মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২

ধ্বংসস্তূপের মাঝেও গাজায় ফিরছে রমজানের ঐতিহ্যবাহী ‘কাতায়াফ’

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও গাজায় ফিরছে রমজানের ঐতিহ্যবাহী ‘কাতায়াফ’

গাজায় ঐতিহ্যবাহী কাতায়াফ তৈরির দৃশ্য | ছবি - উম্মাহ কণ্ঠ

পবিত্র রমজান মাস সমাগত। বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ যখন সিয়াম সাধনার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় দেখা যাচ্ছে এক অন্যরকম দৃশ্য। দীর্ঘ দুই বছরের চরম সংঘাত, অবর্ণনীয় ধ্বংসযজ্ঞ আর মানবিক সংকটের মাঝেও ফিলিস্তিনিরা তাদের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজার প্রতিটি অলিগলি আর শরণার্থী শিবিরের অস্থায়ী তাবুগুলোতে এখন ভেসে আসছে কাতায়াফের মিষ্টি সুবাস। কাতায়াফ হলো ফিলিস্তিনিদের রমজান মাসের এক অবিচ্ছেদ্য মিষ্টান্ন। এটি মূলত এক ধরণের প্যানকেক যা বাদাম, পনির বা ক্রিম দিয়ে পূর্ণ করে মিষ্টি সিরাপে ডুবিয়ে পরিবেশন করা হয়। গাজার মানুষের কাছে এটি কেবল একটি খাবার নয় বরং এটি তাদের অস্তিত্ব এবং প্রতিরোধের প্রতীক।

খান ইউনুসের গ্যারেজ রাফাহ এলাকায় এখন উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেখানকার দোকানদাররা তাদের মৌসুমী ব্যবসা পুনরায় শুরু করেছেন। তবে এই আয়োজন মোটেও সহজ ছিল না। গাজায় বর্তমানে রান্নার গ্যাস এবং জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট বিরাজ করছে। তবুও দমে যাননি স্থানীয় কারিগররা। তারা ইট এবং মাটির সাহায্যে অস্থায়ী কাঠের চুলা তৈরি করেছেন। বনের কাঠ আর ধ্বংসস্তূপ থেকে কুড়িয়ে আনা কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে কাতায়াফ। এই পিঠার সুগন্ধ যেন যুদ্ধের বারুদ মাখা বাতাসে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন বুনছে। স্থানীয়দের ভাষায় এই সুবাসই বলে দিচ্ছে যে শত বাধা সত্ত্বেও রমজান তাদের দ্বারে কড়া নাড়ছে।

গাজার প্রবীণ কাতায়াফ প্রস্তুতকারক সেলিম আল-বাইয়ুক এই শিল্পের একজন পরিচিত মুখ। তাকে স্থানীয়ভাবে ‍‍`কাতায়াফের রাজা‍‍` বলে ডাকা হয়। আনাদোলু এজেন্সির সাথে আলাপকালে তিনি তার জীবন সংগ্রামের গল্প তুলে ধরেন। ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে তাকে রাফাহ থেকে সপরিবারে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে। তার পুরনো দোকানটি এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। খান ইউনুসের একটি অস্থায়ী ডেরায় তিনি পুনরায় তার এই ঐতিহ্যবাহী পেশা শুরু করেছেন। সেলিম জানান যে কাঁচামালের অভাব এবং উপকরণের অগ্নিমূল্যের কারণে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু গাজার মানুষের মুখে রমজানের আনন্দ ফুটিয়ে তুলতে তিনি বদ্ধপরিকর। তার এই কাজ কেবল জীবিকা নয় বরং এটি একটি ঐতিহ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার লড়াই।

