বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২

সব হারানোর পর সবর ও ইমান: শোক কাটিয়ে ওঠার পরম পাথেয়

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
সব হারানোর পর সবর ও ইমান: শোক কাটিয়ে ওঠার পরম পাথেয়

সবর ও ইমানেই মুক্তি /Ai

মানুষের জীবন এক অদ্ভুত অস্থিরতার নাম যেখানে প্রাপ্তি আর হারানোর খেলা চলে নিরন্তর। কোনো এক মুহূর্তের প্রচণ্ড ঝড় হয়তো মানুষের সাজানো বাগান তছনছ করে দেয় আর সে দাঁড়িয়ে থাকে এক চরম শূন্যতার কিনারে। এই শূন্যতা যখন মানুষকে গ্রাস করে তখন সে এমন কিছু হারিয়ে ফেলে যা ছাড়া বেঁচে থাকা তার কাছে এক সময় ছিল অকল্পনীয়। সেই প্রিয় বস্তু সেই গভীর সম্পর্ক বা সেই লালিত স্বপ্ন যখন ধূলিসাৎ হয়ে যায় তখন মানুষের অন্তরে যে হাহাকার তৈরি হয় তার কোনো পার্থিব সমাধান থাকে না। এই চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে পড়ে তখন তার সামনে কেবল দুটি পথ খোলা থাকে—হয় সে হতাশার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে অথবা সে তার স্রষ্টার দিকে ফিরে আসবে। ইসলামের সুমহান শিক্ষা আমাদের শেখায় যে জীবনের এই প্রতিটি কঠিন পরীক্ষা মূলত বান্দার ইমান ও সবরের এক মহৎ পরীক্ষা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর পবিত্র কালামে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে যারা বিপদে পতিত হলে বলে আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবে আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী কেবল তাদের ওপরই রবের পক্ষ থেকে আশীর্বাদ ও রহমত বর্ষিত হয় (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৬-১৫৭)। এই যে আত্মসমর্পণের বাণী এটি কেবল কতগুলো শব্দের সমষ্টি নয় বরং এটি মুমিনের হৃদয়ের এক পরম প্রশান্তি যা তাকে প্রতিকূল সময়েও অটল থাকতে সাহায্য করে।

দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী বস্তুর ওপর নির্ভরতা মানুষকে প্রায়ই প্রতারিত করে কারণ এ জগতের সবকিছুই নশ্বর। মানুষ যখন কোনো বস্তু বা ব্যক্তির ওপর নিজের জীবনের অস্তিত্বের ভিত্তি স্থাপন করে তখন সেই ভিত্তি নড়ে উঠলে মানুষের জগতও ভেঙে পড়ে। কিন্তু মুমিনের প্রকৃত আশ্রয় হলো সেই অবিনশ্বর সত্তা যিনি চিরঞ্জীব। যখন মানুষ অনুভব করে যে তার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস এবং তার অস্তিত্বের প্রতিটি স্পন্দন মহান আল্লাহর ইশারায় চলছে তখন হারানো শোক তাকে আর বিচলিত করতে পারে না। সব হারানো এক মুমিন যখন তার একাকীত্বকে ইবাদতে পরিণত করে তখন সেই ক্ষতিই তার জন্য রবের নৈকট্য লাভের সিঁড়ি হয়ে দাঁড়ায়। ইমানের এই স্থিরতা লাভের জন্য প্রয়োজন অন্তরের গভীর থেকে আল্লাহকে ডাকা। সিজদাই হলো সেই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম যার মাধ্যমে বান্দা তার রবের সবচেয়ে কাছে পৌঁছাতে পারে। সিজদারত অবস্থায় মানুষ যখন তার সমস্ত অহংকার ও পাপ মাটিতে লুটিয়ে দেয় এবং নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে তখন তার আর আল্লাহর মাঝখানের সমস্ত পর্দা সরে যায়। এই সিজদাই মানুষের জন্য নেকির পাহাড় গড়ে তোলে এবং আখেরাতের কঠিন সফরকে সহজ করে দেয়।

