মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২

কাতার রমজান ২০২৬: পর্যটকদের জন্য বিশেষ আয়োজন

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬, ১১:১৬ পিএম
কাতার রমজান ২০২৬: পর্যটকদের জন্য বিশেষ আয়োজন

দোহায় রমজানের সাজ | ছবি - উম্মাহ কণ্ঠ

ভিজিট কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের রমজান দুই হাজার ছাব্বিশ ক্যাম্পেইন চালু করেছে। এই অভিনব উদ্যোগটির মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে রমজানে কাতার আপনার আপন ঘর। এই ঘোষণার মাধ্যমে মূলত স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কাতার নিউজ এজেন্সির প্রকাশ করা প্রতিবেদন অনুযায়ী এই প্রচারণার মূল লক্ষ্য হলো কাতারকে এমন একটি গন্তব্য হিসেবে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা যেখানে পবিত্র মাসের আবেদন কেবল ব্যক্তিগত বাসস্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং পুরো শহরের উন্মুক্ত স্থানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের সফল প্রচারণার ধারাবাহিকতায় এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রমজান মাস সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি সময়। এই পবিত্র মাসের মূল শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি সংযম পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আতিথেয়তা। কাতার সরকার এই শাশ্বত মূল্যবোধগুলোকে তাদের আধুনিক পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইছে। ক্যাম্পেইনের আওতায় কাতারের ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তা এবং সামাজিক ঐক্যের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীরা যেন নিজেদের পরিবারের মতোই একটি উষ্ণ এবং আন্তরিক পরিবেশ পান সেটি নিশ্চিত করতে প্রশাসন এবং পর্যটন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এটি কেবল একটি সাধারণ পর্যটন প্রচারণা নয় বরং একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি যেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষ একত্রিত হয়ে রমজানের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

এই প্রচারণার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো শহরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক এবং দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা। কাতারের রাজধানী দোহার প্রধান সড়ক ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং উন্মুক্ত স্থানগুলোকে রমজানের বিশেষ থিম অনুযায়ী সাজানো হচ্ছে। সূর্যাস্তের পর এই দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা একটি উৎসবমুখর এবং উষ্ণ পরিবেশ তৈরি করবে যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করবে। পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা যেন ইফতারের পর তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাইরে বের হতে পারেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন সেই লক্ষ্যে এই বিশেষ আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আলোকিত পথঘাট এবং সুসজ্জিত উন্মুক্ত স্থানগুলো রাতের দোহাকে একটি জীবন্ত আনন্দময় এবং নিরাপদ শহরে পরিণত করবে।

সাংস্কৃতিক এবং শৈল্পিক দিকটিকেও এবারের ক্যাম্পেইনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। কাতার পর্যটন কর্তৃপক্ষ এবারের আয়োজনে একটি বিশেষ সঙ্গীত এবং সাংস্কৃতিক গল্পের সংযোজন করেছে যা এই প্রচারণাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কাতারের অত্যন্ত জনপ্রিয় শিল্পী ফাহাদ আল-হাজ্জাজি এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী শিল্পী মাহের জেইন এই প্রকল্পে যৌথভাবে কাজ করছেন। তাদের এই যুগল পরিবেশনায় শান্তি আত্মশুদ্ধি এবং বিশ্বজনীন ঐক্যের বার্তা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হবে। মাহের জেইনের অংশগ্রহণ এই উদ্যোগকে একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা প্রদান করেছে কারণ তার সঙ্গীত বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের কাছে গভীরভাবে সমাদৃত। এই শৈল্পিক পরিবেশনাগুলো রমজানের আধ্যাত্মিক পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি করবে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে রমজান হলো রহমত মাগফিরাত এবং নাজাতের এক অপূর্ব সুযোগ। পবিত্র কোরআনে এই মাসের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে রমজান মাসেই মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)। কাতার তাদের এই পর্যটন আয়োজনের মাধ্যমে কোরআনের এই সার্বজনীন বার্তাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে চাইছে। পাশাপাশি রমজানে দানশীলতা এবং আতিথেয়তার যে অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে সেটিও এই ক্যাম্পেইনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামী ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে নবী করিম সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন এবং রমজান মাসে তার দানশীলতা আরও অনেক গুণ বৃদ্ধি পেত (সহীহ আল-বুখারী, ৬৩৮৯)। কাতারের এই উদ্যোগ মহানবীর সেই মহান আদর্শকে প্রতিফলিত করে যেখানে তারা বিশ্ববাসীকে পরম মমতায় তাদের আতিথেয়তা গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।

দোহার বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী বাজার সুক ওয়াকিফ এবং আধুনিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কাটারা কালচারাল ভিলেজে এই সময়ে পর্যটকদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এর পাশাপাশি মুশিরেব ডাউনটাউন দোহা এবং দ্য পার্ল আইল্যান্ডেও বিশেষ রমজান বাজারের বিশাল প্রস্তুতি চলছে। এই স্থানগুলোতে ঐতিহ্যবাহী খাবারের পসরা থেকে শুরু করে হস্তশিল্পের মনমুগ্ধকর প্রদর্শনী পর্যন্ত নানা আয়োজন থাকবে। থ্রোব্যাক ফুড ফেস্টিভ্যাল এবং বারাহা রমজান নাইটস এর মতো মেগা ইভেন্টগুলো পর্যটকদের জন্য কাতারের সমৃদ্ধ রন্ধনশৈলী এবং সংস্কৃতির স্বাদ নেওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি করবে। দর্শনার্থীরা অত্যাধুনিক দোহা মেট্রো ব্যবহার করে খুব সহজেই এবং দ্রুততার সঙ্গে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করতে পারবেন যা তাদের এই ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে আরও মসৃণ এবং আরামদায়ক করবে।

ইফতারের পর কাতারের জনজীবন সম্পূর্ণ একটি নতুন রূপ ধারণ করে। স্থানীয় পরিবার এবং দেশি বিদেশি বন্ধুরা মিলে শহরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ এবং উন্মুক্ত স্থানগুলোতে জমায়েত হন। সাহরি পর্যন্ত এই উৎসবমুখর এবং আনন্দময় পরিবেশ বজায় থাকে যা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এবং রোমাঞ্চকর একটি অভিজ্ঞতা হতে পারে। দর্শনার্থীরা কাতারের বিখ্যাত খাবার মাখবুস হারিস এবং ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু মিষ্টি লুকাইমাত এর আসল স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন। এই ধরনের খাবার কেবল মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করে না বরং একটি অঞ্চলের দীর্ঘ ইতিহাস এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির গল্পও বলে। রমজান মাসে এই খাবারগুলোর কদর আরও বহুগুণ বেড়ে যায় কারণ সারাদিন রোজা রাখার পর আপনজনদের সাথে এগুলোর মাধ্যমে ইফতার করা এক অনাবিল প্রশান্তি এবং আনন্দ প্রদান করে।

কাতারের বিশ্বমানের জাদুঘরগুলোও এই রমজান ক্যাম্পেইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করবে। মিউজিয়াম অফ ইসলামিক আর্ট এবং ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ কাতার পবিত্র মাস উপলক্ষে তাদের দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ সময়ের ব্যবস্থা এবং অনন্য প্রদর্শনীর আয়োজন করবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই প্রদর্শনীগুলোতে ঐতিহাসিক ইসলামিক শিল্পকলা দুর্লভ ক্যালিগ্রাফি এবং রমজানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হবে। দেশি এবং বিদেশী পর্যটকরা এই জাদুঘরগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে ইসলামী সভ্যতার সোনালী অতীত এবং এর বৈশ্বিক অবদান সম্পর্কে গভীর এবং বিশদ জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন। আলোকিত রাতগুলোতে জাদুঘরের আশেপাশের উন্মুক্ত বিশাল প্রাঙ্গণগুলো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে যা এক অপূর্ব এবং স্মরণীয় দৃশ্য তৈরি করবে।

ভিজিট কাতার তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে এই প্রচারণাটি দেশীয় এবং বিদেশী উভয় ধরনের দর্শকদের কথা মাথায় রেখেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সাজানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে যেন তারা তাদের শহরের পুরনো রমজান ঐতিহ্যগুলোকে নতুন করে আবিষ্কার করেন এবং সেগুলো নিজেদের আগামী প্রজন্মের সাথে উদযাপন করেন। অন্যদিকে বিদেশী পর্যটকদের পরম সমাদরে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে কাতারের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আলোকিত শহরের দৃশ্য এবং সাম্প্রদায়িক জমায়েতগুলো স্বচক্ষে দেখার এবং অনুভব করার জন্য। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটকরা কেবল একটি নতুন দেশ ভ্রমণই করবেন না বরং একটি ভিন্ন ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হওয়ার এক বিরল সুযোগ পাবেন।

কাতারের পর্যটন কর্তৃপক্ষের মতে এই বিশাল উদ্যোগ তাদের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা কাতারকে একটি শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। রমজান মাসকে এই মহৎ লক্ষ্যের একটি প্রধান সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে কারণ এই সময়ে মানুষ বস্তুগত চাহিদার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার প্রতি বেশি আগ্রহী থাকে। সম্প্রদায়িক সম্পৃক্ততা এবং ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তা নির্ভর ভ্রমণের মাধ্যমে কাতার বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে একটি অত্যন্ত সম্মানজনক এবং অনন্য অবস্থান তৈরি করতে বদ্ধপরিকর। কাতারের উন্নত অবকাঠামো নিরাপদ পরিবেশ এবং বিশ্বমানের আতিথেয়তা এই লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সব মিলিয়ে কাতারের রমজান দুই হাজার ছাব্বিশ ক্যাম্পেইন একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী এবং প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ নয় বরং বিশ্ববাসীর সামনে ইসলামি সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের একটি অত্যন্ত সুন্দর এবং আধুনিক উপস্থাপনা। মাহের জেইন এবং ফাহাদ আল-হাজ্জাজির মতো বিখ্যাত শিল্পীদের সম্পৃক্ততা এই আয়োজনকে আরও মহিমান্বিত এবং আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যারা রমজান মাসে একটি ভিন্নধর্মী নিরাপদ এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশে নিজেদের সময় কাটাতে চান তাদের জন্য কাতার নিঃসন্দেহে একটি আদর্শ গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। এই মহতী উদ্যোগের মাধ্যমে কাতার সফলভাবে প্রমাণ করেছে যে আধুনিকতা এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের চমৎকার সমন্বয় ঘটানো সম্ভব এবং আন্তরিক আতিথেয়তার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ববাসীকে এক সুতোয় গাঁথা যায়।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

ভ্রমণ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!