মানুষের সামাজিক জীবনে অন্যের জন্য কাজ করা বা উপকার করা একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় গুণ। তবে অনেক সময় এই গুণটি যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন তা ব্যক্তির নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। আমরা অনেকেই সারাদিন অন্যের চাহিদা মেটাতে গিয়ে নিজেদের কথা ভুলে যাই। পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা সহকর্মীদের সন্তুষ্ট করার এই অন্তহীন প্রচেষ্টায় আমাদের নিজস্ব ভালো লাগা বা ইচ্ছাগুলো এক সময় ম্লান হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে পিপল প্লিজিং বলা হয় যেখানে একজন মানুষ নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে কেবল অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় জীবন অতিবাহিত করে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে ভেতর থেকে নিঃস্ব করে দেয় এবং এক পর্যায়ে সে নিজের আসল পরিচয়টাই হারিয়ে ফেলে। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি।
ইসলাম আমাদের স্বার্থপর হতে শেখায় না বরং অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার গুরুত্ব দেয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে অন্যের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী (সিলসিলা সহীহা, ৪২৬)। তবে এই পরোপকারের অর্থ এই নয় যে নিজেকে ধ্বংস করে অন্যের উপকার করতে হবে। ইসলাম হলো ভারসাম্যের জীবন ব্যবস্থা যেখানে নিজেকে ভালোবাসার এবং নিজের যত্ন নেওয়ারও সমান তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই উম্মাহকে মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে অভিহিত করেছেন (সূরা আল-বাকারা, ২:১৪৩)। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই মধ্যপন্থা বজায় রাখা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যখন কেউ কেবল মানুষকে খুশি করার জন্য বাঁচতে শুরু করে তখন সে এই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং নিজের ওপর অবিচার শুরু করে।
সবাইকে খুশি করা আসলে একটি অসম্ভব লক্ষ্য। মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মানুষ নবী ও রাসূলগণও পৃথিবীর সবাইকে খুশি করতে পারেননি। প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মহান চরিত্রের মাধ্যমে অনেকের মন জয় করলেও তাঁর নিজ আপন চাচা আবু লাহাব তাঁর চরম শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। নবীদের জীবনের এই শিক্ষা আমাদের বলে দেয় যে মানুষের সন্তুষ্টির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি হাদীসে উল্লেখ করেছেন যে ব্যক্তি মানুষকে অসন্তুষ্ট করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং মানুষদেরকেও তার প্রতি সন্তুষ্ট করে দেন (সুনানে তিরমিযী, ২৪১৪)। এই শিক্ষা আমাদের শেখায় যে মানুষের সাময়িক স্বীকৃতির চেয়ে আল্লাহর স্থায়ী সন্তুষ্টিই আমাদের প্রকৃত মুক্তি এনে দিতে পারে।
শরীরের যত্ন নেওয়া এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ নয় বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আমানত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবী সালমান ফারসী (রাঃ) এর মাধ্যমে আমাদের জানিয়েছেন যে আমাদের ওপর আমাদের রবের হক রয়েছে এবং আমাদের নিজেদের নফসের বা শরীরেরও হক রয়েছে (সহীহ আল-বুখারী, ১৯৬৮)। আপনি যদি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বা শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকেন তবে আপনি আল্লাহর ইবাদত বা মানুষের সেবা কোনোটিই সঠিকভাবে করতে পারবেন না। তাই নিজের জন্য সময় বের করা এবং নিজের ভালো লাগাকে গুরুত্ব দেওয়া কোনো বিলাসিতা নয় বরং এটি দ্বীনেরই একটি অংশ। একজন সুস্থ ও শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে অধিক প্রিয়।
জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে হলে আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। সবার আগে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং এরপর নিজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা জরুরি। যখন আপনি নিজেকে ভালোবাসতে শিখবেন এবং নিজের সীমানা নির্ধারণ করতে জানবেন তখন আপনি অন্যকেও আরও সার্থকভাবে ভালোবাসতে পারবেন। বিনয়ের সাথে কোনো অযৌক্তিক অনুরোধে না বলতে শেখা কোনো অভদ্রতা নয় বরং এটি ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে নিজের যত্ন নেওয়ার এবং তাঁর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করার সঠিক তৌফিক দান করুন। আত্মমর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার মাধ্যমেই একজন মানুষ প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :