বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২

নিজের প্রতি ঘৃণা নয় বরং আল্লাহর ক্ষমার ওপর ভরসা রাখুন

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১১:৩৯ এএম
নিজের প্রতি ঘৃণা নয় বরং আল্লাহর ক্ষমার ওপর ভরসা রাখুন

মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন সে নিজের করা ভুলের পাহাড় দেখে নিজেই নিজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে যখন ঘৃণার উদ্রেক হয় তখন বুঝতে হবে সেই ব্যক্তিটি মানসিকভাবে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই ঘৃণা বা নিজের প্রতি তীব্র ক্ষোভ থেকে এক সময় জন্ম নেয় চরম হতাশা। আর এই হতাশাই মানুষকে আত্মবিধ্বংসী করে তোলে। 

যখন কোনো মানুষ মনে করে যে তার ক্ষমা পাওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই তখনই সে জেনে বুঝে নিজেকে আরও বড় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। অথচ ইসলামের চিরন্তন শিক্ষা আমাদের এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরার নির্দেশ দেয়। আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের অপরাধ বা পাপের পাল্লা যতই ভারী হোক না কেন মহান আল্লাহর দয়ার সাগর তার চেয়ে বহুগুণ বড় এবং প্রশস্ত।

পবিত্র কুরআনের অত্যন্ত চমৎকার একটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের এই হতাশাজনক অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ বাতলে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলছেন: ﴿قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "কুল ইয়া ইবাদিয়াল্লাযিনা আসরাফূ আলা আনফুসিহিম লা তাকনাতূ মির রাহমাতিল্লাহ; ইন্নাল্লাহা ইয়াগফিরুয যুনূবা জামীআ; ইন্নাহূ হুওয়াল গাফূরুর রাহীম।" অর্থ: "বলো, ‘হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।" (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩)

এই আয়াতটির দিকে গভীর মনোযোগ দিলে দেখা যায় আল্লাহ আমাদের অপরাধী বা পাপী বলে সম্বোধন না করে নিজের বান্দা হিসেবে ডেকেছেন। এটি এক গভীর মমত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। নিজের আত্মার ওপর জুলুম করার অর্থ হলো আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করা। কিন্তু সেই সীমানা অতিক্রম করার পরেও আল্লাহ আমাদের ফেরার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। হতাশা বা নিরাশা ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য নয় কারণ নিরাশ হওয়া মানে হলো আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও তার দয়ার ওপর অবিশ্বাস করা। শয়তানের প্রধান কৌশল হলো মানুষকে তার পাপের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তাকে এই বিশ্বাসে উপনীত করা যে সে জান্নাতের অযোগ্য। অথচ জান্নাত কোনো নিখুঁত মানুষের জন্য নয় বরং জান্নাত হলো সেই সব মানুষের জন্য যারা ভুল করার পর আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এক শত খুনি ব্যক্তির যে ঘটনা শুনিয়েছেন তা আমাদের তওবার গভীরতা বুঝতে সাহায্য করে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে পূর্ববর্তী কোনো এক যুগে এক ব্যক্তি নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করার পর তওবা করতে চাইল। সে একজন ধর্মযাজককে জিজ্ঞেস করলে সে তাকে নিরাশ করে দেয় যার ফলে সে সেই যাজককেও হত্যা করে শত খুনের পূর্ণতা দেয়। তবুও তার অন্তরের তওবার তৃষ্ণা মেটেনি। পরবর্তীতে একজন প্রকৃত আলেমের পরামর্শে সে যখন আল্লাহর দিকে হিজরত করছিল তখনই তার মৃত্যু হয়। তার রুহ নিয়ে ফেরেশতাদের মাঝে বিবাদ শুরু হলে আল্লাহ তাআলা বিচার করে তাকে ক্ষমা করে দেন কারণ তার অন্তরে তওবার সত্যতা ছিল। সহীহ আল-বুখারীর ৩৪৭০ এবং সহীহ মুসলিমের ২৭৬৬ নম্বর হাদীসে বর্ণিত এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে আল্লাহর রহমতের দরজা কখনোই বন্ধ হয় না।

মানুষ যখন নিজেকে ধ্বংস করতে চায় তখন সে আসলে শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়। শয়তান নিজে যেহেতু জান্নাত থেকে বিতাড়িত তাই সে চায় প্রতিটি আদম সন্তানকেও তার সঙ্গী করতে। এই ধোঁকা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। জান্নাত হলো মানুষের আসল ঘর যেখানে আমাদের আদি পিতা আদম আলাইহিস সালাম বাস করতেন। দুনিয়া কেবল একটি অস্থায়ী সরাইখানা মাত্র। আমাদের জীবনের প্রতিটি ভুল আমাদের জন্য একটি শিক্ষা হতে পারে যদি আমরা তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আল্লাহর সিজদায় অবনত হই। জান্নাতের সেই নেয়ামতের কথা স্মরণ করা উচিত যা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে জান্নাতে এমন সব নেয়ামত আছে যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি, কোনো কান কখনো শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তর কখনো কল্পনাও করতে পারেনি (সহীহ আল-বুখারী, ৩২৪৪)।

পরিশেষে তওবার গুরুত্ব বোঝাতে সুনানে তিরমিযীর একটি হাদীসে কুদসীর কথা উল্লেখ করা যায়। সেখানে আল্লাহ বলছেন যে বান্দার পাপ যদি আকাশের মেঘমালা পর্যন্তও পৌঁছে যায় তবুও বান্দা যদি ক্ষমা চায় তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তিনি কোনো পরোয়া করেন না (সুনানে তিরমিযী, ৩৫৪০)। তাই নিজের জীবনের অন্ধকার অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে না থেকে এই মুহূর্তেই তওবা করে নতুন জীবনের দিকে যাত্রা শুরু করা উচিত। জান্নাত আপনার জন্য অপেক্ষা করছে কেবল আপনার একটি আন্তরিক সিজদা এবং ফিরে আসার দৃঢ় সংকল্পের অপেক্ষায়। হতাশার চাদর ছিঁড়ে ফেলে আল্লাহর রহমতের আলোয় নিজেকে সিক্ত করাই হলো সফলতার একমাত্র পথ।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

মোটিভেশন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!