মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২

কেয়ামতের ভয়াবহতা ও গাফেল মানুষের করুণ পরিণতির বর্ণনা

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬, ১১:০৮ এএম
কেয়ামতের ভয়াবহতা ও গাফেল মানুষের করুণ পরিণতির বর্ণনা

মহাপ্রলয়ের পদধ্বনি ও মানুষের অসহায়ত্ব /Ai

মানুষের জীবনে ঘুমের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত বিচিত্র হলেও কখনো কখনো তা এক চরম অসহায়ত্বের বার্তা বহন করে। গভীর ঘুমের ঘোরে যখন মস্তিষ্ক সজাগ থাকে কিন্তু শরীর সাড়া দেয় না, যখন মানুষ চোখ মেলতে চায় কিন্তু চোখের পাতাগুলো পাথরের মতো ভারী হয়ে থাকে, তখন সেই সামান্য সময়ের অক্ষমতা তাকে চরমভাবে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। এই যে চিৎকার করতে চেয়েও কণ্ঠ দিয়ে আওয়াজ বের না হওয়া কিংবা নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলা—এটি দুনিয়ার বুকে এক নগণ্য সংকেত মাত্র। যদি এই সামান্য ঘুমের পক্ষাঘাত বা অক্ষমতা আমাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, তবে চিন্তা করুন সেই মহা মুহূর্তের কথা যখন মহান আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠবে এবং পুরো মহাবিশ্ব এক মহাপ্রলয়ের মুখে পড়বে। সেই দিনটি হবে চিরস্থায়ীভাবে আটকা পড়ে যাওয়ার দিন যেখানে কোনো ওজর-আপত্তি বা পালানোর পথ অবশিষ্ট থাকবে না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিয়েছিলেন উঠে দাঁড়াতে এবং মানুষকে সতর্ক করতে (সূরা আল-মুদ্দাসসির, ৭৪:২)। এই সতর্কবাণী কোনো সাধারণ ঘোষণা নয় বরং এটি হলো মানুষকে জাহান্নামের ভয়াবহতা, কবরের অন্ধকার এবং আখেরাতের সেই কঠিন হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে সজাগ করার এক ঐশী আহ্বান। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী মোহে অন্ধ না হয়ে সেই পরকালের কঠিন বাস্তবতাকে হৃদয়ে ধারণ করা।

কেয়ামত বা মহাপ্রলয় সম্পর্কে কুরআন মাজিদের বর্ণনা অত্যন্ত রোমহর্ষক। আল্লাহ তাআলা একে ‍‍`আল-কারিয়া‍‍` বা এক প্রচণ্ড আঘাতকারী শব্দ হিসেবে অভিহিত করেছেন যা মানুষের দরজায় কড়া নাড়ার মতো বিকট শব্দে আঘাত করবে (সূরা আল-কারিয়া, ১০১:১-২)। এই শব্দ কেবল ভীতি নয় বরং এটি একটি ধ্রুব সত্য যা প্রতিনিয়ত প্রতিটি মৃত্যু ও প্রতিটি জানাজার মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করছে। আমরা এই পৃথিবীতে মুসাফির মাত্র কিন্তু দুনিয়ার জৌলুস আমাদের এমনভাবে গাফেল করে রেখেছে যে আমরা মৃত্যুর পরোয়ানা ভুলে গেছি। কেয়ামতের দিন যখন ইসরাফিল আলাইহিস সালাম শিঙায় ফুঁ দেবেন, তখন এই সাজানো পৃথিবী তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। আল্লাহ কুরআনে সেই দৃশ্য এঁকেছেন যেখানে কোটি কোটি মানুষ হবে আগুনের দিকে ছুটে আসা পতঙ্গের মতো যারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছোটাছুটি করতে থাকবে (সূরা আল-কারিয়া, ১০১:৪)। সেদিন মানুষের সামাজিক পরিচয় বা রক্তের সম্পর্ক কোনো উপকারে আসবে না। বাবা তার আদরের ছেলেকে চিনবে না, স্বামী তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। সবাই কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এবং ভয়ে মানুষকে মাতাল সদৃশ দেখাবে যদিও তারা মাতাল নয় বরং আল্লাহর আজাব হবে অত্যন্ত কঠিন (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:২)।

