মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে এক অত্যন্ত চমৎকার ও গভীর অর্থবহ প্রশ্ন রেখেছেন যা আমাদের প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়কে আন্দোলিত করে এবং আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন করে ভাবাতে শেখায়। তিনি ইরশাদ করেছেন যে তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, নেক আমল করে এবং বলে যে আমি একজন মুসলিম (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৩)। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যে আল্লাহর পথে আহ্বানকারী ব্যক্তির কথার চেয়ে উত্তম কোনো কথা এই আসমানের নিচে আর হতে পারে না। এই আয়াতটি কেবল একটি সাধারণ বাণী নয় বরং এটি মুমিনের জীবনের এক সুমহান লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। আমরা জানি যে ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যা আমাদের কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকতে শেখায় না বরং এটি সমাজ ও পরিবারকে সাথে নিয়ে আল্লাহর পথে চলার দীক্ষা দেয়। কেবল নিজের জন্য জান্নাত প্রার্থনা করা ইসলামের মূল শিক্ষা নয় বরং অন্যের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া এবং মানুষকে অন্ধকারের পথ থেকে আলোর পথে ডেকে আনা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর অর্পিত একটি বিশেষ আমানত।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানে এই উম্মতকে খাইরে উম্মত বা সর্বোত্তম জাতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণ আমাদের আভিজাত্য বা বৈষয়িক সমৃদ্ধি নয় বরং এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয়েছে দুটি বিশেষ গুণের মাধ্যমে যা হলো সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। আল্লাহ বলেন যে তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত যাদের মানবজাতির কল্যাণের জন্যই উদ্ভব ঘটানো হয়েছে কারণ তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে (সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০)। এই আয়াত থেকে এটি পরিষ্কার যে দাওয়াহ বা আল্লাহর পথে আহ্বান করা আমাদের জন্য কেবল একটি ঐচ্ছিক বা নফল কাজ নয় বরং এটি আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি আমরা এই মহৎ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করি তবে খাইরে উম্মত হিসেবে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। সারা বছর আমরা হয়তো বৈষয়িক ব্যস্ততা বা নানা কারণে এই মহান ইবাদত থেকে গাফেল থাকি তবে রমজান মাস হলো এই গাফিলতি ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে দাওয়াতের কাজে নেমে পড়ার এক সুবর্ণ সুযোগ।
রমজান মাসে মানুষের অন্তর প্রাকৃতিকভাবেই নরম থাকে এবং ইবাদতের প্রতি তাদের এক বিশেষ ঝোঁক তৈরি হয়। শয়তানের প্রভাব কম থাকায় এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ বিরাজ করায় মানুষ নিজেকে পরিশুদ্ধ করার এক সুপ্ত বাসনা লালন করে। এই উর্বর সময়ে যদি কোনো দাঈ বা আহ্বানকারী হেকমত ও ভালোবাসার সাথে আল্লাহর পথে ডাকেন তবে তা মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যাওয়ার সম্ভাবনা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। জোয়ার এলে যেমন মাঝি পাল তুলে দেয় এবং বাতাসের অনুকূলে নৌকা খুব দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যায় ঠিক তেমনি রমজানের এই আধ্যাত্মিক জোয়ারে দাঈ ভাইদের উচিত দাওয়াতের পাল তুলে দেওয়া। ইমাম ইবনুল জাওযি রাহিমাহুল্লাহ এক অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী কথা বলেছেন যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে যদি কেউ আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চায় তবে যেন সে আল্লাহর বান্দাদের তাঁর দিকে দাওয়াত দেয়। তিনি আরও বলেন যে এটি নবীদের কাজ এবং নবীগণ দাওয়াহ ইলাল্লাহর কাজকে নির্জনে ইবাদত করার ওপর অগ্রাধিকার দিতেন কারণ তাঁরা জানতেন যে এটি তাঁদের প্রিয় রবের নিকট অধিক পছন্দনীয় (সাইদুল খাতির)।
দাওয়াতের এই বরকতময় কাজে শামিল হতে বিশাল পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন নেই বরং প্রয়োজন কেবল ইখলাস ও আন্তরিকতার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও মানুষের কাছে পৌঁছে দাও (সহীহ আল-বুখারী, ৩৪৬১)। রমজানের এই সময়ে আপনার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসুন এবং তাদেরকে রমজানের ফজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করুন। আপনার প্রতিবেশী বন্ধু-বান্ধব বা অধীনস্থ কর্মচারীদের খোঁজ নিন এবং তারা রোজা রাখছে কি না বা নামাজ পড়ছে কি না তা স্নেহের সাথে তদারকি করুন। আপনার এক চিলতে হাসি বা আন্তরিক কথা হয়তো কারো হেদায়েতের উসিলা হয়ে যেতে পারে। আমাদের সমাজে দাওয়াতের কাজকে কেবল আলেমদের দায়িত্ব মনে করা হয় যা একটি ভ্রান্ত ধারণা। আমল এবং দাওয়াত যখন পাশাপাশি চলে তখন ব্যক্তির জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। যে ব্যক্তি অন্যকে আলোর পথ দেখায় আল্লাহ তাকেও সেই আলোয় আলোকিত করেন।
বর্তমানে প্রযুক্তির এই যুগে দাওয়াতের ময়দান অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আমরা আমাদের স্মার্টফোন ব্যবহার করে গঠনমূলক দ্বীনি বার্তা প্রচার করতে পারি। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক ইলম ও ধৈর্য। রমজান মাসে আমাদের উচিত হবে একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে দ্বীনের পথে ডাকা এবং ছোট ছোট হালাকা বা আলোচনার আয়োজন করা। বিশেষ করে তরুণদের মাঝে দাওয়াতের কাজ করা এখন সময়ের দাবি। তারা যখন সঠিক পথের দিশা পাবে তখন পুরো সমাজ পরিবর্তনের সূচনা হবে। দাওয়াতের এই পথে বাধা আসবে তবে ধৈর্য ও হেকমতের সাথে কাজ করে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে যে হেদায়েত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তবে আমাদের কাজ হলো কেবল সত্যের পয়গাম পৌঁছে দেওয়া। যদি আমরা রমজানে এই অবহেলিত আমলটিকে জাগ্রত করতে পারি তবে আমাদের সমাজ থেকে অন্ধকার ও অজ্ঞতা দূর হবে এবং আল্লাহর রহমত আমাদের ওপর বর্ষিত হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই রমজানে দাওয়াহ ইলাল্লাহর কাজে অংশগ্রহণ করার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের ইবাদতসমূহ কবুল করুন। আমীন।

আপনার মতামত লিখুন :