বিপদে ধৈর্য ধারণ করা বা সবর করা মানে এই নয় যে মানুষ তার অনুভূতি প্রকাশ করবে না বা কাঁদবে না বরং সবর হলো আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং কোনো অবস্থাতেই অভিযোগ না করা। হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের জীবনী আমাদের জন্য এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি তার দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা এবং পরিবার ও সম্পদ হারানোর চরম মুহূর্তেও আল্লাহর প্রতি কোনো অভিযোগ করেননি বরং পরম বিনয়ের সাথে কেবল নিজের কষ্টের কথা আরজি জানিয়েছিলেন। মুমিনের প্রতিটি নিঃশ্বাস যখন আল্লাহর জিকিরের সাথে বের হয় তখন তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে। এই নিরবচ্ছিন্ন জিকিরই প্রমাণ করে যে আল্লাহ সর্বদা তার পাশে আছেন। শয়তান যখন মানুষকে হতাশাগ্রস্ত করতে চায় তখন এই জিকিরের সুরই তাকে সান্ত্বনা দেয় এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে। বিশেষ করে যখন কোনো মানুষ তার পরিবারের কাছেও বোঝা হয়ে যায় তখনও আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা কমে না বরং তাঁর রহমতের দরজা সব সময় খোলা থাকে।

একজন প্রকৃত মুসলমানের পরিচয় হলো সে বিপদে ধৈর্যহারা হয় না এবং হারামের দিকে পা বাড়ায় না। দুনিয়াতে হয়তো অনেকে অনেক কিছু অর্জন করে সুখী হওয়ার ভান করে কিন্তু প্রকৃত সুখ কেবল আল্লাহর জিকিরেই নিহিত। আমরা যখন ভাবি যে আমাদের এই অন্তরটা আল্লাহর জিকির ছাড়া মরে যাচ্ছে তখন সেই উপলব্ধি আমাদের তওবা করতে বাধ্য করে। আমাদের প্রতিটি চোখের জল যা আল্লাহর ভয়ে বা তাঁর ওপর ভরসা করে ঝরে পড়ে তা আমাদের পাপের কাফফারা হিসেবে কাজ করে। এই যে গুনাহ ঝরা জিকির এটিই আমাদের আমলনামাকে পরিষ্কার করে এবং আমাদের নফসের ওপর আঘাত হানে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেহেতু আল্লাহর আমানত তাই এই সময়টুকু আল্লাহর জিকিরে ব্যয় করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মুমিন বিশ্বাস করে যে এই দুনিয়াই শেষ নয় বরং আসল জীবন হলো আখেরাত। দুনিয়াতে হারানো প্রতিটি জিনিসের প্রতিদান আল্লাহ আখেরাতে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন যদি বান্দা সবরের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।

সব হারানোর পর যে শূন্যতা সৃষ্টি হয় তা কেবল আল্লাহর ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করা সম্ভব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন যে আল্লাহ যখন তাঁর বান্দাকে ভালোবাসেন তখন তাকে পরীক্ষা করেন। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় এসেছে যে আল্লাহ তায়ালা বলেন তাঁর বান্দা যদি তাঁর প্রতি এক বিঘত অগ্রসর হয় তবে তিনি তার প্রতি এক হাত অগ্রসর হন (সহীহ আল-বুখারী, ৭৫৩৬)। এই যে রবের দ্রুত ধাবিত হওয়া এটিই মুমিনের সবচেয়ে বড় আশা। জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত ইমানের ওপর অটল থাকা এবং রবের জিকিরে মশগুল থাকাই হলো চূড়ান্ত সফলতা। আমাদের মনে রাখা উচিত যে দুনিয়ার কোনো ক্ষতিই চূড়ান্ত নয় যদি না আমরা আমাদের ইমান হারাই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের কঠিন পরীক্ষায় সবর ও ইমানের ওপর স্থির থাকার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের প্রতিটি ক্ষতিকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদায় রূপান্তরিত করুন। আমীন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

মোটিভেশন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!