এই মহাপ্রলয়ের সময় আকাশ ফেটে পড়বে এবং উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো খসে পড়ে নিস্প্রভ হয়ে যাবে। সমুদ্রের পানি উত্তাল হয়ে বাষ্পে পরিণত হবে এবং পাহাড়গুলো ধুনিত তুলার মতো বাতাসে উড়তে থাকবে। মানুষ যখন পালানোর জায়গা খুঁজবে তখন ঘোষণা করা হবে যে আজ পালানোর কোনো জায়গা নেই এবং একমাত্র আল্লাহর কাছেই সকলের ঠাঁই (সূরা আল-কিয়ামাহ, ৭৫:১০-১২)। আমাদের জীবনের প্রতিটি পরিবর্তন যেমন দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা বার্ধক্য আসা আসলে মৃত্যুর আগাম বার্তা। অথচ আমরা আখেরাতমুখী হওয়ার বদলে দুনিয়ার সম্পদ ও পদের প্রতিযোগিতায় মত্ত। ইসলামি জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি হলো তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাত। তাওহিদ কেবল মুখে স্বীকার করার নাম নয় বরং এটি এই দৃঢ় বিশ্বাস যে আমাদের জীবনের সমস্ত সুখ-দুঃখ এবং লাভ-ক্ষতি একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই অমোঘ বাণী আমাদের মনে রাখা উচিত যে যদি সমস্ত সৃষ্টিজগত মিলে তোমার কোনো ক্ষতি করতে চায় তবে আল্লাহর নির্ধারণের বাইরে তারা কিছুই করতে পারবে না (সুনানুত তিরমিজি, ২৫১৬)। সৃষ্টিজগত আসলে অক্ষম এবং সবকিছুই আল্লাহর একক ফয়সালা।

উম্মতে মুহাম্মদী হিসেবে আমরা আজ যে গাফিলতির মধ্যে ডুবে আছি তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের নাজাতের ফিকিরে সারারাত নামাজে দাঁড়িয়ে পা ফুলিয়ে ফেলতেন, তাঁর উম্মত হয়ে আমরা ফজরের নামাজ পর্যন্ত জামাতে পড়ি না। আমরা বছরের পর বছর সুদের কারবারে লিপ্ত থাকি, ওজনে কম দেই এবং হারাম উপার্জনের পাহাড় গড়ি কিন্তু একবারও ভাবি না যে হাশরের ময়দানে কোন মুখে সেই নবীর সামনে দাঁড়াব। আমরা যখন সুন্নতের অবজ্ঞা করি এবং ইহুদি-খ্রিস্টানদের জীবনধারাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি, তখন শাফায়াত বা সুপারিশের আশা করা কতটুকু যৌক্তিক তা চিন্তার বিষয়। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে যারা কুফরি করে বা অবাধ্য হয় তাদের আমলগুলো ধূলিকণার মতো উড়ে যাবে এবং তাদের জন্য পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি যেখানে হাত ও গলা শেকল দিয়ে বেঁধে তাদের লাঞ্ছিত করা হবে (সূরা আল-ইনসান, ৭৬:৪)। সেই দিন মানুষের দুনিয়াবি প্রতিপত্তি বা টাকা-পয়সা তাকে রক্ষা করতে পারবে না।

মানুষের অহংকার ও ধোঁকা সম্পর্কে আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন যে হে মানুষ কিসে তোমাকে তোমার মহান রব সম্পর্কে ধোঁকায় ফেলে দিল (সূরা আল-ইনফিতার, ৮২:৬)। আমরা মনে করি আমাদের সন্তানরা বা বৈষয়িক সম্পদ আমাদের উদ্ধার করবে কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে নূহ আলাইহিস সালামের নিজের সন্তানও আল্লাহর অবাধ্য হয়ে প্লাবনে ধ্বংস হয়েছিল (সূরা হুদ, ১১:৪৬)। আল্লাহর কাছে রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ঈমানি সম্পর্ক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় বাদশাহ হারুনুর রশিদের মতো শাসকও আল্লাহর কাছে ভিখারির মতো কেঁদেছেন কারণ তিনি জানতেন যে আসমানের মালিকের কাছে দুনিয়ার বাদশাহরাও নগণ্য ভিখারি মাত্র। এটিই হলো তাওহিদ এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার চূড়ান্ত নিদর্শন। আমাদের বর্তমান জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত এবং অনিশ্চিত। আজ যে হাসছে আগামীকাল হয়তো তার জানাজা প্রস্তুত হবে। তাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। তওবা ও নেক আমলের মাধ্যমে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে কারণ ঈমান ছাড়া কবরের অন্ধকার জগত এবং হাশরের কঠিন বিচার থেকে মুক্তি পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই গাফিলতি থেকে জাগ্রত হওয়ার এবং ঈমানের ওপর অটল থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!