মৃত্যু জীবনের এমন এক অমোঘ সত্য যা প্রতিটি প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে এবং এই অমোঘ বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মুমিন জীবনের সার্থকতা নির্ভর করে তার শেষ পরিণতির ওপর এবং একজন মুমিন সর্বদা আল্লাহর কাছে একটি সুন্দর সমাপ্তি বা হুসনুল খাতিমাহ প্রার্থনা করে থাকে। বিশেষ করে যখন বরকতময় রমজান মাস আমাদের মাঝে উপস্থিত হয় এবং আমরা কোনো প্রিয়জনের বিদায়ের সংবাদ শুনি তখন আমাদের হৃদয়ে একই সাথে শোক এবং এক ধরণের আধ্যাত্মিক আশার সঞ্চার হয়। রমজান মাস আল্লাহর রহমত মাগফিরাত এবং নাজাতের মাস হিসেবে পরিচিত হওয়ায় এই সময়ে মৃত্যুবরণ করাকে মুসলিম সমাজে অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে এই অনুভূতির শরয়ী ভিত্তি এবং এর গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করা আমাদের জন্য জরুরি যাতে আমরা সঠিক আকিদা ও আমলের পথে অবিচল থাকতে পারি।
ইসলামিক আকিদা অনুযায়ী জান্নাত বা জাহান্নামের চূড়ান্ত ফয়সালা করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একমাত্র মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার। কোনো নির্দিষ্ট সময় বা স্থানে মৃত্যু হওয়া মানেই জান্নাতের কোনো আনুষ্ঠানিক গ্যারান্টি নয় বরং এটি একটি শুভ লক্ষণ যা মৃত ব্যক্তির প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের ইঙ্গিত প্রদান করে। জান্নাত লাভের মূল ভিত্তি হলো শিরকমুক্ত বিশুদ্ধ ঈমান এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী নেক আমল। তবে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ স্বরূপ এমন কিছু সময় ও পরিবেশ নির্ধারণ করে দেন যা বান্দার মাগফিরাত লাভের পথকে সহজতর করে তোলে। রমজান মাস ঠিক তেমনি এক বিশেষ সময় যখন আল্লাহর রহমতের বারিধারা অবিরাম বর্ষিত হতে থাকে এবং পাপিষ্ঠ বান্দারাও তাঁর ক্ষমার চাদরে আশ্রয় খুঁজে পায়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের জন্য সুসংবাদ প্রদান করেছেন যা আমাদের জীবনের কঠিনতম সময়ে বিশেষ করে মৃত্যুর সময় ধৈর্য ধারণের প্রেরণা যোগায়।
﴿وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: ওয়া বাশশিরিস সাবিরীন। অর্থ: আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)
এই আয়াতের মর্মবাণী আমাদের শিখিয়ে দেয় যে মুমিন তার জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় আল্লাহর ওপর আস্থাশীল থাকে এবং মৃত্যু যখন তাকে গ্রাস করে তখন সে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করে। রমজান মাসে যখন একজন মুমিন সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আল্লাহর আনুগত্যে নিমগ্ন থাকে তখন তার এই কৃচ্ছ্রসাধন তাকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে দেয়। এই অবস্থায় মৃত্যু আসা মানে হলো এক পবিত্র অবস্থায় মালিকের সাথে সাক্ষাৎ করা।
সহীহ বুখারীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে যখন রমজান মাস প্রবেশ করে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় আর শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। এই হাদিসটি রমজানে মৃত্যুবরণ করার ফজিলত সম্পর্কে আমাদের গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। জান্নাতের দরজাগুলো উন্মুক্ত থাকার অর্থ হলো এই পবিত্র মাসে আল্লাহর রহমতের প্রবাহ অবারিত থাকে এবং তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রাপ্তি সহজ হয়। যে ব্যক্তি এমন এক সময়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন যখন জাহান্নামের আগুন তার মুমিন বান্দাদের জন্য রুদ্ধ রাখা হয়েছে তার জন্য আমরা আল্লাহর কাছে মাগফিরাত ও উচ্চ মাকামের আশা করতেই পারি। শয়তান শৃঙ্খলিত থাকার কারণে মৃত্যুর সেই কঠিন মুহূর্তে যখন শয়তান মানুষের ঈমান হরণ করার চূড়ান্ত চেষ্টা চালায় তখন রমজানের বরকতে মুমিন ব্যক্তি সেই প্ররোচনা থেকে রক্ষা পাওয়ার বিশেষ সুযোগ পায়।
