দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে শীতকাল মানেই এক ভয়ার্ত কুয়াশার চাদর। এই কুয়াশা কেবল দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয় না বরং এটি প্রতি বছর কেড়ে নেয় শত শত প্রাণ। সড়ক দুর্ঘটনা, বিমান চলাচলে বিঘ্ন এবং ট্রেন বিলম্বের কারণে দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের ক্ষতি হয়। সরকারগুলো সাধারণত কুয়াশাচ্ছন্ন সময়ে সাবধানে গাড়ি চালানোর পরামর্শ বা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের মতো প্রথাগত পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। কিন্তু এই চিরচেনা সংকটকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন পাকিস্তানের একদল অদম্য শিক্ষার্থী। তারা এমন এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন যা কুয়াশাকে কেবল দূরই করবে না বরং সেই কুয়াশা থেকে পানি সংগ্রহ করে তা দিয়ে মহাসড়কের বাতি জ্বালানোর প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। তাদের এই প্রজেক্টের নাম দেওয়া হয়েছে নেবুলাভোল্ট।
পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের হায়দ্রাবাদ শহরের ট্যাবস্ কলেজ অব সায়েন্সের চারজন ছাত্রী এই অভাবনীয় উদ্ভাবনের নেপথ্যে রয়েছেন। এই ছাত্রীরা হলেন দোয়া ইজাজ, শিফা কামরান, ফাতিমা ফরিয়াল এবং মীজাব। হায়দ্রাবাদ শহরটি সাধারণত পাকিস্তানের প্রধান শিক্ষাগত বা প্রযুক্তিগত কেন্দ্রগুলোর চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকা অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই চার শিক্ষার্থী প্রমাণ করেছেন যে উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তির জন্য বড় শহরের সুযোগ-সুবিধার চেয়ে সমস্যাকে দেখার সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বেশি প্রয়োজন। তারা লক্ষ্য করেছেন যে লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি বা ইসলামাবাদের মতো শহরগুলোতে ঘন কুয়াশার কারণে মহাসড়কে একের পর এক বড় ধরণের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সাধারণ মানুষের কাছে যা একটি প্রাণঘাতী আপদ, এই কিশোরীদের কাছে তা ছিল শক্তির এক অব্যবহৃত উৎস।
নেবুলাভোল্ট প্রযুক্তিটি মূলত ফল-টু-ইলেকট্রিসিটি বা কুয়াশা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণা। এটি একটি নির্দিষ্ট ধরণের হাইড্রোফিলিক জাল বা মেশ ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডলে ভাসমান অতি ক্ষুদ্র জলকণাগুলোকে শোষণ করে নেয়। সংগৃহীত এই জলকণাগুলো যখন একটি বিশেষ রূপান্তর ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন সেখানে ট্রাইবোইলেকট্রিক ন্যানোজেনারেশন প্রযুক্তি কাজ করে। ২০১২ সালে চীনা বিজ্ঞানী ঝং লিন ওয়াং এই প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছিলেন যা মূলত দুটি ভিন্ন উপাদানের সংস্পর্শ এবং পৃথকীকরণের মাধ্যমে সৃষ্ট যান্ত্রিক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে। গাজার এই ছাত্রীরা সেই একই তাত্ত্বিক ভিত্তি ব্যবহার করে কুয়াশার জলকণার পতনশীল গতিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
এই উদ্ভাবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্বিমুখী কার্যকারিতা। প্রথমত এটি বাতাস থেকে আর্দ্রতা শুষে নিয়ে স্থানীয়ভাবে কুয়াশার ঘনত্ব কিছুটা কমিয়ে দেয় যা চালকদের জন্য দৃশ্যমানতা বাড়াতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত এই প্রক্রিয়ায় যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় তা দিয়ে সড়কের পাশের স্ট্রিট লাইট, ট্রাফিক সিগন্যাল এবং অন্যান্য সতর্কতামূলক সংকেত ব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব। বর্তমানে তাদের তৈরি করা প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক মডেলটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে মাত্র ৬ থেকে ১০ হাজার পাকিস্তানি রুপি। তবে এই প্রযুক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ইউনিট তৈরি করতে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ রুপির প্রয়োজন হতে পারে। শিক্ষার্থীদের হিসাব অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিট ঘন কুয়াশার সময় এক কিলোমিটার এলাকার অন্তত ১১ থেকে ২৮টি স্ট্রিট লাইট জ্বালানোর মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে।
