বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২

বিয়ের আগে অবৈধ প্রেম ও জিনা: কুরআনের সতর্কবার্তা ও বাঁচার উপায়

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১১:২১ এএম
বিয়ের আগে অবৈধ প্রেম ও জিনা: কুরআনের সতর্কবার্তা ও বাঁচার উপায়

পবিত্রতা ও নৈতিকতার জয় / Ai

মানুষের জীবনের বসন্ত যখন শুরু হয় তখন আবেগ ও অনুভূতির তীব্রতা অনেক সময় বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। বিশেষ করে বারো বা চৌদ্দ বছর বয়সের কিশোর-কিশোরীরা যখন জীবনের নতুন ধাপে পা রাখে তখন তাদের চারপাশের পরিবেশ ও অপসংস্কৃতির প্রভাবে তারা সহজেই বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বর্তমানে আমাদের সমাজে অবৈধ সম্পর্কের কারণে হাজারো পারিবারিক ট্র্যাজেডি ঘটে চলেছে যা কেবল ব্যক্তিগত জীবন নয় বরং পুরো সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দেওয়া বা আবেগের বশবর্তী হয়ে বারবার সম্পর্কে জড়ানো শেষ পর্যন্ত কেবল হাহাকার ও অনুশোচনাই বয়ে আনে। ইসলাম এই অবক্ষয় রোধে অত্যন্ত কঠোর ও বাস্তবসম্মত নির্দেশনা প্রদান করেছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে আশরাফুল মখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করে বিশেষ সম্মান দান করেছেন (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৭০)। এই সম্মানের দাবি হলো মানুষ নিজের নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং নিজেকে সস্তা বিনোদনের পণ্যে পরিণত করবে না। বিশেষ করে নারীদের মর্যাদা ইসলামে অত্যন্ত উঁচুতে রাখা হয়েছে এবং তাদের ইজ্জত ও লজ্জাস্থান হিফাজত করা জান্নাত লাভের অন্যতম চাবিকাঠি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে আজ অনেকেই সেই রাজকীয় সম্মান ভুলে গিয়ে নিজেদের সম্ভ্রমকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

একজন মুমিন নারীর মর্যাদা আল্লাহর কাছে এত বেশি যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে নেককার স্ত্রীকে অভিহিত করেছেন (সহীহ মুসলিম, ১৪৬৭)। অথচ আজ সামান্য মোহের বশবর্তী হয়ে অনেকে নিজের এবং পরিবারের সম্মান জাহান্নামের আগুনের মতো পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। যুবক ভাইদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য কারণ তারা যখন কোনো নারীর দিকে কুদৃষ্টি দেয় তখন তারা ভুলে যায় যে ওই নারীও কারো না কারো বোন বা কন্যা। কোনো নারীর সম্ভ্রমহানি করা এমন এক অপূরণীয় ক্ষতি যা কোনো পার্থিব সম্পদ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। ইসলামে জিনা বা ব্যভিচারকে কেবল একটি পাপ হিসেবেই দেখা হয় না বরং একে অত্যন্ত জঘন্য এক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন যে তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না কারণ এটি অত্যন্ত অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩২)। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো আল্লাহ কেবল জিনা করতে নিষেধ করেননি বরং জিনার দিকে নিয়ে যায় এমন প্রতিটি কাজ যেমন কুদৃষ্টি, অবৈধ স্পর্শ ও নির্জনে সাক্ষাৎকেও হারাম করেছেন। পরনারীকে স্পর্শ করার ভয়াবহতা সম্পর্কে হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে মাথায় লোহার সুঁই গেঁথে দেওয়াও পরনারীকে স্পর্শ করার চেয়ে কম যন্ত্রণাদায়ক (তাবারানী, মুজামুল কাবীর, ৪৮৬)।

