আধুনিক জীবনের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো আমরা এখন শত শত মানুষের সাথে যুক্ত থেকেও আগের চেয়ে অনেক বেশি একা। কোলাহলপূর্ণ কোনো অনুষ্ঠান বা বন্ধুদের আড্ডার মাঝে থেকেও অনেক সময় আমাদের মনে হয় আমরা যেন এক কাঁচের দেয়ালের ওপারে দাঁড়িয়ে আছি। এই যে মানুষের ভিড়ে থেকেও এক অদৃশ্য বিচ্ছিন্নতা এবং মনের গহীন কোণে জেঁকে বসা শূন্যতা এটি আসলে বর্তমান সময়ের এক বড় সংকট। আমরা বাহ্যিক জৌলুস এবং ডিজিটাল সংযোগের পেছনে ছুটতে গিয়ে অন্তরের প্রকৃত তৃষ্ণা ভুলে গেছি। মানুষ যখন নিজের অস্তিত্বের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তখনই এই নিঃসঙ্গতা তাকে গ্রাস করে ফেলে। দিনশেষে নিজের মুখোমুখি হলে এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাইরের এই হাসাহাসি আসলে কতটা অগভীর।
হৃদয়ের এই শূন্যতা আসলে মাটির তৈরি কোনো উপাদান দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। আত্মা বা রূহ যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক জ্যোতি তাই তার শান্তিও কেবল মহান রবের স্মরণের মাঝেই নিহিত। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) এর মতে মানুষের অন্তরে এমন এক একাকীত্ব রয়েছে যা আল্লাহর সাথে একান্তে মিলিত হওয়া ছাড়া দূর হওয়া সম্ভব নয়। আমরা যখন ভুল জায়গায় পূর্ণতা খুঁজি তখনই বিপত্তি ঘটে। মাছ যেমন পানি ছাড়া সুন্দরতম স্থানেও ছটফট করে তেমনি মানুষের আত্মা তার মালিককে ছাড়া প্রশান্তি পায় না। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি জিন ও মানুষকে কেবল তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)। এই মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়াটাই হলো সব অস্থিরতার মূল কারণ।
পাপ মানুষের অন্তরে কালো দাগ ফেলে দেয় যা আধ্যাত্মিক একাকীত্বের জন্ম দেয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে বান্দা যখন পাপ করে তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যা এক সময় পুরো অন্তরকে ঢেকে ফেলতে পারে (সুনানে তিরমিযী, ৩৩৩৪)। এই অন্ধকার মানুষের মনকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তাকে এক ভয়াবহ একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়। অনেকে ভাবেন নামাজ বা রোজা করার পরও কেন এমন লাগে এর উত্তর হতে পারে আমাদের ইবাদতগুলো কেবল শারীরিক কসরতে পরিণত হয়েছে যেখানে আত্মার উপস্থিতি নেই। যান্ত্রিক ইবাদত কখনো হৃদয়ের ব্যাধি দূর করতে পারে না যদি না তাতে আল্লাহর প্রতি একাগ্রতা থাকে।
এই শূন্যতা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো আল্লাহর স্মরণে ফিরে আসা। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে কেবল আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে (সূরা আর-রা`দ, ১৩:২৮)। এই শান্তি অর্জনের জন্য প্রথমত প্রয়োজন একটি জীবন্ত সালাত যেখানে বান্দা অনুভব করবে সে তার মালিকের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। দ্বিতীয়ত কোরআনের সাথে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি কারণ কোরআন হলো অন্তরের ব্যাধির আরোগ্য (সূরা ইউনুস, ১০:৫৭)। যখন কেউ বুঝতে পারে যে তার রব তার অতি নিকটে রয়েছেন এবং তিনি তার মনের সব না বলা কথা জানেন তখন আর কারো সঙ্গের প্রয়োজন পড়ে না।
একাকীত্বের সময়গুলো হতে পারে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর সেরা সুযোগ। নির্জনে আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং তাঁর সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করা ঈমানকে মজবুত করে। এছাড়া নেককার মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা উচিত যারা প্রতিনিয়ত আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ মূলত তার বন্ধুর আদর্শের ওপর থাকে তাই সঠিক বন্ধু নির্বাচন একাকীত্ব দূর করতে সহায়ক হয় (সুনানে আবি দাউদ, ৪৮৩৩)। মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ হলেন মুমিনদের অভিভাবক ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু (সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৭)। তিনি সর্বদা আমাদের সাথেই আছেন আমরা যেখানেই থাকি না কেন (সূরা আল-হাদীদ, ৫৭:৪)। এই বিশ্বাস যখন অন্তরে বদ্ধমূল হয় তখন পৃথিবীর কোনো ভিড় বা নীরবতা আর মানুষকে একা করতে পারে না।

আপনার মতামত লিখুন :