মানুষের অস্তিত্বের মূল উদ্দেশ্য এবং তার পারিপার্শ্বিক আচরণের মধ্যকার ব্যবধান বর্তমান সমাজে এক প্রকট সংকটের রূপ নিয়েছে। সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে যখন অশ্লীলতা ও অনর্থক বিনোদনের বিস্তার ঘটে, তখন মানুষের আত্মিক প্রশান্তি বিঘ্নিত হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে গান-বাজনার মতো বিষয়গুলো মানুষের অন্তরে এমন এক মোহের সৃষ্টি করে যা তাকে তার স্রষ্টা ও প্রকৃত জীবনদর্শন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পবিত্র কুরআনে মুমিনের যে বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে তা হলো আল্লাহর স্মরণ মাত্রই তাদের হৃদয় প্রকম্পিত হবে এবং তাঁর আয়াত পাঠ করা হলে ঈমান বৃদ্ধি পাবে (সূরা আল-আনফাল, ৮:২)। কিন্তু সমকালীন বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে যে একটি বড় অংশের মানুষ কুরআনের বাণীর চেয়ে বাদ্যযন্ত্রের ঝংকারে বেশি আনন্দ খুঁজে পায়। এই আসক্তি কেবল তরুণ প্রজন্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও অনেক মানুষ এই মোহজাাল থেকে বের হতে পারছে না। এটি মূলত ঈমানি দুর্বলতার এক প্রকাশ যা মানুষের আত্মাকে ক্রমান্বয়ে মৃতপ্রায় করে ফেলে। গান-বাজনা এবং অশ্লীলতা মানুষের চিন্তাশক্তিকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে সে তার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসের গুরুত্ব এবং মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার কথা ভুলে যায়।
শয়তানের এই প্ররোচনা মানুষকে মূলত জাহান্নামের ইন্ধন হিসেবে গড়ে তোলার একটি সুনিপুণ কৌশল। অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে ডাকছেন ক্ষমার দিকে এবং জান্নাতের চিরস্থায়ী সফলতার দিকে। একজন মুমিনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা এবং পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করা অপরিহার্য (সূরা আলে ইমরান, ৩:১০২)। কিয়ামত দিবসের যে ভয়াবহ বর্ণনা হাদিস ও কুরআনে এসেছে তা অত্যন্ত শিউরে ওঠার মতো। জাহান্নামের লঘুতম শাস্তি হিসেবে যখন একজনের পায়ের নিচে আগুনের কয়লা রাখা হবে যার তাপে তার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে, তখন সে নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিনতম আজাব ভোগকারী হিসেবে মনে করবে (সহীহ বুখারী, ৬৫৬১)। সেই কঠিন দিনে মানুষের মানসিক অবস্থা হবে বর্ণনাতীত। অপরাধী ব্যক্তি সেদিন তার কলিজার টুকরো সন্তান, প্রিয়তমা স্ত্রী, আপন ভাই এবং তাকে আশ্রয়দানকারী পুরো গোষ্ঠীকেই মুক্তিপণ বা বিনিময় হিসেবে দিয়ে হলেও নিজেকে আজাব থেকে বাঁচাতে চাইবে (সূরা আল-মাআরিজ, ৭০:১১-১৪)। দুনিয়াতে যে সন্তানের হাসির জন্য মানুষ রাত জেগে পরিশ্রম করে বা যার সামান্য কষ্টে অস্থির হয়ে ওঠে, কিয়ামতের সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে সেই সন্তানকেই সে জাহান্নামে ফেলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। এটিই হবে পরকালের চরম বাস্তবতা যেখানে কোনো মায়া বা মমতা আল্লাহর ন্যায়বিচারের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
এই ধ্বংসাত্মক পরিণতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো সময় থাকতে আল্লাহর কাছে তওবা করা। মহান আল্লাহ এতটাই দয়ালু যে তিনি রাতের শেষ প্রহরে প্রথম আসমানে নেমে এসে বান্দাকে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানান (সহীহ বুখারী, ১১৪৫)। পৃথিবীর সমস্ত গুনাহ নিয়েও যদি কেউ আল্লাহর সাথে শরিক না করে তাঁর কাছে ফিরে আসে, তবে তিনি পৃথিবী সমান ক্ষমা নিয়ে তাঁর বান্দার জন্য অপেক্ষা করেন (সুনানে তিরমিজি, ৩৫৪০)। তবে এই দয়া ও ক্ষমার সুযোগ কেবল এই নশ্বর পৃথিবীর জীবনের জন্যই বরাদ্দ। মানুষের চতুরতা বা বাহ্যিক ধার্মিকতা আল্লাহর কাছে কোনো মূল্য বহন করে না যদি না তার অন্তর পবিত্র থাকে। ফেরাউনের মতো প্রতাপশালী শাসকও নিজেকে ঈশ্বর দাবি করে শেষ পর্যন্ত করুণ পরিণতির শিকার হয়েছিল যা ইতিহাসের পাতায় এক নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হয়ে আছে (সূরা আন-নাসিয়াত, ৭৯:২৪)। কিয়ামতের দিন কেবল সেই ব্যক্তি মুক্তি পাবে যে `কালবুন সেলিম` বা সুস্থ ও পবিত্র অন্তর নিয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে (সূরা আশ-শুআরা, ২৬:৮৮-৮৯)। এই সুস্থ অন্তর অর্জনের জন্য প্রয়োজন শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য করা। নবীর নির্দেশিত পথই হলো জান্নাতে প্রবেশের একমাত্র চাবিকাঠি এবং তাঁর অবাধ্যতাই হলো জান্নাত অস্বীকার করার শামিল (সহীহ বুখারী, ৭২৮০)।
বর্তমান সমাজে অভিভাবকদের দায়িত্বও অনেক বেড়ে গেছে। তারা যদি নিজেদের সন্তানদের অশ্লীলতা, নেশা বা অবৈধ সম্পর্কের পথ থেকে ফেরাতে সচেষ্ট না হন, তবে কিয়ামতের দিন তাদেরও জবাবদিহি করতে হবে। প্রতিটি দায়িত্বশীল ব্যক্তি তার অধীনস্থদের জন্য আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ (সহীহ বুখারী, ৭১৩৮)। বিশেষ করে সালাত বা নামাজের গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম যা কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জিজ্ঞাসার বিষয় হবে (সুনানে নাসাঈ, ৪১৩)। সালাত পরিত্যাগ করা একজন মানুষকে কুফরের সীমানায় নিয়ে যায় (সহীহ মুসলিম, ৮২)। তাই যাবতীয় তর্ক-বিতর্ক ও অনর্থক ব্যস্ততা পরিহার করে আমাদের উচিত কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক বিধান পালনে মনোযোগী হওয়া। মৃত্যু কোনো পূর্ব ঘোষণা দিয়ে আসে না এবং মৃত্যুর পর তওবার দরজাও চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ যেন মনে না করে তাকে অনর্থক সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাকে কোনোদিন তাঁর প্রভুর কাছে ফিরে যেতে হবে না (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১১৫)। সময়ের দ্রুত প্রবাহ আমাদের কিয়ামতের নিকটবর্তী করছে অথচ মানুষের উদাসীনতা কাটছে না (সূরা আল-অাম্বিয়া, ২১:১)। তাই আজকের এই প্রতিবেদনটি আমাদের সকলের জন্য একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত যাতে আমরা গান-বাজনা ও অশ্লীলতার অন্ধকার থেকে নিজেকে মুক্ত করে কুরআনের আলোয় জীবন গড়তে পারি।

আপনার মতামত লিখুন :