বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২

দুনিয়ার মোহ ও চরিত্রহীনতা: পতনোন্মুখ যুবসমাজ ও মুক্তির পথ

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম
দুনিয়ার মোহ ও চরিত্রহীনতা: পতনোন্মুখ যুবসমাজ ও মুক্তির পথ

দুনিয়ার মোহ ও মুক্তির পথ / Ai

বর্তমান সময়ে দুনিয়ার লোভ ও সম্পদ বাড়ানোর এক বিরামহীন প্রতিযোগিতা মানুষকে অক্টোপাসের মতো গ্রাস করে ফেলেছে। আরো গাড়ি, আরো বাড়ি, আরো অট্টালিকা এবং আরো স্থাবর সম্পত্তির এক নিরন্তর হাহাকার মানুষকে অন্ধ করে রেখেছে। কেবল সম্পদ নয়, বরং নেতৃত্ব এবং সামাজিক প্রতিপত্তি নিয়ে দম্ভ আজ আমাদের সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন। তিনি বলেছেন যে এই প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে আখেরাত ভুলিয়ে রেখেছে যতক্ষণ না তোমরা কবরের বাসিন্দা হও (সূরা আত-তাকাসুর, ১০২:১-২)। দুনিয়ার এই মায়া মানুষকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে সে জীবনের চূড়ান্ত সত্য মৃত্যুকে বেমালুম ভুলে যায়।

 অথচ হঠাৎ করেই একদিন তাকে কবরের সেই অন্ধকার জগতে পাড়ি দিতে হয়। আল্লাহ সতর্ক করে দিয়েছেন যে কবরে প্রবেশমাত্রই মানুষ তার নাফরমানির প্রকৃত রূপ বুঝতে পারবে। হাশরের ময়দানে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি দেখার পর পাপিষ্ঠরা তাদের কৃতকর্মের জন্য আফসোস করবে কিন্তু সেদিন আর ফেরার কোনো পথ থাকবে না। মানুষ আজ তুচ্ছ জাগতিক স্বার্থের জন্য তার স্রষ্টাকে ভুলে যাচ্ছে। সামান্য কিছু কেনাবেচা বা জীবিকার সামান্য ব্যস্ততায় মানুষ ওয়াক্তের পর ওয়াক্ত নামাজ ছেড়ে দিচ্ছে। যেই রব মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিনিয়ত রিজিক দান করছেন, সেই রবের সামনে একটি সিজদা দেওয়ার সময় আজ আমাদের হচ্ছে না। সামান্য চাকরির মায়া বা নগণ্য ব্যবসার জন্য মানুষ অনন্তকালের আখেরাতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

আমাদের সমাজের যুবসমাজের দিকে তাকালে আজ এক করুণ চিত্র ভেসে ওঠে। হাতে একটি দামি স্মার্টফোন পাওয়ার পর যুবকরা আজ তাদের চরিত্র, ইজ্জত ও বংশের সম্মান বিসর্জন দিচ্ছে। এই ডিজিটাল যন্ত্রের নেশায় পড়ে তারা রাসূলের সুন্নাহ এবং কবর-হাশরের কথা চিরতরে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলেছে। দিন-রাত মোবাইলের স্ক্রিনে ডুবে থেকে তারা অশ্লীলতার পঙ্কে নিজেদের জীবন ও যৌবনকে বিলীন করছে। বারো-চৌদ্দ বছরের একটি কিশোর যখন অপসংস্কৃতিতে ডুবে থাকে তখন সেই প্রজন্মের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়।

 অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানদের নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা। যে সন্তান নামাজ পড়ে না বা কুরআন তিলাওয়াত করে না, তার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই বিপন্ন। একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের দুটি মৌলিক দায়িত্ব রয়েছে যা হলো গুনাহ বর্জন করা এবং আল্লাহর হুকুম পালন করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আজ আমরা ইসলামকে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী মানার চেষ্টা করছি। অথচ ঈমানের দাবি হলো সকল ক্লান্তি উপেক্ষা করে নামাজ আদায় করা এবং সকল প্রলোভন ত্যাগ করে হারাম উপার্জন বর্জন করা। অন্যের অঢেল সম্পদ দেখে হীনম্মন্যতায় না ভুগে রবের সন্তুষ্টির ওপর অটল থাকাই হলো প্রকৃত তাকওয়া।

