পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ মহাযুদ্ধের দামামা বাজার সময় ঘনিয়ে এসেছে যেখানে হক ও বাতিলের চূড়ান্ত ফয়সালা হবে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এবং মিথ্যাবাদী দাজ্জালের মধ্যকার এক মহাকাব্যিক সংঘাতের মাধ্যমে। কেয়ামতের আগে পৃথিবীতে মোট পাঁচটি মহাযুদ্ধ বা মালহামা সংঘটিত হওয়ার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় যার মধ্যে দুইটি পূর্ববর্তী উম্মতদের সময় ঘটে গেছে এবং বাকি তিনটি এই উম্মতের সময়েই ঘটবে বলে ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক সূত্রে জানা যায়। এই তিনটি মহাযুদ্ধের মধ্যে মালহামাতুত তুর্ক ও মালহামাতুর রুমের পর সবচেয়ে ভয়ংকর হবে মালহামাতুদ দাজ্জাল যার পরিসমাপ্তি ঘটবে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের হাতে দাজ্জালের বিনাশের মধ্য দিয়ে। ঈসা আলাইহিস সালাম এবং দাজ্জালের এই সংঘাত নিছক কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয় বরং এটি ঈমানের এক কঠিনতম পরীক্ষা যা মুমিনদের জন্য অপেক্ষা করছে। মুসলিম উম্মাহর জন্য এই কঠিন সময়ে সঠিক জ্ঞান ও দিকনির্দেশনা থাকা অত্যন্ত জরুরি কারণ দাজ্জালের ফিতনা হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি নবীকেই তাঁর উম্মতদের দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে দাজ্জাল হবে একচোখে কানা কিন্তু আমাদের মহান রব কানা নন এবং দাজ্জালের দুই চোখের মাঝখানে কাফের শব্দটি লেখা থাকবে যা শিক্ষিত বা অশিক্ষিত সকল মুমিন ব্যক্তি সহজেই পড়তে পারবেন (সহীহ বুখারী, ৭১৩১)।
ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থেও দাজ্জাল বা অ্যান্টি-ক্রাইস্ট সম্পর্কে অনেক ভবিষ্যৎবাণী রয়েছে যেখানে তারা তাকে তাদের মসিহ বা ত্রাণকর্তা হিসেবে মনে করে এবং তাকে কেন্দ্র করেই তারা বর্তমান বিশ্বে একচ্ছত্র শাসনের স্বপ্ন দেখছে। তারা মনে করে দাজ্জাল এসে তাদের জন্য পৃথিবীকে একক শাসনের অধীনে আনবে এবং তাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেবে অথচ তারা জানে না যে তারা যাকে রাজা ভাবছে সে মূলত মানবতার শত্রু এবং মহান আল্লাহর অবাধ্য এক মহাপ্রতারক। বাইবেলের নতুন নিয়মেও উল্লেখ আছে যে এক পাপ পুরুষ নিজেকে ঈশ্বর দাবি করে মন্দিরে বসবে এবং অলৌকিক ক্ষমতা দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে কিন্তু প্রকৃত মসিহ ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর মুখের তেজোময় নিশ্বাসে তাকে ধ্বংস করবেন যা আমাদের সহীহ হাদিসের বর্ণনার সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন যে দাজ্জাল মানুষের কাছে এসে তাদের মৃত পিতামাতাকে জীবিত করে দেখানোর ভেল্কিবাজি দেখাবে এবং দুর্বল ঈমানের লোকেরা তাকে খোদা মেনে নেবে অথচ শয়তান কেবল ওই মৃত ব্যক্তির আকৃতি ধরে মানুষকে ধোঁকা দেবে (সুনানে ইবনে মাজাহ, ৪০৭৭)। দাজ্জালের আগমনের স্থান সম্পর্কে নিশ্চিত করা হয়েছে যে সে প্রাচ্যের দিক থেকে অর্থাৎ খুরাসান বা ইস্পাহান অঞ্চল থেকে আত্মপ্রকাশ করবে এবং ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে তার প্রভাব বিস্তার করবে (সহীহ মুসলিম, ২৯৪৪)।
