মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২

বিগ ব্যাং ও মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য: বিজ্ঞান ও কুরআনের বিস্ময়কর মিল

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬, ১১:৪১ এএম
বিগ ব্যাং ও মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য: বিজ্ঞান ও কুরআনের বিস্ময়কর মিল

মহাবিশ্বের আদি ও অন্তের সন্ধানে

মহাবিশ্ব সৃষ্টির সেই আদি মুহূর্তটি কেমন ছিল এবং কীভাবে এই বিশাল অসীম শূন্যতার বুক চিরে নক্ষত্ররাজির জন্ম হলো তা মানুষের চিন্তার জগতকে যুগে যুগে আলোড়িত করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পেছনের দিকে তাকাই তখন মহাবিশ্বের উৎপত্তির রহস্য উন্মোচনে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব যা আধুনিক কসমোলজির ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে নাজিলকৃত মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে এই মহাজাগতিক সৃষ্টির এমন সব তথ্য ও ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে যা বর্তমানের আধুনিক বিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সাথে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়। মহাবিশ্ব সৃষ্টির এই রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা এবং বিগ ব্যাং-এর পূর্ববর্তী অবস্থা নিয়ে কুরআনের শাশ্বত বাণীর মধ্যকার মেলবন্ধন আমাদের অস্তিত্বের গূঢ় রহস্য উন্মোচন করে। মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো এর সম্প্রসারণশীলতা। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের জানিয়েছে যে আমাদের এই দৃশ্যমান মহাবিশ্ব অতীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং অকল্পনীয় উত্তপ্ত অবস্থায় ছিল এবং সেখান থেকেই এর যাত্রা শুরু হয়ে প্রতিনিয়ত এটি সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাবিশ্বের এই সম্প্রসারণের বিষয়টি আজ প্রমাণিত সত্য হলেও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে বহু আগেই এই সত্যটি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন যে তিনি স্বীয় ক্ষমতাবলে মহাকাশ নির্মাণ করেছেন এবং তিনি অবশ্যই এর ব্যাপক সম্প্রসারণকারী (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৪৭)। এই আয়াতে ব্যবহৃত সম্প্রসারণকারী শব্দটি আধুনিক বিজ্ঞানের এক্সপ্যান্ডিং ইউনিভার্স ধারণার সাথে হুবহু মিলে যায় যা কুরআনকে এক মহাবিস্ময় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৯৬৫ সালে আবিষ্কৃত কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছে। এই বিকিরণ হলো মহাবিশ্বের ইতিহাসের সবথেকে প্রাচীন নিদর্শন যা সৃষ্টির একদম শুরুতে মহাবিশ্বের সেই ঘন ও উত্তপ্ত অবস্থার অবশিষ্টাংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে মহাবিশ্বের বয়স যখন মাত্র কয়েক লক্ষ বছর ছিল তখন এর গড় তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কিন্তু মহাবিশ্ব যত সম্প্রসারিত হয়েছে ততই এটি শীতল হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের এই তথ্যের সাথে কুরআনের বর্ণনার এক অভূতপূর্ব মিল খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে আল্লাহ প্রশ্ন রেখেছেন যে যারা অস্বীকার করে তারা কি ভেবে দেখে না আসমান ও জমিন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল অতঃপর তিনি উভয়কে পৃথক করে দিলেন (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩০)। এই আয়াতে রাতকান শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ হলো সংযুক্ত বা পুঞ্জীভূত থাকা যা বিগ ব্যাং থিওরি অনুযায়ী মহাবিশ্বের শুরুর সেই সিঙ্গুলারিটি বা একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত থাকার অবস্থার দিকেই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করে। বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে মহাবিশ্বের শুরুর অবস্থা সম্পর্কে যে ধারণা পেয়েছেন তা হলো সেই সময় মহাবিশ্ব ছিল সর্বোচ্চ শক্তিসম্পন্ন বিকিরণের এক মহাসমুদ্র। তখন আলো ও তাপ একটি বাষ্পাকার অবস্থায় বিরাজমান ছিল যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় ধোঁয়া বা গ্যাসীয় মেঘের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। বিস্ময়করভাবে পবিত্র কুরআনে মহাবিশ্বের এই আদি অবস্থার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে অতঃপর আল্লাহ মহাকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ বা ধোঁয়া বিশেষ (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:১১)। এখানে দুখান শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে যা বিজ্ঞানের আদিম উত্তপ্ত ও গ্যাসীয় অবস্থার সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিজ্ঞানীরা বলছেন বিগ ব্যাং ঘটার অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি। এই সময়টিতে মহাবিশ্বের ঘনত্ব ও তাপ এত বেশি ছিল যে সেখানে কোনো সাধারণ পদার্থের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব ছিল না। পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে বিগ ব্যাং-এর ঠিক পরমুহূর্তে এই প্রচণ্ড তাপমাত্রার কারণে মৌলিক কণাগুলোর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ ঘটে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। এই পর্যায়ে কোয়ার্ক এবং অ্যান্টিকোয়ার্কের মতো মৌলিক কণাগুলোর জন্ম হয় এবং এদের পারস্পরিক সংঘর্ষে অনেক কণা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও কিছু অবশিষ্ট থেকে যায় যা পরবর্তীতে মহাবিশ্বের গাঠনিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। তাপমাত্রা যখন আরও কিছুটা কমে ১০ টু দি পাওয়ার ১৩ কেলভিনে নেমে আসে তখন কোয়ার্কগুলো একত্রিত হয়ে প্রোটন ও নিউট্রন কণা গঠন করতে শুরু করে। এরপর তাপমাত্রা আরও কমে গেলে এই প্রোটন ও নিউট্রনগুলো মিলিত হয়ে প্রথমবারের মতো পরমাণুর কেন্দ্র গঠিত হয়। মহাবিশ্ব সৃষ্টির এই পর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং সুশৃঙ্খল যা কোনোভাবেই দৈবক্রমে ঘটা সম্ভব নয় বরং এটি এক মহানিয়ন্ত্রকের পরিকল্পনার স্বাক্ষর বহন করে।