রমজানে মৃত্যুর আরেকটি বিশেষ দিক হলো আমলরত অবস্থায় মৃত্যু বা হুসনুল খাতিমাহ। একজন মুমিন রমজান মাসে সাধারণত রোজা রাখা কোরআন তেলাওয়াত করা বা দান-সদকা করার মতো শ্রেষ্ঠ আমলগুলোর মধ্যে অতিবাহিত করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসনাদে আহমাদের একটি বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে যদি কোনো ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে তার জীবন শেষ করে তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন রোজা রাখে এবং সেটাই তার জীবনের শেষ দিন হয় তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। একইভাবে সদকা করা অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির জন্যও জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। যেহেতু রমজান মাসে মুমিন ব্যক্তি অধিকাংশ সময় রোজাদার থাকেন অথবা সালাত ও জিকিরে মশগুল থাকেন তাই তার এই অবস্থায় ইন্তেকাল করা আল্লাহর কাছে কবুলিয়তের এক শক্তিশালী নিদর্শন।
জামে আত-তিরমিযীর একটি সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান তখন তাকে কোনো ভালো কাজের জন্য ব্যবহার করেন। সাহাবায়ে কেরাম যখন এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন যে মৃত্যুর আগে আল্লাহ তাকে নেক আমলের তৌফিক দেন এবং সেই আমল করা অবস্থাতেই তার জান কবজ করা হয়। রমজান মাস হলো নেক আমলের বসন্তকাল এবং এই সময়ে একজন মুমিন তার আত্মিক উন্নতির শিখরে অবস্থান করে। সুতরাং এই মাসে মৃত্যুবরণ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই বিশেষ তৌফিক প্রাপ্তিরই একটি বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষের সারা জীবনের সাধনা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং রমজানের পবিত্রতা ও রোজার কষ্ট সহ্য করার পর যখন সে আল্লাহর সান্নিধ্যে ফিরে যায় তখন তার সেই সফরটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে রমজানে মৃত্যুই সব নয় বরং ঈমান ও আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক। আবু লাহাবের মতো ব্যক্তিরা পবিত্র মক্কায় বসবাস করেও ধ্বংস হয়েছে আবার ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়া আলাইহিস সালাম জালিমের ঘরে থেকেও জান্নাতি হয়েছেন। স্থান বা সময় তখনই বরকতময় হয় যখন মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া বিদ্যমান থাকে। রমজানে যারা রোজা রাখেন না বা ইবাদত বন্দেগি থেকে দূরে থাকেন তাদের জন্য কেবল সময়ের দোহাই দিয়ে মুক্তি পাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। রমজানের প্রকৃত শিক্ষা হলো তাকওয়া অর্জন করা এবং সেই তাকওয়া নিয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়া। যারা সারাজীবন আল্লাহর হুকুম পালনে সচেষ্ট ছিলেন এবং রমজানের পবিত্রতাকে রক্ষা করেছেন তাদের জন্য এই মৃত্যু নিশ্চিতভাবেই এক মহান উপহার।
পরিশেষে বলা যায় যে রমজান মাসে মৃত্যুবরণ করা একজন মুমিনের জন্য কেবল একটি কাকতালীয় ঘটনা নয় বরং এটি তার সারা জীবনের ইবাদত ও ভালোবাসার এক স্বর্গীয় প্রতিদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি জীবিতদের জন্য যেমন একটি সান্ত্বনা ঠিক তেমনি মৃত ব্যক্তির জন্য মহান আল্লাহর অসীম দয়া ও ক্ষমার এক বিশাল আশা। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো তাঁর প্রিয় ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করার তৌফিক দান করেন এবং আমাদের প্রত্যেককে রমজানের বরকত ও নাজাতের অংশীদার হওয়ার তৌফিক দেন। আমাদের শেষ নিঃশ্বাস যেন কালিমা তায়্যিবাহর সাথে এবং সিজদাবনত অবস্থায় নির্গত হয় সেই কামনাই করি। আমিন।

আপনার মতামত লিখুন :