দাজ্জালের ক্ষমতার পরিধি হবে মানুষের কল্পনাতীত কারণ তার সাথে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো দেখতে দুটি নহর থাকবে যার মধ্যে তার দৃশ্যমান আগুন হবে মূলত সুমিষ্ট পানি এবং দৃশ্যমান পানি হবে আগুন। সে আকাশকে নির্দেশ দিলে বৃষ্টি হবে এবং মাটিকে নির্দেশ দিলে ফসল উৎপন্ন হবে যা দেখে সাধারণ মানুষ তাকে ঈশ্বর ভাবতে শুরু করবে (সহীহ মুসলিম, ২৯৩৪)। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ঈমানের ওপর টিকে থাকা হবে জ্বলন্ত কয়লা হাতে রাখার মতো কঠিন কাজ। দাজ্জালের এই ফিতনা যখন চরমে পৌঁছাবে তখন ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে একদল মুসলিম সত্যের পথে অটল থাকবে এবং ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তেই আল্লাহ তায়ালা হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে পৃথিবীতে পুনরায় প্রেরণ করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন যে ঈসা ইবনে মারিয়াম আলাইহিস সালাম দামেস্কের পূর্ব প্রান্তের সাদা মিনারে দুইজন ফেরেশতার ডানায় ভর করে অবতরণ করবেন যখন তাঁর পরনে থাকবে হালকা হলুদ রঙের দুটি বস্ত্র এবং তাঁর শরীর থেকে স্নিগ্ধ পানির ফোঁটা ঝরবে (সহীহ মুসলিম, ২৯৩৭)। তিনি ইসলাম ছাড়া সকল ধর্ম বিলুপ্ত করবেন এবং জিজিয়া প্রথা রহিত করে এক নতুন শান্তিময় যুগের সূচনা করবেন।
ঈসা আলাইহিস সালামের আগমনের পূর্বে পৃথিবীতে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে যার ইঙ্গিত দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন যে জেরুজালেমের আবাদ হওয়া হবে মদিনার গুরুত্ব কমার কারণ এবং মদিনার গুরুত্ব কমা হবে মহাযুদ্ধের সূচনার লক্ষণ (সুনানে আবু দাউদ, ৪২৯৪)। এই মহাযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় কনস্টান্টিনোপল বিজয় হবে এবং তার পরেই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। কিয়ামতের পূর্বে রোমান বা খ্রিস্টান বাহিনীর সাথে মুসলিমদের এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হবে আমাক বা দাবিক নামক স্থানে যেখানে মুসলিম বাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ শহীদ হবে যারা আল্লাহর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ শহীদ এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ বিজয়ী হবে যারা আর কখনো ফিতনায় পড়বে না (সহীহ মুসলিম, ২৮৯৭)। এই বিজয়ের পর যখন মুসলিমরা সিরিয়ায় পৌঁছাবে তখন প্রকৃত দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। মুসলিম বাহিনী যখন যুদ্ধের জন্য কাতারবন্দী হবে এবং ইকামতের ধ্বনি উচ্চারিত হবে ঠিক তখনই ঈসা আলাইহিস সালাম আকাশ থেকে অবতরণ করবেন এবং ইমাম মাহদীর পেছনে নামাজ আদায় করবেন।
নামাজের পর ঈসা আলাইহিস সালাম দাজ্জালের মুখোমুখি হবেন এবং আল্লাহর শত্রু দাজ্জাল ঈসা আলাইহিস সালামকে দেখামাত্রই ভয়ে পানিতে লবণের মতো গলতে শুরু করবে। ঈসা আলাইহিস সালাম তাকে বলবেন যে তার জন্য একটি নির্দিষ্ট আঘাত বরাদ্দ আছে যা থেকে সে পালাতে পারবে না এবং এরপর তিনি তাকে ফিলিস্তিনের লুদ নামক শহরের ফটকে হত্যা করবেন (সহীহ মুসলিম, ২৯৪০)। লুদ শহরটি বর্তমানে ইসরায়েলের তেল আবিব থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এখানে ইসরায়েলের প্রধান কৌশলগত স্থাপনা রয়েছে যা হয়তো দাজ্জালের পলায়নের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারত। দাজ্জালকে হত্যার পর আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ ও মাজুজকে ধ্বংস করবেন এবং পৃথিবীতে এমন শান্তি আসবে যে হিংস্র প্রাণী ও মানুষের মধ্যে কোনো শত্রুতা থাকবে না। ঈসা আলাইহিস সালাম পৃথিবীতে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন এবং পরিশেষে মৃত্যুবরণ করবেন যখন মুসলিমরা তাঁর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করবে (সুনানে আবু দাউদ, ৪৩২৪)। এই মহাযুদ্ধ এবং ঈসা আলাইহিস সালামের আগমন মুসলিম উম্মাহর চূড়ান্ত বিজয়ের বার্তা বহন করে যা প্রমাণ করে যে সত্যেরই জয় হবে। দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করা এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া আমাদের প্রত্যেকের একান্ত কর্তব্য।

আপনার মতামত লিখুন :