বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২

রমজানের আসল উদ্দেশ্য: আদম (আঃ) ও হারানো জান্নাত ফিরে পাওয়ার ইতিহাস

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ০২:৪২ পিএম
রমজানের আসল উদ্দেশ্য: আদম (আঃ) ও হারানো জান্নাত ফিরে পাওয়ার ইতিহাস

জান্নাতের পথে রমজান | ছবি - AI

রমজান মাস আমাদের মাঝে প্রতি বছর ফিরে আসে এক মহান আধ্যাত্মিক বার্তা নিয়ে যা কেবল উপবাস বা পানাহার থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই মাসটি আমাদের অস্তিত্বের শিকড় এবং আমাদের আদি পিতা আদম আলাইহিস সালামের হারানো সেই জান্নাতের উত্তরাধিকার ফিরে পাওয়ার এক অনন্য সুযোগ হিসেবে গণ্য হয়। 

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারায় রমজানের সিয়াম সাধনার বিধান বর্ণনা করার ঠিক আগেই এমন একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন যা মানবজাতির ইতিহাসের সূচনালগ্ন অর্থাৎ আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টির ঘটনার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এটি মূলত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা এই পৃথিবীর স্থায়ী বাসিন্দা নই বরং আমাদের প্রকৃত ঠিকানা ছিল সেই জান্নাত যেখান থেকে আমাদের পৃথিবীতে আসা হয়েছে একটি বিশেষ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। জান্নাত মূলত আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি বা উত্তরাধিকার যা আল্লাহ মুমিনদের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। 

এই বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন: ﴿أُولَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ * الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "উলাইকা হুমুল ওয়ারিছুন। আল্লাজিনা ইয়ারিছুনাল ফিরদাউসা হুম ফীহা খালিদুন।" অর্থ: "তারাই হলো উত্তরাধিকারী, যারা ফিরদাউসের উত্তরাধিকার লাভ করবে এবং সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।" (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১০-১১)

দুনিয়াতে যেমন আমরা আমাদের পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হই ঠিক তেমনি জান্নাত হলো আমাদের আদি পিতার রেখে যাওয়া সেই আদি বাসস্থান যার প্রকৃত হকদার আমরাই ছিলাম। জান্নাতে থাকাকালীন আদম আলাইহিস সালামের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত কেবল সেখানকার সুস্বাদু ফলমূল বা আরামদায়ক অট্টালিকা ছিল না বরং এর চেয়েও বড় ও মহিমান্বিত বিষয় ছিল মহান আল্লাহর সাথে সরাসরি কথোপকথনের এক অপূর্ব সুযোগ। আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস সালামকে সরাসরি নির্দেশ দিতেন এবং তাঁর সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখতেন। 

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ এর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে: ﴿وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ওয়া কুলনা ইয়া আদামুসকুন আনতা ওয়া যাওজুকাল জান্নাতা ওয়া কুলা মিনহা রাগাদান হাইছু শি’তুমা ওয়া লা তাকরাবা হাজিহিশ শাজারাতা ফাতাকুনা মিনাজ জোয়ালিমীন।" অর্থ: "হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং যা ইচ্ছা আহার করো, কেবল এই একটি গাছের নিকটবর্তী হয়ো না, অন্যথায় তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।" (সূরা আল-বাকারা, ২:৩৫)

আল্লাহর এই সরাসরি সম্বোধন এবং পরম সান্নিধ্য ছিল জান্নাতের শ্রেষ্ঠ উপহার। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় যখন আদম আলাইহিস সালাম ভুল করে ফেললেন তখন সেই ভুলের সবচেয়ে বড় শাস্তি কেবল জান্নাত থেকে বের হয়ে যাওয়া ছিল না বরং সবচেয়ে বড় কষ্টের বিষয় ছিল আল্লাহর সাথে সেই সরাসরি ও মধুরতম কথোপকথনের সম্পর্কটি সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। আল্লাহ যখন নির্দেশ দিলেন যে তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও তখন আদম আলাইহিস সালাম কেবল একটি বাগান হারাননি বরং তিনি হারিয়েছিলেন তাঁর রবের সাথে সেই প্রত্যক্ষ সংযোগ যা ছিল তাঁর আত্মার প্রশান্তি। ফেরেশতাদের পবিত্র সাহচর্য ছেড়ে তাঁকে নেমে আসতে হলো এমন এক নশ্বর পৃথিবীতে যেখানে তাঁর সঙ্গী হলো ইবলিস এবং তার অনুসারীরা। এটি ছিল একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক শূন্যতা এবং মানসিক যন্ত্রণার বিষয়।

ইসলামিক আকিদা অনুযায়ী আদম আলাইহিস সালামের পৃথিবীতে আগমন কোনো অভিশপ্ত শাস্তি হিসেবে গণ্য হয় না বরং এটি ছিল আল্লাহর এক মহাপরিকল্পনার অংশ। খ্রিস্টান ধর্মে যে ‍‍`আদি পাপ‍‍` বা অরিজিনাল সিন এর ধারণা প্রচলিত আছে ইসলাম তা সম্পূর্ণ নাকচ করে দেয়। আল্লাহ পৃথিবীকে কোনো অভিশপ্ত জায়গা হিসেবে সৃষ্টি করেননি বরং তিনি একে সাজিয়েছেন মানুষের জন্য এক বিশাল নিয়ামত ও পরীক্ষাগার হিসেবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: ﴿وَلَقَدْ مَكَّنَّاكُمْ فِي الْأَرْضِ وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ قَلِيلاً مَا تَشْكُرُونَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ওয়া লাক্বাদ মাক্কান্নাকুম ফিল আরদ্বি ওয়া জাআলনা লাকুম ফীহা মায়াইশা কলীলাম মা তাশকুরুন।" অর্থ: "আমি তোমাদের জন্য পৃথিবীতে জীবিকার ব্যবস্থা করেছি, কিন্তু তোমরা খুব অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।" (সূরা আল-আরাফ, ৭:১০)

এই আকাশ ও বাতাস এবং পাহাড় ও নদী আর সুস্বাদু ফলমূল—সবই আল্লাহর রহমতের নিদর্শন যা আসলে জান্নাতেরই একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। আল্লাহ যদি দুনিয়াতে আমাদের এসব নিয়ামতের স্বাদ না দিতেন তবে আমরা জান্নাতের প্রকৃত মহিমা কখনোই বুঝতে পারতাম না। তবে জান্নাতের তুলনায় এই দুনিয়া অবশ্যই নিকৃষ্টতর কারণ এখানে ভয় এবং বার্ধক্য ও বিচ্ছেদের বেদনা রয়েছে। আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতের সেই নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে দুনিয়ার এই সংগ্রামমুখর জীবনে এসে নিশ্চয়ই তাঁর রবের সেই সান্নিধ্যকে ভীষণভাবে মিস করতেন। 

এই বিচ্ছেদ এবং দূরত্বের বেদনা যখন তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল তখন আল্লাহ তাঁকে এবং তাঁর অনাগত সন্তানদের এক মহান প্রতিশ্রুতি দিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন: ﴿قُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعًا فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "কুলনাহবিতু মিনহা জামীআন ফাইম্মা ইয়াতিয়ান্নাকুম মিন্নী হুদান ফামান তাবিআ হুদায়া ফালা খাউফুন আলাইহিম ওয়া লা হুম ইয়াহজানুন।" অর্থ: "আমি বললাম, তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও, অতঃপর আমার পক্ষ থেকে যখন তোমাদের কাছে হেদায়েত আসবে, তখন যারা সেই হেদায়েতের অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।" (সূরা আল-বাকারা, ২:৩৮)