আজকের যুবসমাজ প্রায়ই শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে মনে করে যে তারা তাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কিন্তু এটি শয়তানের অন্যতম বড় ধোঁকা। মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি তাকে সব সময় মন্দের দিকেই ধাবিত করে যদি না আল্লাহর রহমত থাকে। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের পবিত্র জীবনী থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই যে যখন মিশরের আজিজের স্ত্রী তাকে পাপের দিকে আহ্বান জানিয়েছিল তখন তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছিলেন। এত বড় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও তিনি বিনয়ের সাথে বলেছিলেন যে তিনি তার নফসকে নির্দোষ মনে করেন না কারণ নফস সব সময় খারাপ কাজের নির্দেশ দেয় (সূরা ইউসুফ, ১২:৫৩)। একজন নবীর যদি নিজের নফসের ওপর এমন সতর্কতা থাকে তবে আজকের সাধারণ যুবক-যুবতীদের উচিত আরও বেশি সতর্ক থাকা। নফসে আম্মারা বা পাপাসক্ত মন মানুষকে প্রতিনিয়ত ফিতনার দিকে ঠেলে দেয়। তাই নিজেকে ইউসুফ আলাইহিস সালামের চেয়ে বেশি শক্তিশালী মনে করা হবে চরম বোকামি। প্রকৃত সফলতা হলো নিজের নফসকে পবিত্র রাখা যা নিয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে শপথ করেছেন (সূরা আশ-শামস, ৯১:৭-১০)। যে নিজেকে শুদ্ধ করল সেই সফলকাম আর যে কলুষিত করল সে ব্যর্থ।

বিয়ের আগে তথাকথিত প্রেমের নামে যারা নিজেদের যৌবনকে কলুষিত করছে তারা আসলে নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে পুরুষ বিয়ের আগে কোনো নারীকে ভোগ করতে চায় সে তাকে ভালোবাসে না বরং সে তার ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চায়। প্রকৃত মুমিন আল্লাহকে ভয় করে এবং বিয়ের আগে কোনো নারীর দিকে কুদৃষ্টি দেয় না বরং সে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে। আল্লাহ যা হালাল করেছেন তার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত শান্তি ও বরকত। আজ যারা সোশ্যাল মিডিয়া বা ইন্টারনেটের অপব্যবহার করে হারাম সম্পর্কে জড়াচ্ছে তাদের মনে রাখা উচিত যে একদিন তাদের প্রতিটি অঙ্গ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ মানুষের মুখে মোহর মেরে দেবেন এবং তাদের হাত ও পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে (সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৬৫)। সুতরাং সময় থাকতে ফিরে আসা এবং তওবা করে আল্লাহর পথে চলা জরুরি। যারা নিজেদের যৌবনকালকে আল্লাহর ইবাদতে ও পবিত্রতার সাথে অতিবাহিত করবে কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে তারা আল্লাহর আরশের নিচে মায়াভরা ছায়া পাবে (সহীহ বুখারী, ৬৬০)।

মৃত্যু কোনো বয়সের তোয়াক্কা করে না এবং মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় অত্যন্ত নিকটবর্তী (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১)। অনেক শক্তিশালী যুবককেও আমরা দেখেছি যারা হঠাৎ করেই কবরের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। তাই এই উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে রবের দিকে ফিরে আসা প্রতিটি মুমিনের একান্ত কর্তব্য। অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন কারণ তারা তাদের অধীনস্থদের জন্য দায়িত্বশীল এবং কিয়ামতের দিন তাদের এ বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে (সহীহ বুখারী, ৭১৩৮)। যদি পরিবার থেকে দ্বীন পালনে বাধা আসে তবে বিনয়ের সাথে তা এড়িয়ে আল্লাহর আনুগত্যে অটল থাকতে হবে। বিবাহের মাধ্যমে আল্লাহ যে পবিত্র সম্পর্ক দান করেছেন তার মধ্যে ভালোবাসা ও দয়ার এক অপার্থিব প্রশান্তি রয়েছে (সূরা আর-রূম, ৩০:২১)। তাই হালাল সম্পর্কের জন্য ধৈর্য ধারণ করা এবং নফসের প্রলোভন থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহের জন্য অনন্তকালের আখেরাতকে বিসর্জন দেওয়া কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজ হতে পারে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জিনা ও ব্যভিচারের মতো জঘন্য পাপ থেকে নিজেদের এবং আমাদের পরিবারকে রক্ষা করার তৌফিক দান করুন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!