এই অভাবনীয় সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ নেবুলাভোল্ট প্রজেক্টটি `এন্টারপ্রাইজ চ্যালেঞ্জ পাকিস্তান` নামক দেশের বৃহত্তম উদ্যোক্তা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। কিং’স ট্রাস্ট ইন্টারন্যাশনাল এবং সিড ভেঞ্চারসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী হাজারো শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিল। করাচিতে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই চার ছাত্রীকে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিয়ে দেওয়া হয়। হায়দ্রাবাদের মতো একটি ছোট শহরের সাধারণ কলেজ থেকে উঠে আসা এই মেয়েদের জন্য এই বিজয় ছিল অনেক বড় এক মাইলফলক। এটি কেবল তাদের ব্যক্তিগত জয় নয় বরং পাকিস্তানের নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রা এবং প্রান্তিক অঞ্চলের মেধার এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-জাসিয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন যে আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবকিছুকেই তিনি মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন (সূরা আল-জাসিয়া, ৪৫:১৩)। প্রকৃতির এই রহস্যময় উপাদান কুয়াশাকে মানুষের কল্যাণে এবং জানমাল রক্ষার কাজে ব্যবহার করার এই প্রচেষ্টা মূলত সেই মহাজাগতিক সত্যেরই প্রতিফলন। এই শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছেন যে বিজ্ঞান কেবল পাঠ্যবইয়ের সূত্র মুখস্থ করার নাম নয় বরং চারপাশের সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজার এক কার্যকর হাতিয়ার। তারা তাদের একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন এবং তাদের পরিবার ও শিক্ষকরা এই যাত্রায় ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। বিশেষ করে তাদের প্রজেক্ট সুপারভাইজার ময়েজ জিলানী তাদেরকে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে লড়াই করার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন।
অবশ্য এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কুয়াশা একটি ঋতুভিত্তিক বিষয় হওয়ায় বছরের সবসময় এই যন্ত্র থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব নয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ছাত্রীরা বর্তমানে নেবুলাভোল্টকে একটি হাইব্রিড সিস্টেমে রূপান্তর করার কাজ করছেন। তারা এমন ব্যবস্থা যুক্ত করতে চাইছেন যাতে উচ্চ আর্দ্রতা সম্পন্ন এলাকা বা এমনকি শুষ্ক অঞ্চলেও বাতাসের সামান্য আর্দ্রতা থেকে সামান্য পরিমাণে হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগটি গ্রিন এন্টারপ্রেনারশিপ বা সবুজ উদ্যোক্তা নীতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ কারণ এই পদ্ধতিতে কোনো ক্ষতিকারক রাসায়নিক বা কার্বন নিঃসরণ ঘটে না।
বর্তমানে এই প্রকল্পটি একটি সফল প্রোটোটাইপ হিসেবে অবস্থান করছে। একে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করতে হলে বড় ধরণের বিনিয়োগ এবং সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। পাকিস্তান এবং ভারতের মতো দেশগুলোতে যেখানে শীতকালে কুয়াশার কারণে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে সেখানে নেবুলাভোল্টের মতো দেশীয় প্রযুক্তির বাণিজ্যিক উৎপাদন অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। এই কিশোরীদের উদ্ভাবন আজ প্রমাণ করে দিয়েছে যে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের কাছে বিশ্বের যেকোনো বড় সংকটের সমাধান রয়েছে। দরকার শুধু সঠিক পরিবেশ এবং পৃষ্ঠপোষকতা। নেবুলাভোল্ট টিমের স্বপ্ন হলো তাদের এই ছোট্ট ল্যাবে তৈরি হওয়া যন্ত্রটি একদিন পাকিস্তানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাহারাদার হিসেবে কাজ করবে এবং অন্ধকার কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে আলোর দিশারী হয়ে উঠবে।

আপনার মতামত লিখুন :