মানুষের সামাজিক জীবনে অন্যের সফলতা বা উন্নতি দেখে আনন্দিত হওয়া একটি মহৎ মানবিক গুণ। তবে অনেক সময় আমাদের অবচেতন মনে পরশ্রীকাতরতা বা হিংসার উদ্রেক হয় যা আত্মিক শান্তির জন্য বড় হুমকি। পরিচিত কেউ জীবনে বড় কোনো সাফল্য পেলে অন্তরে যে সূক্ষ্ম জ্বালা অনুভূত হয় তাকে ইসলামে হাসাদ বা হিংসা বলা হয়েছে। এই ব্যাধি কেবল ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে না বরং তার দীর্ঘদিনের অর্জিত নেক আমলগুলোকেও নীরবে ধ্বংস করে দেয়। হিংসার এই আগুন ভেতর থেকে মানুষকে এমনভাবে নিঃশেষ করে দেয় যে সে অন্যের ভালো সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই নেতিবাচক আবেগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রথমে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন।
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে হাসাদ বা হিংসা হলো অন্যের কোনো নেয়ামত দেখে অন্তরে কষ্ট পাওয়া এবং সেই নেয়ামতটি তার কাছ থেকে চলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা। এটি মূলত আল্লাহর বণ্টনের প্রতি এক ধরনের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা। হিংসুক ব্যক্তি তার অজান্তেই যেন আল্লাহর প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রশ্ন তোলে। ইতিহাসের প্রথম পাপগুলোর অন্যতম হলো এই হিংসা যার কারণে ইবলিস অভিশপ্ত হয়েছিল এবং কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করেছিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যেখানে বলা হয়েছে এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই যখন সে হিংসা করে (সূরা আল-ফালাক, ১১৩:৫)। এই আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে হিংসা কেবল ব্যক্তির ক্ষতি করে না বরং এটি অন্যের জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে।
হিংসার ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো কেননা হিংসা নেকীসমূহকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে (সুনানে আবি দাউদ, ৪৯০৩)। আগুনের লেলিহান শিখা যেমন মুহূর্তের মধ্যে শুকনো কাঠকে ছাই করে দেয় তেমনি হিংসার আগুন মানুষের নামাজ রোজা ও দান-সদকার পুণ্যকে ভস্মীভূত করে দেয়। হিংসার ফলে মানুষের অন্তরে কলুষতা তৈরি হয় যা তাকে গীবত চোগলখুরি এবং জুলুমের মতো জঘন্য অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। কিয়ামতের দিন আমলের ঝুলি শূন্য হওয়ার এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে হলে অন্তরের পবিত্রতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
তবে সব ধরনের ঈর্ষা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। গিবতাহ বা শুভ ঈর্ষা নামক একটি ধারণা ইসলামে প্রশংসিত যেখানে অন্যের নেক আমল বা ভালো গুণ দেখে নিজের জন্যও তা কামনা করা হয় কিন্তু অন্যের ক্ষতি চাওয়া হয় না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে কেবলমাত্র দুই ব্যক্তির ওপর ঈর্ষা করা যায় যার মধ্যে একজন হলো সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ কুরআনের জ্ঞান দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী আমল করে এবং অন্যজন যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং সে আল্লাহর পথে ব্যয় করে (সহীহ আল-বুখারী, ৫০২৫; সহীহ মুসলিম, ৮১৫)। এই সুস্থ প্রতিযোগিতা মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহ দেয় কিন্তু হাসাদ বা ক্ষতিকর হিংসা মানুষকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
হিংসা থেকে মুক্তির জন্য তাকদীরের ওপর বিশ্বাস সুদৃঢ় করা সবচেয়ে জরুরি। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যাকে ইচ্ছা দান করেন এবং তিনি মহা অনুগ্রহের অধিকারী (সূরা আল-বাকারা, ২:১০৫)। এই ধ্রুব সত্যটি মেনে নিলে অন্যের সাফল্যে হাহাকার করার প্রবণতা কমে যায়। নিজের যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং অন্যের জন্য বরকতের দোয়া করা হিংসার আগুন নেভানোর মোক্ষম ঔষধ। যখনই মনে হিংসার উদ্রেক হবে তখনই সেই ব্যক্তির জন্য দোয়া করলে অন্তরে প্রশান্তি নেমে আসে। নিজের মনোযোগকে অন্যের অর্জনের দিকে না রেখে বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের দিকে নিবদ্ধ করাই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। আত্মিক এই পরিশুদ্ধিই একজন মুমিনকে দুনিয়া ও আখেরাতে প্রকৃত সফলতা দান করে।

আপনার মতামত লিখুন :