস্থ অন্তরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তা শিরক কুফর ও নিফাক থেকে মুক্ত থাকবে। দুনিয়ার বুকে আমরা হয়তো আমাদের ক্ষমতা বা বৈষয়িক সাফল্যের অহংকার করি কিন্তু মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে এই বৈষয়িক মালিকানার কোনো কানাকড়ি মূল্য থাকবে না। বর্তমান যুবসমাজের একটি অংশ নিজেদের খুব চতুর মনে করে এবং মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে হারাম কাজে লিপ্ত থাকাকে কৃতিত্বের বিষয় বলে গণ্য করে। অথচ ইতিহাসের সবচেয়ে চতুর ও ক্ষমতাধর শাসক ফেরাউন যখন নিজেকে ঈশ্বর দাবি করেছিল তখন আল্লাহ তাকে এমনভাবে পাকড়াও করেছিলেন যা ইতিহাসের পাতায় এক নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হয়ে আছে (সূরা আন-নাসিয়াত, ৭৯:২৪)। মানুষের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এবং অন্তরের গোপন খবর আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে তাই স্রষ্টাকে ধোঁকা দেওয়ার চিন্তা করা কেবল বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতদের জান্নাতে প্রবেশের বিষয়ে এক অদ্ভুত ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন যে তাঁর সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া যে জান্নাতে যেতে অস্বীকার করেছে। সাহাবায়ে কিরাম অবাক হয়ে যখন সেই হতভাগা ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলেন তখন নবীজি স্পষ্টভাবে জানালেন যে ব্যক্তি তাঁর আনুগত্য করল সে জান্নাতে গেল আর যে ব্যক্তি তাঁর অবাধ্য হলো সেই মূলত জান্নাতে যেতে অস্বীকার করল (সহীহ আল-বুখারী, ৭২৮০)। এটি বর্তমান সমাজের এক করুণ প্রতিচ্ছবি কারণ আমরা আজ মুখে নবীপ্রেমের দাবি করলেও আমাদের কর্মে সুন্নতের প্রতিফলন নেই। নবীর নির্দেশিত পথ দাড়ি রাখা টাখনুর ওপরে কাপড় পরা বা চরিত্র হেফজ করার মতো বিষয়গুলোকে আজ আমরা আধুনিকতার দোহাই দিয়ে তুচ্ছজ্ঞান করছি। রাসূলের অবাধ্য হওয়া মানেই হলো নিজের হাতে জান্নাতের দরজা বন্ধ করে দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে যারা তাঁর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত আর যারা মুখ ফিরিয়ে নেবে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি (সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:১৭)।
আমাদের সমাজ কাঠামোর অবক্ষয়ের পেছনে অভিভাবকদের উদাসীনতা ও দ্বিমুখী আচরণও বহুলাংশে দায়ী। অনেক বাবা-মা সন্তানদের জাগতিক ক্যারিয়ার নিয়ে যতটা চিন্তিত তাদের দ্বীন নিয়ে ততটা ভাবেন না। সন্তান ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পাশাপাশি জান্নাতি মানুষ হচ্ছে কি না তা নিয়ে ফিকির করা আজ সময়ের দাবি। অনেক অভিভাবক নিজেরা ইবাদত করলেও পরিবারের সদস্যদের শরয়ী পর্দা বা দ্বীনি অনুশাসনে উদ্বুদ্ধ করেন না। অথচ কিয়ামতের দিন প্রতিটি দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে (সহীহ আল-বুখারী, ৭১৩৮)। আজকের যুবকরা সামান্য আবেগের বশবর্তী হয়ে যে অবৈধ সম্পর্কে জড়াচ্ছে তা কেবল তাদের ঈমানই নষ্ট করছে না বরং তাদের জাগতিক জীবনকেও বিষিয়ে তুলছে। যে পুরুষ আল্লাহকে ভয় করে না সে কখনোই কোনো নারীকে প্রকৃত সম্মান দিতে পারে না। সতীত্ব ও সম্ভ্রম আল্লাহর দেওয়া এক মহান আমানত যা সামান্য বিনোদনের সামগ্রী হতে পারে না। আল্লাহ কেবল জিনা বা ব্যভিচার করতে নিষেধ করেননি বরং এর কাছে যেতেও বারণ করেছেন (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩২)। অশালীন ফোনালাপ বা নির্জনে দেখা করা মূলত জিনারই একেকটি ধাপ।
একজন যুবক যখন তার শ্রেষ্ঠ সময় অর্থাৎ যৌবনকালকে আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করে তখন কিয়ামতের ভয়াবহ দিবসে সে আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে (সহীহ আল-বুখারী, ৬৬০)। মাদক জুয়া সুদ ও অশ্লীলতার পেছনে যৌবন অপচয় করা মানে নিজের আখেরাত ধ্বংস করা। সুদকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলা হয়েছে (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৯) তবুও আমরা একে ব্যবসার অংশ মনে করছি। আমাদের মনে রাখা উচিত যে হারাম উপার্জনে গঠিত শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় অত্যন্ত নিকটবর্তী অথচ মানুষ এখনো উদাসীনতায় ডুবে আছে (সূরা আল-অাম্বিয়া, ২১:১)। তওবা করার জন্য বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করা চরম বোকামি কারণ মৃত্যু কোনো বয়সের ধার ধারে না। গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসা উচিত কারণ আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন যদি বান্দা অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে (সূরা আয-জুমার, ৩৯:৫৩)। নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আত্মশুদ্ধি অর্জন করাই হলো জান্নাতের পথ। যে নিজের নফসকে পবিত্র করবে সেই সফলকাম হবে (সূরা আশ-শামস, ৯১:৯)। আমাদের উচিত সালাতকে আঁকড়ে ধরা এবং রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়া যাতে আমরা সেই হতভাগাদের দলে না পড়ি যারা জান্নাতে যেতে অস্বীকার করেছে।

আপনার মতামত লিখুন :