প্রকৃত মুত্তাকি হতে হলে নিজেকে গুনাহ থেকে সরিয়ে রাখা এবং রবের হুকুম পালনে অবিচল থাকা প্রয়োজন। একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ হারামে লিপ্ত হলেও তাকে আল্লাহর সামনে হিসাব দিতে হবে। একজন স্বল্প বেতনের মাদ্রাসা শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম যখন অভাবের মাঝেও হারামের দিকে পা বাড়ান না তখন তিনি আসলে আখেরাতের আশায় বুক বাঁধেন। মুমিন জানে যে দুনিয়ার এই জীবন কেবল একটি স্বল্পকালীন সফর এবং আসল জীবন হলো আখেরাত। ত্রিশ-চল্লিশ বছর ওয়াজ শুনেও যদি কারো চরিত্রে পরিবর্তন না আসে তবে তার জীবন ব্যর্থ।

 হেদায়েতের জন্য কুরআনকে আঁকড়ে ধরা ছাড়া আর কোনো পথ নেই কারণ আল্লাহ কুরআনকে মুত্তাকিদের পথপ্রদর্শক হিসেবে নাজিল করেছেন (সূরা আল-বাকারা, ২:২)। কুরআন হলো রহমত ও সবকিছুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা। পৃথিবী যে আজও টিকে আছে তা আল্লাহর জিকিরের কারণে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে যতক্ষণ পৃথিবীতে আল্লাহ আল্লাহ বলার মতো একজন লোকও থাকবে ততক্ষণ কেয়ামত হবে না (সহীহ মুসলিম, ১৪৮)। যার অন্তরে কুরআনের আলো নেই সে যেন এক বিরান ঘর যেখানে কেবল পশুবৃত্তি ও অন্ধকার বিরাজ করে (সুনানে তিরমিজি, ২৯১৩)।

বর্তমানে অশ্লীলতা এক মরণব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে যা যুবকদের চোখের জিনা ও অন্তরের জিনায় লিপ্ত করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্তক করেছেন যে চোখের জিনা হলো দেখা এবং কানের জিনা হলো শোনা যা পরিশেষে মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় (সহীহ বুখারি, ৬২৪৩)। আল্লাহ কেবল জিনা নয় বরং জিনার কাছে যেতেও নিষেধ করেছেন (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩২)। শিরক এবং হত্যার পর জিনা হলো অন্যতম বড় অপরাধ যার জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৮-৬৯)। তবে আল্লাহর দয়া অপরিসীম। 

তিনি বলেছেন যে যারা তওবা করে এবং নেক আমল করে তিনি তাদের পাপগুলোকে নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭০)। মালিক তাঁর বান্দাকে শাস্তি দিতে চান না বরং তিনি চান বান্দা তওবা করে ফিরে আসুক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তওবার দরজা খোলা থাকে (সুনানে তিরমিজি, ৩৫৩৭)। উম্মত হিসেবে আমাদের মনে রাখা উচিত যে নবীজি আমাদের জন্য কত কষ্ট সহ্য করেছেন। তিনি উম্মতের ক্ষমার জন্য সারা রাত দাঁড়িয়ে কাঁদতেন যতক্ষণ না তাঁর পা মোবারক ফুলে যেত (সহীহ বুখারি, ৪৮৩৭)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সৃষ্টির সেরা সুন্দর। আল্লাহ তাআলা ইউসুফ আলাইহিস সালামকে অর্ধেক সৌন্দর্য দিলেও আমাদের নবীজিকে দিয়েছিলেন পূর্ণাঙ্গ সৌন্দর্য (সহীহ মুসলিম, ১৬২)। তাঁর সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের আদর্শ ছেড়ে আজ আমরা ইহুদি-খ্রিস্টানদের সংস্কৃতিতে মত্ত হয়েছি। ষাট বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পরও যারা হারামের রোজগার বা পাপাচার ছাড়তে পারেননি তাদের জন্য এটিই শেষ সুযোগ। কবরে যখন ফেরেশতারা লোহার মুগুর দিয়ে আঘাত করবে তখন সেই চিৎকার পুরো পৃথিবী শুনতে পাবে কেবল মানুষ ও জিন ছাড়া (সহীহ বুখারি, ১৩৩৮)। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে আমাদের আজই খাঁটি তওবা করা উচিত। আমাদের নিঃশ্বাস ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই রবের দিকে ফিরে আসতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নবীর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়ার এবং আখেরাতের পরম সফলতা অর্জন করার তৌফিক দান করুন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!