তাপমাত্রা যখন আরও কমে ৩০০০ কেলভিনে পৌঁছায় তখন মহাবিশ্বের সেই বিক্ষিপ্ত ইলেকট্রন কণাগুলো নিউক্লিয়াসের চারপাশে কক্ষপথ ধারণ করে ঘুরতে শুরু করে এবং এভাবেই সৃষ্টি হয় প্রথম পরমাণু। এর পরবর্তীতে মহাকর্ষ বলের প্রভাবে গ্যাস ও ধূলিকণা একত্রিত হয়ে গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রের জন্ম দেয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবী নামক গ্রহটি বাসযোগ্য হয়ে ওঠে এবং সেখানে প্রাণের সঞ্চার ঘটে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পৃথিবী সৃষ্টির এই প্রক্রিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন যে তিনি সৃষ্টি জীবের জন্য পৃথিবীর উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং চার দিনের মধ্যে বা চারটি পর্যায়ে তাতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:১০)। এই আয়াতটি পৃথিবী গঠনের পর এখানে প্রাণের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ যেমন পাহাড়-পর্বত স্থাপন এবং খাদ্যের সংস্থান করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবী যখন শীতল হতে শুরু করে এবং পরিবেশ অনুকূল হয় তখনই এখানে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিকাশ ঘটে যা কুরআনের এই বর্ণনার সাথে সম্পূর্ণ মিলে যায়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে চিন্তা করার এবং তাঁর সৃষ্টির রহস্য উদঘাটন করার আহ্বান জানিয়েছেন বারবার। পৃথিবী সৃষ্টির জন্য কুরআনে যে দুই দিনের কথা বলা হয়েছে তা আমাদের পার্থিব চব্বিশ ঘণ্টার দিন নয় বরং মহাজাগতিক সময়ের কালপর্ব বা দীর্ঘ যুগ বোঝানো হয়েছে যা বিজ্ঞানের দীর্ঘ সময়কালের ধারণার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। মহাবিশ্ব সৃষ্টির এই বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং নক্ষত্ররাজির ঘূর্ণন সবকিছুই এক মহান স্রষ্টার মহাপরিকল্পনার অংশ। বিজ্ঞান আজ যা আবিষ্কার করছে কুরআন চৌদ্দশ বছর আগেই তা জানিয়ে দিয়েছে যা প্রমাণ করে যে বিজ্ঞান ও কুরআন পরস্পরবিরোধী নয় বরং একে অপরের পরিপূরক। আমাদের উচিত এই নিদর্শনগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং মহান আল্লাহর প্রতি ঈমানকে আরও মজবুত করা।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

প্রযুক্তি বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!