গাজায় কাতায়াফের গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এটি সাশ্রয়ী এবং পুষ্টিকর। ইফতারের দস্তরখানে এই মিষ্টান্নটি না থাকলে যেন ফিলিস্তিনিদের রমজান পূর্ণ হয় না। তবে এবারের চিত্র অনেকটা ভিন্ন। রান্নার গ্যাসের অভাবে অনেক বিক্রেতা এখন সনাতন পদ্ধতিতে তপ্ত তাওয়ায় পিঠা সেঁকছেন। স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে গাজায় প্রতিদিন অন্তত ২০ ট্রাক রান্নার গ্যাস প্রয়োজন। অথচ গত অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে গ্যাস প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। তা সত্ত্বেও কাতায়াফের দোকানগুলোতে মানুষের ভিড় কমছে না। মানুষ চাইছে অন্তত এই একটি ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে হলেও তারা যেন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বাদ পায়।

সাশ্রয়ী মূল্য বজায় রাখা সেলিমের মতো বিক্রেতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জানান যে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তিনি পিঠার দাম যতটা সম্ভব কমিয়ে রেখেছেন। এর পাশাপাশি তিনি রমজান উপলক্ষে কিছু মৌসুমী কর্মীরও নিয়োগ দিয়েছেন। এতে করে কিছু পরিবারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। গাজার সংকীর্ণ রাস্তা, তাবুর শহর এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত দালানের নিচে তৈরি হওয়া এই ছোট ছোট দোকানগুলোই এখন ফিলিস্তিনিদের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। প্রতিটি কাতায়াফের ভাঁজে যেন মিশে আছে এক একটি পরিবারের টিকে থাকার গল্প। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিয়েছেন যেখানে বলা হয়েছে যে নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে (সূরা আলাম নাশরাহ, ৯৪:৫)। গাজার মানুষের এই ধৈর্য ও ঐতিহ্যপ্রীতি যেন সেই আয়াতেরই বাস্তব প্রতিফলন।

স্থানীয় বাসিন্দা সাঈদ খালাফ জানান যে কাতায়াফ তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। শৈশব থেকেই তারা দেখে আসছেন রমজানের বিকেলে বাবা-দাদারা কাতায়াফ নিয়ে ঘরে ফিরতেন। যুদ্ধের কারণে অনেক কিছু বদলে গেলেও তারা চান না তাদের সন্তানরা এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হোক। সাঈদ আশা প্রকাশ করেন যে অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং গাজায় পুনরায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। তিনি মনে করেন বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর উচিত গাজার মানুষের এই মানবিক সংকটে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করা যাতে তারা তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো সম্মানের সাথে পালন করতে পারে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ সংঘর্ষে গাজার অবকাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে নিহতের সংখ্যা হাজার হাজার ছাড়িয়েছে এবং কয়েক লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যদিও বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে সীমান্ত বিধিমালা এবং মানবিক সহায়তার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমন এক বৈরী পরিবেশে রমজানের আয়োজন করা সাহসিকতার নামান্তর। কাতায়াফের কারিগররা তাদের হাতের জাদুতে কেবল পিঠা তৈরি করছেন না বরং তারা বিশ্বকে দেখাচ্ছেন যে ফিলিস্তিনিরা ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকেই পুনরায় জেগে উঠতে জানে।

পরিশেষে গাজার এই চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের মনোবল কোনো মারণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। রমজানের এই মাসটি গাজাবাসীর জন্য কেবল উপবাসের নয় বরং এটি তাদের ধৈর্য, সংহতি এবং বিশ্বাসের অগ্নিপরীক্ষা। কাঠের চুলার ধোঁয়া আর সিরার মিষ্টি ঘ্রাণে মিশে থাকা গাজার কাতায়াফ আজ বিশ্ববাসীর কাছে ফিলিস্তিনিদের অপরাজেয় মানসিকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্তি ফিরে আসুক এই জনপদে এবং প্রতিটি ফিলিস্তিনি পরিবার যেন নিরাপদে তাদের ইফতার সম্পন্ন করতে পারে সেই প্রার্থনা এখন শান্তিকামী মানুষের মুখে মুখে।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!