এই হেদায়েতের প্রতিশ্রুতি মূলত সেই রশি যা ধরে মানুষ আবার সেই হারানো জান্নাতে ফিরে যেতে পারবে। আর এই প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত ও সর্বশ্রেষ্ঠ রূপ হলো পবিত্র কুরআন যা রমজান মাসে নাযিল করা হয়েছে। রমজান মাসের সাথে এই ইতিহাসের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় কারণ রমজান হলো সেই মাস যখন আল্লাহ তাঁর সেই ঐশ্বরিক রশিটি আকাশ থেকে দুনিয়াতে ঝুলিয়ে দিয়েছেন। হাদীসের ভাষায় কুরআন হলো আল্লাহর রশি যার এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে এবং অন্য প্রান্ত বান্দার হাতে থাকে। 

রমজান মাসে আমরা যখন কুরআন তিলাওয়াত করি তখন মূলত আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন আর আমরা যখন রোজা রেখে দোয়ার মাধ্যমে আমাদের আর্জি জানাই তখন আমরা আল্লাহর সাথে কথা বলি। এভাবে রমজান মাসে সেই হারানো কথোপকথন বা কনভারসেশন আবার পুনস্থাপিত হয়। রমজান হলো সেই পবিত্র সময় যখন একজন মুমিন আল্লাহর এত কাছে চলে আসে যা জান্নাতের সেই সান্নিধ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা রমজানের এই নৈকট্য সম্পর্কে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় ইরশাদ করেছেন: ﴿شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "শাহরু রমাদোয়ানাল্লাজি উনজিলা ফীহিল কুরআন হুদাল লিননাসি ওয়া বাইয়্যিনাতুম মিনাল হুদা ওয়াল ফুরক্বান।" অর্থ: "রমজান হলো সেই মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)

রমজান মাসে দোয়া কবুলের এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয় যা সূরা বাকারার ১৮৬ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ এখানে কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি বান্দার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। যখন মানুষ আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তখন আল্লাহ বলেন যে তিনি অত্যন্ত কাছে। তিনি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেন যখনই সে তাঁকে ডাকে। দোয়া কবুলের জন্য কোনো বিশেষ ভাষা বা ব্যাকরণের প্রয়োজন নেই বরং হৃদয়ের গভীর আবেগ দিয়ে যখন বান্দা আল্লাহকে ডাকে তখন তিনি সেই ডাক শোনেন। এমনকি শয়তান অভিশপ্ত হওয়ার পরেও আল্লাহর কাছে হায়াত চেয়েছিল এবং আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছিলেন। 

তাহলে আমরা যারা ঈমানদার তারা যত বড় গুনাহগারই হই না কেন আল্লাহ কেন আমাদের ফিরিয়ে দেবেন? শয়তানের অন্যতম বড় কাজ হলো মানুষকে নিরাশ করা কারণ ইবলিস শব্দের অর্থই হলো যে হতাশ। কিন্তু আমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালাম ভুল করার পর নিরাশ হননি বরং তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন এই বলে: ﴿قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ক্বলা রাব্বানা জোয়ালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরীন।" অর্থ: "হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি, আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।" (সূরা আল-আরাফ, ৭:২৩)

রমজান মাস হলো সেই তওবা করার এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার শ্রেষ্ঠ সময়। এই মাসে শয়তানকে শিকলবদ্ধ করে রাখা হয় যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক মেরামত করতে পারে। আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া মানে হলো কুরআনের নির্দেশনা মানার চেষ্টা করা এবং রমজানের দিনগুলোতে কুরআনকে আঁকড়ে ধরা। কারণ কুরআনই সেই সিঁড়ি যা বেয়ে আমরা আমাদের হারানো জান্নাতে ফিরে যেতে পারব। এই দুনিয়া কেবল একটি ট্রানজিট বা পরীক্ষার হল এবং মুমিনের প্রকৃত সফলতা হলো জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে জান্নাতের উত্তরাধিকারী হওয়া। তাই আসুন আমরা এই রমজানকে কেবল প্রথাগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করি। আমাদের চোখের পানি এবং আমাদের সিজদা যেন আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আল্লাহ আমাদের সকলকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!