বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২

শাহরগের চেয়েও কাছে: আল্লাহর নৈকট্য ও আত্মিক প্রশান্তির রহস্য

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১১:৪২ এএম
শাহরগের চেয়েও কাছে: আল্লাহর নৈকট্য ও আত্মিক প্রশান্তির রহস্য

শাহরগের চেয়েও কাছে পরম আশ্রয় / Ai

মানুষের অস্তিত্বের প্রতিটি স্পন্দন এবং প্রতিটি নিশ্বাসের পেছনে যে এক অদৃশ্য শক্তির ইশারা কাজ করছে তা নিয়ে গভীর চিন্তার অবকাশ রয়েছে। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় যখন মানুষ নিজেকে অত্যন্ত নিঃসঙ্গ ও অসহায় মনে করে, তখন তার হৃদয়ে এক বিশেষ আশ্রয়ের তৃষ্ণা জাগে। জাগতিক এই ব্যস্ততায় বন্ধু-বান্ধব বা পরিবার-পরিজন অনেক সময় পাশে থাকলেও অন্তরের গভীরের হাহাকার মোচনে তারা সমর্থ হয় না। ঠিক এমন এক মুহূর্তে ইসলামের এক পরম সত্য মানুষের সামনে আশার আলো হয়ে দাঁড়ায় যা হলো মহান আল্লাহর নৈকট্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে তিনি মানুষের শাহরগের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী (সূরা ক্বাফ, ৫০:১৬)। এই ঘোষণা কেবল একটি বাক্য নয় বরং এটি মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ও আশ্রয়ের নাম। যখন কোনো বান্দা এই সত্যটি অন্তরের অন্তস্থল থেকে উপলব্ধি করতে পারে তখন তার জীবন থেকে হতাশা ও নিঃসঙ্গতার কালো মেঘ অপসারিত হতে শুরু করে। আমাদের প্রতিটি নিশ্বাস এবং শরীরের প্রতিটি কোষের ওপর যাঁর আধিপত্য তিনি কেন আমাদের থেকে দূরে থাকবেন তা ভাবলে মানুষের বিবেক নাড়া দেয়। মূলত মানুষের সাথে আল্লাহর এই অলৌকিক সম্পর্কের মাঝে কোনো ভৌগোলিক দূরত্ব নেই বরং এখানে দূরত্ব তৈরি হয় কেবল মানুষের গাফিলতি ও উদাসীনতার কারণে।

আধ্যাত্মিক জীবনের চরম শিখরে পৌঁছানোর জন্য আল্লাহর এই নৈকট্য অনুভব করা অত্যন্ত জরুরি। যখন দাউ দাউ করে জ্বলা দুনিয়ার মোহ মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তখন মানুষের অন্তর এক প্রকার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। এই অন্ধকার থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো জিকির বা মহান রবের নিরবচ্ছিন্ন স্মরণ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে যে আল্লাহ এত কাছে থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা তাঁর নূর থেকে বঞ্চিত থাকি। এর প্রধান কারণ হলো অন্তরের কলুষতা ও পাপের পাহাড় যা আমাদের এবং রবের মাঝে এক বিশাল পর্দার সৃষ্টি করে। এই পর্দাগুলো সরানোর জন্য প্রয়োজন সিজদাবনত হওয়া এবং কায়মনোবাক্যে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা। সিজদাই হলো সেই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম যার দ্বারা বান্দা তার রবের সবচেয়ে কাছে পৌঁছাতে পারে। সিজদারত অবস্থায় মানুষ যখন তার অহংকার ও আমিত্বকে ধুলোয় লুটিয়ে দেয় তখন তার আরশের অধিপতির সাথে এক নিবিড় সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এই সিজদা কেবল কপালে মাটি লাগানো নয় বরং এটি হলো নিজের সত্তাকে আল্লাহর মহানুভবতার সাগরে বিলীন করে দেওয়া যা পরকালের কঠিন আজাব থেকে মুক্তির পথ সুগম করে।

নৈকট্য লাভের এই যাত্রায় প্রতিটি নিঃশ্বাসে আল্লাহর জিকির করা মুমিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে যখন রবের পবিত্র নামের সুর ধ্বনিত হয় তখন মানুষের জীবন সার্থক হয়ে ওঠে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে তাঁর দিকে এগিয়ে আসার যে উৎসাহ দিয়েছেন তা আমাদের ঈমানকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সহীহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে যে আল্লাহ তায়ালা বলেন তাঁর বান্দা যদি তাঁর প্রতি এক বিঘত অগ্রসর হয় তবে তিনি তার প্রতি এক হাত অগ্রসর হন এবং বান্দা যদি হেঁটে আসে তবে তিনি তার দিকে দ্রুত ধাবিত হন (সহীহ আল-বুখারী, ৭৫৩৬)। এই হাদিসটি আল্লাহর রহমতের অসীমতার এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। মানুষের পাপ ও দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর দয়ার চাদর দিয়ে আমাদের আগলে রাখেন। শয়তান যখন মানুষকে হতাশার চোরাবালিতে ডুবিয়ে দিতে চায় তখন এই নৈকট্যের জ্ঞানই তাকে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা দেয়। জিকির হলো সেই ঔষধ যা হৃদয়ের সকল রোগ নিরাময় করে এবং মানুষের মনে প্রশান্তি ফিরিয়ে আনে।

বর্তমান যুগের আধুনিক জটিলতায় মানুষ যখন যান্ত্রিক জীবনের শিকলে বন্দি তখন এই আধ্যাত্মিক নৈকট্যই তাকে প্রকৃত মুক্তির স্বাদ দিতে পারে। আমাদের জবান যখন গীবত বা মিথ্যা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর পবিত্র নামে সজীব থাকে তখন আমাদের চারপাশে এক নূরানি পরিবেশ তৈরি হয়। আল্লাহর রহমত তখন আমাদের রাগ ও ক্রোধের ওপর বিজয় লাভ করে আমাদের শান্ত ও বিনয়ী করে তোলে। এই নৈকট্যের উপলব্ধি কেবল ব্যক্তিগত জীবনেই নয় বরং সামাজিক জীবনেও নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়। যে ব্যক্তি জানে যে তার রব তার শাহরগের চেয়েও কাছে সে কখনোই অন্য কারোর ওপর জুলুম করতে পারে না বা কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে পারে না। এই সজাগ অনুভূতিই হলো ইসলামের মূল শিক্ষা বা তাকওয়া। আমাদের উচিত এই মহিমান্বিত বোধকে জীবনের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করা যাতে প্রতিটি মুহূর্তে আমরা অনুভব করতে পারি যে আমরা একা নই বরং আমাদের পরম মালিক আমাদের সাথেই আছেন।

পরিশেষে আমাদের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের শেষ গন্তব্য হলো আল্লাহর সান্নিধ্য। আমাদের প্রতিটি সিজদা এবং প্রতিটি ফোঁটা চোখের জল যেন হাশরের ময়দানে আমাদের জন্য সুপারিশকারী হয়। দুনিয়ার এই চাকচিক্য একদিন ম্লান হয়ে যাবে এবং আমরা একা কবরের বাসিন্দা হব কিন্তু সেদিনও যদি আল্লাহর নৈকট্যের নূর আমাদের সাথী হয় তবেই আমাদের জীবন সফল। আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্তটি যেন ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর জিকিরের মধ্য দিয়ে কাটে সেই দোয়াই কাম্য। আল্লাহ আমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করে তাঁর রহমতের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দান করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম নসিব করুন যেখানে আমরা চিরকাল তাঁর নৈকট্যে বিচরণ করতে পারব। আমিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!