সৌদি আরবের আকাশে হিজরি ১৪৪৭ সনের পবিত্র রমজান মাসের নতুন চাঁদ দেখা যাওয়ার সংবাদটি বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য এক পরম আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশটির জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা প্রদান করেছে। এর ফলে দেশটিতে মঙ্গলবার শাবান মাসের ২৯ দিন পূর্ণ হলো এবং বুধবার থেকে পবিত্র রমজান মাস গণনা শুরু হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মতো সৌদি আরবেও এই চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটল। বিশেষ করে মক্কার মাসজিদুল হারাম ও মদিনার মাসজিদে নববীতে এশার নামাজের পরপরই পবিত্র তারাবিহর সালাত আদায়ের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা আসার পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক উৎসবমুখর এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ বিরাজ করছে।
মুমিন মুসলমানরা তাদের মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দীর্ঘ এক মাসের এই বিশেষ ইবাদতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। রমজান মাস কেবল উপবাসের মাস নয় বরং এটি আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই মাসের গুরুত্ব বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন যা আমাদের সকলের জন্য পাথেয়।
﴿شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "শাহরু রামাদানাল্লাজি উনজিলা ফিহিল কুরআন হুদান লিন্নাছি ওয়া বাইয়িনাতিম মিনাল হুদা ওয়াল ফুরক্বান।" অর্থ: "রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের হিদায়েতের জন্য এবং হিদায়েতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের মানদণ্ড হিসেবে।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের চাঁদ দেখার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন এবং সাহাবীদেরকে উৎসাহিত করতেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভঙ্গ বা ঈদ করো। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে শাবান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করো।
সৌদি আরবের ভৌগোলিক অবস্থান এবং তাদের উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছরই তারা যথাযথভাবে চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত করে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বুধবার ভোরে সেহরি খাওয়ার মাধ্যমে দেশটির নাগরিক ও সেখানে অবস্থানরত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিমরা প্রথম রোজা পালন করবেন। বিশেষ করে মক্কা ও মদিনার দুই পবিত্র মসজিদে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো মুসল্লি ইবাদতে মগ্ন হবেন। মাসজিদুল হারামে ইতোমধ্যেই ভিড় বেড়েছে এবং ওমরাহ পালনকারীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও সেবার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সৌদি আরবের এই চাঁদ দেখার খবরের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশেও রোজা শুরু হয়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে বাংলাদেশে রমজান শুরুর বিষয়টি স্থানীয় আকাশে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি বুধবার সন্ধ্যায় বৈঠকে বসবে এবং যদি দেশের কোথাও চাঁদ দেখা যায় তবে বৃহস্পতিবার থেকে বাংলাদেশে রোজা শুরু হবে। সাধারণত সৌদি আরবের এক দিন পরেই বাংলাদেশে রোজা বা ঈদ পালিত হয়ে থাকে। এটি মূলত চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতার কারণে হয়ে থাকে যা ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য।
রমজান মাস আসার সাথে সাথেই মুমিনের হৃদয়ে এক বিশেষ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। এটি এমন এক মাস যে মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। একইসাথে শয়তানকে শিকলবন্দি করা হয় যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে আল্লাহর ইবাদত করতে পারে। সিয়াম পালনকারী ব্যক্তির জন্য মহান আল্লাহ বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। হাদিসে কুদসিতে এসেছে যে আল্লাহ বলেন রোজা কেবল আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান।
বিশেষ করে শেষ দশকের লাইলাতুল কদর যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম তা এই মাসের মধ্যেই লুকায়িত। সৌদি আরবে রমজান শুরুর এই ঘোষণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা কত দ্রুত সময়ের আবর্তে আবার একটি বরকতময় মাসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছি। রমজান আমাদের ধৈর্য ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। গরিব ও দুস্থদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং নিজেদের চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য এই মাসটি একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
সৌদি আরবের হারামাইন শরিফাইনে তারাবিহ এবং তাহাজ্জুদের সালাতে কুরআন খতমের যে ঐতিহ্য রয়েছে তা দেখার জন্য সারা বিশ্বের মুসলমানরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। সৌদি আরবের জাতীয় কর্তৃপক্ষের এই ঘোষণার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিমরা একে অপরকে রমজান মোবারক জানিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। এই পবিত্র মাসটি যেন সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য শান্তি সমৃদ্ধি ও ঐক্যের বার্তা নিয়ে আসে এটাই সকলের প্রার্থনা।
যারা অসুস্থ বা ভ্রমণে আছেন তাদের জন্য ইসলামি শরিয়তে শিথিলতা থাকলেও সুস্থ ও সক্ষম প্রত্যেক মুসলিমের ওপর রমজানের রোজা রাখা ফরজ। সৌদি আরবের এই ঘোষণাটি মূলত একটি ইবাদতের মৌসুম শুরুর ঘণ্টা ধ্বনি যা আমাদের অন্তরকে আল্লাহর ভীতি ও ভালোবাসায় সিক্ত করে তোলে। আমরা আশা করি এই রমজানে প্রতিটি মুসলমান তাদের পাপ মোচনের মাধ্যমে নতুন করে আধ্যাত্মিক জীবন শুরু করতে সক্ষম হবে।

আপনার মতামত লিখুন :